ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি : মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ইসলাম
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০৬ এএম | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০৬ এএম

ভাষা শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি মাস। ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষের চেতনার অনির্বাণ এক বাতিঘর। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষা নিয়ে এমন আন্দোলন আর কোথাও হয়নি। যার হাত ধরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।আর ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা শহীদদের মূল্যায়ন ও আমাদের করণীয়ঃপৃথিবীর সকল ভাষাই আল্লাহ তাআলার বিশেষ দান ও অসাধারণ নেয়ামত। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তাদের শিখিয়েছেন ভাষা। (সূরা আর রাহমান:৩-৪) উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানব সৃষ্টির কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি ভাষা শিক্ষার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ভাষা না থাকলে মানুষ বিকল। ভাষা ও মানুষ একে অপরের সম্পূরক। উক্ত আয়াত এ কথারও ইঙ্গিত বহন করে যে, আল্লাহ তাআলা অন্য কোন প্রাণীকে মানুষের মতো ভাষা দান করেন নি। এ ক্ষেত্রে মানব অন্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা। তাই পৃথিবীর বুকে যত ভাষাই চালু আছে সবগুলোই আল্লাহ তালার এক অসাধারণ নিয়ামত। যার কোনো বিকল্প নেই।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন সকলকেই স্বজাতি ও এলাকার ভাষা দিয়েই প্রেরণ করেছেন। এভাবে সকল আসমানী কিতাবও যে জাতির জন্য নাযিল করেছেন সে জাতির ভাষাতেই নাযিল করেছেন। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘আমি সকল রাসূলকেই তাঁদের স্বজাতির ভাষাভাষি করেই প্রেরণ করেছি, যেন তাঁরা তাদেরকে আল্লাহর হুকুম-আহকাম পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারেন।’ (সূরা ইবরাহীম: ৪) উক্ত আয়াতও মাতৃভাষার যথাযথ গুরুত্বের দানের বার্তা বহন করে। এক কথায় ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক ভাষারই গুরুত্ব সীমাহীন এবং এর সযত ও নিয়মতান্ত্রিক চর্চা আমলে ছালেহ বা নেক আমল বলে গন্য। সেমতে ইসলামের দৃষ্টিতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার গুরুত্বও সীমাহীন এবং এর চর্চায় আত্মনিয়োগ করাও পুণ্যের আমল বলে বিবেচিত হবে। তাই একে অবহেলা করা বা গুরুত্বহীন মনে করার কোনো সুযোগ আমাদের নেই; বরং একে স্থান দিতে হবে কুরআন-হাদীস, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও জান্নাতের ভাষা- এক কথায় দীনী ভাষা আরবীর পাশেই।
তবে বাংলা ভাষা শিক্ষা করা সকলের কর্তব্য; বরং কিছু দীনদার মানুষেরতো এর জন্য নিবেদিত প্রাণ হওয়া অপরিহার্য। ইতিহাসের সে অধ্যায় রচিত হয়েছিল এ পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) কিছু অকুতোভয় যুবক সালাম, রফিক, জববার ও বরকতের মত আরো অনেক যুবকের তাজা রক্তের বিনিময়ে। মাতৃভাষা বাংলাভাষা, যে ভাষার সাথে এ দেশের মানুষের নাড়ির সম্পর্ক। সে ভাষায় কথা বলা তথা মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তাঁরা নিজেদের মহামূল্যবান জীবন নির্দ্বিধায় বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাদের এ আত্মদানকে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন যে, তারা শহীদ কি-না?
উল্লেখ্য যে, মহান আল্লাহ্ রাববুল আলামীনের একক সাবভৌমত্ব, শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত ও শেষ বিচারের দিনসহ পরকালীন অন্যান্য বিষয়র প্রতি অকুণ্ঠ চিত্তে নিজের আন্তরিক বিশ্বাসের মৌখিক ঘোষণাদান এবং রিসালাতের মাধ্যমে মহানবী সা.-এর কাছে প্রেরিত আল্লাহ্ প্রদত্ত মানবজীবনের বিধান সমাজ জীবনের সর্বস্তরে বাস্তবায়নের সংগ্রামে ইসলামী বিরোধী শক্তির হাতে মৃত্যু বরণ করাকেই শহীদ বলে।
মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকার মানুষের সৃষ্টিগত তথা জন্মগত অধিকার। কারণ মহান আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সাথে সাথে তাকে তার ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন : ‘‘দয়াময় আল্লাহ্। তিনিই শিক্ষা দিয়াছেন কুরআন। তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষ। তিনিই তাহাকে শিখাইয়াছেন ভাব প্রকাশ করিতে।’’আলোচ্য আয়াতের মাধ্যমে জানা যায় যে, মানুষ সৃষ্টির সাথে ভাষার অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক রয়েছে। তাই মাতৃভাষা মানুষের একটি সৃষ্টিগত অধিকার। কেউ যদি এ অধিকার ছিনিয়ে নিতে চায় তার প্রতিরোধ করা অপরিহার্য। আর এ প্রতিরোধে কেউ নিহত হলে ইসলামের দৃষ্টিতে সে শহীদের মর্যাদা পাবে। তবে শর্ত হলো, তাদেরকে প্রকৃতভাবে এমন মুসলিম হতে হবে যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিহত হয়।আর আমরা বাংলাদেশের অধিবাসী, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। আমরা আজ মাতৃভাষায় কথা বলি। এর পেছনে এসকল শহীদদের অবদানই সর্বাগ্রে। কাজেই এ ভাষা শহীদদের প্রতি আমাদেরও কিছু করণীয় রয়েছে।
তাই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যেসকল অকুতোভয় মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিল তারা যদি ইসলামী শহাদাতের শর্তগুলো পূরণ করে থাকেন, কুরআন-হাদীসের আলোকে তাদেরকে আমরা ইনশাআল্লাহ জান্নাতবাসীই বলব। তাদের নাজাতের ব্যাপারে আল্লাহই সর্বজ্ঞাত। অন্যথায় তাদের ভিতর যদি সে রকম শর্তাবলী অনুপস্থিত থেকেও থাকে, তবুও তারা যেহেতু আমাদের অধিকার আদায়ের জন্যেই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন সুতরাং মুসলিম হিসেবে তাদের জন্য আমাদের কর্তব্য হলো আল্লাহর কাছে মাগফিরাত তথা ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়া। কেননা, এটি একটি সদকায়ে জারিয়ার মত। আর এ সম্পর্কে হাদীসের একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, যদি কেউ কোনো সদকায়ে জারিয়ার মত সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাহলে যত প্রাণী তা থেকে উপকৃত হবে, সে ঐসকল মানুষের নেকীর একটি অংশ পেয়ে যাবে।অবশ্য কোনো কোনো ধর্ম ও সমাজে গান বাজনার মাধ্যমে তাদের দেব-দেবীদেরকে স্মরণ করে থাকে এবং এর মাধ্যমে তারা তাদেরকে খুশী করার চেষ্টা করে। সেটা তাদের ধর্মীয় ব্যাপার। আমরা মুসলিম, আমাদের ধারণা মতে শহীদরা আখেরাতে অবস্থান করছেন। তাই আমাদের উচিত যে সকল কাজ-কর্ম তাদের উপকারে আসে সে সকল কাজই বেশি বেশি করা।
পরিশেষে বলতে চাই, মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি—এই তিনটি শব্দ সব মানুষের কাছে পরম আবেগের। মাতৃভাষা মানে মায়ের ভাষা। দুনিয়ার সব দেশের নিজ নিজ ভাষা রয়েছে। এ ভাষা তাদের মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা, স্বপ্নের ভাষা এবং জীবনযাপনের ভাষা।মায়ের কাছ থেকে এ ভাষা শেখে বিধায় এর নাম হয়েছে মাতৃভাষা।আল্লাহ তাআলা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। তাঁরা নিজ জাতির ভাষায় ধর্ম প্রচার করতেন। আর বিশ্বে ইসলামের দা‘ওয়াত প্রচারের জন্য বিশ্বের প্রতিটি ভাষারই চর্চা করা ইসলামী দা‘ঈদের কর্তব্য। অতএব, প্রতিটি ভাষায় ইসলামী সাহিত্য গড়ে তুলে মানব কল্যাণে কাজ করতে হবে।
জাতীয়তার প্রেক্ষিতে যেমন ইসলামের সার্বজনীনতা সীমিত করা ঠিক নয়, তেমনি ইসলামের বিশ্বজনীনতার কথা তুলেও কোনো অঞ্চরের ভাষার উপর হস্তক্ষেপ করা বা তার গুরুত্ব উপেক্ষা করা আদৌ উচিত নয়। ইসলাম ভাষাগত জাতীয়তার ঊর্ধ্বে। বিশ্বজনীন ধর্ম হিসেবে সকল ভাষাই তার নিজস্ব। মানবসমাজের সকলের মাতৃভাষা চর্চা ও সমৃদ্ধি সাধনে সে অনুপ্রাণিত করে। এটা মানুষের জন্মগত অধিকার হিসেবে মনে করে। এতে কোনো রকম হস্তক্ষেপ ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলতে হলে তার মূল উৎস কুরআন সুন্নাহতে কী আছে সর্বপ্রথম তাই দেখা প্রয়োজন। আর ভাষা আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে যার যতটুকু ভাল আছে তা গ্রহণ করে এবং মন্দটুকু বর্জন করে উদার মন নিয়ে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে মাতৃভাষার উৎকর্ষ সাধনে কাজ করা একান্ত আবশ্যক।
বিভাগ : ইসলামী জীবন
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন

অবসরের ঘোষণা দিলেন জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী তারকা

রোনালদোর জোড়া গোলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আল হিলালকে হারাল নাসের

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

থাইল্যান্ড থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

নারীবান্ধব পাবলিক টয়লেট

মেডিক্যাল ট্যুরিজম

প্রেসার গ্রুপের ভালো-মন্দ

রাজধানীতে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

প্রশ্ন : মরণোত্তর চক্ষুদান বা অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান কি শরীয়ত সমর্থন করে?

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে উত্তম চরিত্রে

খালেস নিয়তে আমল করলে প্রতিদান সুনিশ্চিত

ঈদ আসে-ঈদ যায়, স্মৃতিটুকু রয়ে যায়

ইসলামের দৃষ্টিতে পরোপকারের গুরুত্ব ও ফজিলত

ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ করায় যাত্রীকে মারধর

কৃষক জজ মিয়ার মৃত্যু নিয়ে রহস্য

সরিষাবাড়ীতে বিএনপি’র দু’গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষ

কনস্টেবলকে মারধরের অভিযোগ