ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ | ২ মাঘ ১৪৩১
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে

সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হচ্ছে হাজারো মানুষ

Daily Inqilab কামাল আতাতুর্ক মিসেল

০৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:০৩ এএম | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:০৩ এএম

ট্রাফিক আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লাফিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। মহাসড়কে অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকের দাপটে দুর্ঘটনায় লাগাম টানা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। দীর্ঘ হচ্ছে মৃদ্যুর মিছিল।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অদক্ষ চালকের বেপোরোয়া গাড়ী চালানো, স্বেচ্ছাচারিতা, খামখেয়ালীপনা, জনসচেতনতার অভাব এবং সর্বোপরি দায়ী চালকের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তির বিধান না থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অহরহ ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। অনেকের মতে এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়-হত্যার শামিল। প্রতিদিনই যন্ত্রদানবের হত্যার শিকার হয়ে দেশের বহু জ্ঞানী, গুণী, বুদ্ধিজীবী, নিস্পাপ শিশু থেকে বৃদ্ধ, স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী প্রাণ হারাচ্ছেন। চিরদিনের মত পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে অনেককেই। বিজ্ঞ মহল বলছেন, দুর্ঘটনার জন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং পুলিশ অনেকাংশে দায়ী।
রাজধানীর একমাত্র জাতীয় অর্থপৈডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে প্রতিনিয়ত রোগীদের বেশিরভাগই সড়ক দুর্ঘটনায় শিকার ব্যক্তিরা ভর্তি হচ্ছেন। অদক্ষ চালকের বেপরোয়া চালনায় প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। অহরহ ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। পঙ্গুত্ব বরণ এবং মৃত্যু বরণ করতে হচ্ছে অনেকে।

প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মানুষের নাম। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আহতের সংখ্যা। আহতদের বেশিরভাগকেই বরণ করতে হয় আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব। স্বাভাবিক কর্মক্ষম অবস্থায় তারা আর কখনো ফিরতে পারেন না। শুধু সড়ক দুর্ঘটনার কারণেই বাংলাদেশকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিরূপণ করা গেলেও যারা দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যান, তাদের হিসাব কেউ রাখে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিদিন এত দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্বের হার কমাতে সড়ক ব্যবস্থায় উন্নতির দাবী যাত্রী ও জনসাধরনের। মূলত সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যেসব উদ্যোগ প্রয়োজন, তা নেয়া হচ্ছে না। মূলত ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন, দক্ষ চালক তৈরি, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল রোধ ও সড়ক নিরাপত্তায় ভঙ্গুর অবস্থার কারণে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হচ্ছে না। সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে চালকের বেপরোয়া গতির শিকার হয়ে প্রাণ হারায় দুই স্কুল শিক্ষার্থী। দেশজুড়ে শুরু হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, যার নেতৃত্বে ছিল শিক্ষার্থীরা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় বিদ্যমান আইন সংশোধনে এবং প্রণীত হয় সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এবং ২২ অক্টোবরকে ঘোষণা করা হয় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে। প্রতিবছর নানান কার্যক্রমের মাধ্যমে দিবসটিকে উদ্যাপন করা হয়। নানান আনুষ্ঠানিকতায় দিবস পালিত হলেও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমছে না। সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলেও ফিটনেসবিহীন গাড়ি এখনো সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। এছাড়াও ১৮ বছর বয়স না হলে পাবলিক প্লেসে কেউ মোটরযান চালাতে পারবে না। পেশাদার চালকদের বয়স হতে হবে ন্যূনতম ২২ বছর। পেশাদার চালকদের অবশ্যই মালিকদের কাছ থেকে নিয়োগপত্র নিতে হবে। বেপরোয়া গতি ও মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানো যাবে না। তবে যানবাহন-সংক্রান্ত এ আইন থাকলেও তার প্রয়োগ চোখে পড়ে না। ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে চোখ রাখলেই এর সত্যতা মিলবে। যানবাহন চালকদের এক বড় অংশের বয়সই ১৮ বছরের নিচে। তাছাড়া শারীরিকভাবে গাড়ি চালানোয় সক্ষম নন, এমন চালকও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পেশাদারভাবে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে নিয়োগপত্রের বালাই নেই। নিয়োগপত্র থাকার আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কেও জানেন না অনেক চালক। আর পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোও তার তোয়াক্কা করে না। ফলে আইন থাকলেও তা অনেক সময় মানা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের পাশে রয়েছে কুমিল্লার চান্দিনা, দাউদকান্দি ও সদর দক্ষিণ থানা। এছাড়া রয়েছে হাইওয়ে পুলিশের দাউদকান্দি থানা, ইলিয়টগঞ্জ ফাঁড়ি ও ময়নামতি থানা। গত ৬ মাসে কুমিল্লায় একাধিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে স্কুল শিক্ষকসহ অত্যন্ত ৫২ জন। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন ঘাতক বাস, ট্রাক ও পিকআপ আটক করে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের জিম্মায় দেয়। এরপর আর আটক যানবাহন সম্পর্কে স্থানীয় লোকজন খোঁজ-খবর নেয় না। অথচ ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন বিভিন্ন থানা ও হাইওয়ে পুলিশ সড়ক দুর্ঘটনাকে পুঁজি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে এমন অভিযোগ অনেক পুরনো। দুর্ঘটনার শিকার পঙ্গু মানুষ কিংবা নিহতের পরিবার কোন ক্ষতিপূরণ না পেলেও পুলিশের বাণিজ্য চলছে রমরমা। বছরের পর বছর মহাসড়ক সংলগ্ন থানাগুলোর এসআই এবং ওসি’রা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা এসব টাকার ভাগ পাওয়ায় চাঁদাবাজি বন্ধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তিভোগী পরিবারের।

এদিকে দুঘর্টনার কয়েক মাস পর দুঘর্টনাকবলিত যানবাহন মালিকদের সাথে দেন-দরবারে বসেন থানা পুলিশ। মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে ছাড়া হয় গাড়ি। দাবিকৃত টাকা পরিশোধ না করলে যানবাহন মালিককে আদালতের স্মরণাপন্ন হতে হয়। তাতে ভোগান্তির শেষ থাকে না। দীর্ঘ সময় ব্যয় করে আদালত থেকে অনুমতি নিয়ে পুনরায় থানা পুলিশের কাছে ধরনা দিতে হয়।

পরিবহন মালিক সমিতি সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার পরপর একটি গাড়ি থানা থেকে মুক্ত করার জন্য ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুলিশকে দিতে হয়। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ম্যানেজ করতে পারলে পুলিশকে ৫ হাজার টাকা দিলেই চলে। দুর্ঘটনার পর থানা পুলিশের সাথে সমঝোতার জন্য দায়িত্ব নেন স্ব-স্ব এলাকার পরিবহন মালিক কিংবা শ্রমিকদের সংগঠন। সে অনুযায়ী সহজেই ছাড়া পেয়ে যায় ঘাতক বাস-ট্রাক। বছরের পর বছর এ ধারা অব্যাহত থাকলেও নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। ফলে দিন দিন দুর্ঘটনা বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। আর নগদ নারায়ণে তুষ্ট হয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছে হাইওয়ে পুলিশ। তবে এ বিষয়ে হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোঃ খাইরুল আলম টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, দুর্ঘটনার পর গাড়ির মালিক বা ড্রাইভার এর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করতে কেউ আসে না বলে পরিবহন মালিকদের বিরুদ্ধে আমরা কোন আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি না।

বাংলাদেশ হেলথ ইনজুরি সার্ভে (বিএইচআইএস) শীর্ষক ওই জরিপের তথ্যমতে, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া পঙ্গুত্ব ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষতি আরো বেড়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাত-পা ভাঙা, স্পাইন ভাঙা রোগী পঙ্গু হাসপাতালে বেশি আসে। তবে আগের তুলনায় ইদানিং সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। একবার কেউ হাত-পা হারালে তারা সমাজের জন্য বোঝা হয়ে যায়। দেশে এখনো কৃত্রিম হাত-পা সংযোজনের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না। আর কৃত্রিম হাত-পা লাগালেও অনেকে তা ঠিকমতো মেইনটেইন করতে পারে না। ওই কারণে পঙ্গুত্বের হার কমাতে সড়ক ব্যবস্থায় উন্নতির বিকল্প নেই।


বিভাগ : জাতীয়


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

এক মাসের মধ্যে সংস্কারের রোডম্যাপ দিবে সরকার: পরিবেশ উপদেষ্টা
রাষ্ট্রের কল্যাণে উপসচিব পদে কাকে প্রয়োজন: নীতি ও ন্যায্যতা কী
দেশের সাংবিধানিক নাম ‘জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ’ করার সুপারিশ
সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা
দেশে ফিরেই ছিনতাইয়ের শিকার মালয়েশিয়া প্রবাসী ডালিম
আরও

আরও পড়ুন

বগুড়ায় কলেজ শিক্ষার্থী হত্যা মামলায় গ্রেফতার ৪

বগুড়ায় কলেজ শিক্ষার্থী হত্যা মামলায় গ্রেফতার ৪

মতিঝিলে শিক্ষার্থীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১৫

মতিঝিলে শিক্ষার্থীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১৫

সাভারে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ২৫ লাখ টাকার তেলসহ পিকআপ ছিনতাই

সাভারে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ২৫ লাখ টাকার তেলসহ পিকআপ ছিনতাই

ডাকসু নিয়ে ৩৭৭ সংস্কার প্রস্তাব ঢাবি ছাত্রদলের

ডাকসু নিয়ে ৩৭৭ সংস্কার প্রস্তাব ঢাবি ছাত্রদলের

গাজীপুরে থানায় ব্যবসায়ীকে আটক করে ২ লাখ টাকা ঘুষ নিলো ওসি

গাজীপুরে থানায় ব্যবসায়ীকে আটক করে ২ লাখ টাকা ঘুষ নিলো ওসি

রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অফিস অবরোধের ঘোষণা চাকরি বঞ্চিতদের

রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অফিস অবরোধের ঘোষণা চাকরি বঞ্চিতদের

শামীম ওসমান-নানক পরিবারের বিরুদ্ধে দুই মামলা

শামীম ওসমান-নানক পরিবারের বিরুদ্ধে দুই মামলা

বায়ু দূষণে আবারও শীর্ষে ঢাকা

বায়ু দূষণে আবারও শীর্ষে ঢাকা

এক মাসের মধ্যে সংস্কারের রোডম্যাপ দিবে সরকার: পরিবেশ উপদেষ্টা

এক মাসের মধ্যে সংস্কারের রোডম্যাপ দিবে সরকার: পরিবেশ উপদেষ্টা

দেশে ফিরেই ছিনতাইয়ের শিকার মালয়েশিয়া প্রবাসী ডালিম

দেশে ফিরেই ছিনতাইয়ের শিকার মালয়েশিয়া প্রবাসী ডালিম

বিপিএল শেষ কর্নওয়ালের

বিপিএল শেষ কর্নওয়ালের

ওয়াটসাপ, টেলিগ্রাম বা বিভিন্ন সোশ্যাল মাধ্যমে মেসেজ দিয়ে দেওয়া সালামের জওয়াব দেওয়া প্রসঙ্গে?

ওয়াটসাপ, টেলিগ্রাম বা বিভিন্ন সোশ্যাল মাধ্যমে মেসেজ দিয়ে দেওয়া সালামের জওয়াব দেওয়া প্রসঙ্গে?

আরচ্যারী ফেডারেশনের তারুণ্যের উৎসব কর্মসূচি শুরু

আরচ্যারী ফেডারেশনের তারুণ্যের উৎসব কর্মসূচি শুরু

বেনাপোলে আড়াই বছর পর কবর থেকে তোলা হলো বিএনপি নেতা আলিমের লাশ

বেনাপোলে আড়াই বছর পর কবর থেকে তোলা হলো বিএনপি নেতা আলিমের লাশ

রাষ্ট্রের কল্যাণে উপসচিব পদে কাকে প্রয়োজন: নীতি ও ন্যায্যতা কী

রাষ্ট্রের কল্যাণে উপসচিব পদে কাকে প্রয়োজন: নীতি ও ন্যায্যতা কী

ধূমপানকে না বলুন

ধূমপানকে না বলুন

জালিমের পরিণতি ভালো হয় না

জালিমের পরিণতি ভালো হয় না

অখণ্ড ভারতের নীলনকশা এবং মুখোশপরা গণশত্রুদের দাস্যবৃত্তি

অখণ্ড ভারতের নীলনকশা এবং মুখোশপরা গণশত্রুদের দাস্যবৃত্তি

মাজারে হামলা ও উগ্রপন্থা কাম্য নয়

মাজারে হামলা ও উগ্রপন্থা কাম্য নয়

১২ কোটি জনসংখ্যার ৭ কোটি আক্রান্ত

১২ কোটি জনসংখ্যার ৭ কোটি আক্রান্ত