ঢাকা   শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
এলাহাবাদ হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়

মুসলিম হওয়ায় দুই মেয়েকে গৃহবন্দী: বাবা ও রাজ্যকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানার নির্দেশ

Daily Inqilab অনলাইন ডেস্ক

১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৩ এএম | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৩ এএম

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ওপর নিজের ইচ্ছাসূচক মতামত চাপিয়ে দেওয়া বা তাদের বন্দি করে রাখা যে সম্পূর্ণ অসংবিধানিক, সে কথা আরও একবার কঠোর ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিল ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট। হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় নিজের দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বাড়িতে বেআইনিভাবে আটকে রেখেছিলেন বাবা। এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দুই বোনকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি, বাবা এবং উত্তর প্রদেশ রাজ্য সরকারকে যৌথভাবে ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নজিরবিহীন নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

 

বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চ একটি হেবিয়াস কর্পাস আবেদনের শুনানি শেষে এই ঐতিহাসিক রায় দেন।

 

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ৩৫ বছর বয়সী অংশু ভাটিয়া (বর্তমান নাম আমিনা অংশু ভাটিয়া) ২০২০ সালে এবং তার ২০ বছর বয়সী বোন দিয়া ভাটিয়া (বর্তমান নাম জোয়া দিয়া ভাটিয়া) ২০২১ সালে নিজেদের ইচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তবে এই ধর্ম পরিবর্তন মেনে নিতে পারেননি তাদের বাবা। তিনি দুই মেয়েকে জোরপূর্বক বাড়িতে বন্দি করে রাখেন। পরবর্তীতে আদালতের মুখোমুখি হয়ে দুই বোন জানান, কোনো বলপ্রয়োগ, প্রলোভন বা প্রতারণা নয়—বরং নিজস্ব মানসিক শান্তি, বিবেক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

আদালত দুই বোনের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শোনার পর জানায়, "একজন ব্যক্তি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হন, তখন সংবিধান তার নিজস্ব চিন্তা, ধর্ম, বসবাস এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে। বাবা-মায়ের বিরোধিতা বা সামাজিক মতাদর্শ কোনোভাবেই সংবিধানে প্রদত্ত এই স্বাধীনতাকে কেড়ে নিতে পারে না।"

 

শুনানির সময় উত্তর প্রদেশ সরকার এবং মেয়েদের বাবার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, এই ধর্মান্তরের পেছনে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র ও দেশের জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে। সেই উদ্দেশ্যে উত্তর প্রদেশ বেআইনি ধর্মান্তর বিরোধী আইন ও ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল।

 

তবে হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, ধর্মান্তরকরণের আইনি বৈধতা পরীক্ষা এবং দুই জন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে জোর করে আটকে রাখা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জাতীয় সুরক্ষার যে দোহাই দেওয়া হয়েছে, তার সপক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ পেশ করতে পারেনি পুলিশ। আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে পর্যবেক্ষণ করে যে, রাজ্য প্রশাসন অপরাধের তদন্তের দোহাই দিয়ে বেআইনি বন্দিদশাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, যা মৌলিক অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।

 

আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশে আগামী ৮ সপ্তাহের মধ্যে ওই দুই বোনকে যৌথভাবে ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। এই অর্থের অর্ধেক দেবেন তাদের বাবা এবং বাকি অর্ধেক মেটাবে উত্তর প্রদেশ সরকার।

 

আগামী ৭ দিনের মধ্যে দুই বোনের পাসপোর্ট, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, পরিচয়পত্র, ব্যাংক পাসবুকসহ সমস্ত ব্যক্তিগত নথিপত্র ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের বাবাকে।

 

ওই দুই নারী সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যেখানে খুশি, যার সাথে খুশি বসবাস করতে পারবেন। তাদের স্বাধীনতা বা চলাফেরায় কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা যাবে না। প্রয়োজনে রাজ্য সরকারকে তাদের উপযুক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।

 

আদালত চূড়ান্ত রায়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর অভিভাবকত্বের দোহাই দিয়ে তাদের স্বাধীনতা খর্ব করার অধিকার সংবিধান কোনো বাবা-মাকেই দেয় না।

 


বিভাগ : আন্তর্জাতিক


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

আরও পড়ুন

আমাদের আট দফা ১৮ কোটি মানুষের দাবি: জামায়াত আমির

আমাদের আট দফা ১৮ কোটি মানুষের দাবি: জামায়াত আমির

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফের আলোচনা শুরু করতে যে ৩ শর্ত দিল ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফের আলোচনা শুরু করতে যে ৩ শর্ত দিল ইরান

অপ্রতিমকে শেষ বিদায় জানাবে কুবি, প্রথম জানাজা কাল সকাল ১০টায়

অপ্রতিমকে শেষ বিদায় জানাবে কুবি, প্রথম জানাজা কাল সকাল ১০টায়

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, গ্রেপ্তার ১১

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, গ্রেপ্তার ১১

কুমিল্লার গ্রামগঞ্জের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে ইউপি নির্বাচনের হাওয়া

কুমিল্লার গ্রামগঞ্জের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে ইউপি নির্বাচনের হাওয়া

গোপীনাথপুরে তালতলা জোলায় উৎসব মূখর পরিবেশে চলছে নৌকা বাইচ

গোপীনাথপুরে তালতলা জোলায় উৎসব মূখর পরিবেশে চলছে নৌকা বাইচ

‘যুদ্ধবিরতি’র মধ্যেও গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৪ হাজারের কাছাকাছি

‘যুদ্ধবিরতি’র মধ্যেও গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৪ হাজারের কাছাকাছি

পবিত্র মক্কা-মদীনাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা ছারছীনার পীর ছাহেবের

পবিত্র মক্কা-মদীনাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা ছারছীনার পীর ছাহেবের

কক্সবাজার জামায়াতের সভায় উদ্বেগ প্রকাশ

কক্সবাজার জামায়াতের সভায় উদ্বেগ প্রকাশ

সিলেটে কারাগার পরিদর্শন করলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোর্শেদ

সিলেটে কারাগার পরিদর্শন করলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোর্শেদ

সংস্কারের অভাবে ছেংগারচর পৌরসভার সড়ক গুলোর বেহাল দশা

সংস্কারের অভাবে ছেংগারচর পৌরসভার সড়ক গুলোর বেহাল দশা

ইরাকের শ্রমবাজার সাময়িক বন্ধ

ইরাকের শ্রমবাজার সাময়িক বন্ধ

অপ্রতিম হত্যার বিচারের দাবিতে কুবিতে মানববন্ধন, ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শিক্ষার্থীদের

অপ্রতিম হত্যার বিচারের দাবিতে কুবিতে মানববন্ধন, ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শিক্ষার্থীদের

নতুন বই নিয়ে নজিরবিহীন দ্বন্দ্ব: ডায়ানা মৃত্যুর তিন দশক পর আবার উত্তপ্ত ব্রিটিশ রাজপরিবার

নতুন বই নিয়ে নজিরবিহীন দ্বন্দ্ব: ডায়ানা মৃত্যুর তিন দশক পর আবার উত্তপ্ত ব্রিটিশ রাজপরিবার

হাফেজদের হাতে নেক্সাস বই প্রধানমন্ত্রীকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র?

হাফেজদের হাতে নেক্সাস বই প্রধানমন্ত্রীকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র?

কক্সবাজারে ২৭ মামলার আসামি বাদলসহ ২ ডাকাত গ্রেফতার

কক্সবাজারে ২৭ মামলার আসামি বাদলসহ ২ ডাকাত গ্রেফতার

গাজায় গণহত্যা নিয়ে তথ্যচিত্র 'নাজা': ইসরায়েলজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড়

গাজায় গণহত্যা নিয়ে তথ্যচিত্র 'নাজা': ইসরায়েলজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড়

বিরোধী দল দেশকে দাসত্বের মধ্যে রাখতে চায়: আবুল খায়ের ভূঁইয়া

বিরোধী দল দেশকে দাসত্বের মধ্যে রাখতে চায়: আবুল খায়ের ভূঁইয়া

বরিশাল মহানগর পুলিশের প্রথম কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

বরিশাল মহানগর পুলিশের প্রথম কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

৩৪ দিন পর গণনা : শাহজালাল মাজার দানবাক্সে প্রায় ৮৯ লাখ টাকা , মিললো স্বর্ণ ও ১৫ দেশের মুদ্রা

৩৪ দিন পর গণনা : শাহজালাল মাজার দানবাক্সে প্রায় ৮৯ লাখ টাকা , মিললো স্বর্ণ ও ১৫ দেশের মুদ্রা