অর্থনীতির জন্য বড় সুসংবাদ ও ইতিবাচক
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬ এএম | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬ এএম
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স আসার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস রেটিংস বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে বাড়িয়ে আবার ‘স্থিতিশীল’ করেছে। তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণের উচ্চ হার অব্যাহত থাকায় দেশটির বর্তমান রেটিং ‘বি২’-তেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। যদিও এই সময়ে খেলাপি ঋণ কমেছে ৩ শতাংশ। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত মুডিসের এই নতুন মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নতুন সরকারের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন থাকায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখন সংস্কার কাজে বড় কোনো বাধা তৈরি করছে না।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ধারাবাহিক সহযোগিতা দেশের অর্থায়ন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করছে। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে ‘নেতিবাচক’ করেছিল এই সংস্থাটি। খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মুডিসের এই ইতিবাচক মূল্যায়নের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবর্যাদা বাড়বে। এর ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলো দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য ডলার বা বৈদেশিক ঋণের সীমা বাড়িয়ে দেবে, যা সহজ শর্তে আমদানি বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, জাইকা, ইউনিসেফ, ইউএনডিপি, এইএসএইড, সিডা, ডানিডাসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডসহ আর্থিকখাতের বড় বড় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে বাংলাদেশের প্রতি। যা আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য জন্য পজিটিভি বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে হুন্ডিমুক্ত রেকর্ড রেমিট্যান্স আসার ফলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে চার মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। যেখানে ২০২৪ সালে রিজার্ভ নেমে এসেছিল ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে জানিয়েছে মুডিস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে এবং আগামী অর্থবছরগুলোতে তা আরও বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক প্রফেসর আবু আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা মুডিস রেটিংস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ এটা বাংলাদেশ এবং দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরণের সুসংবাদ বলবো আমি। যা দেশের আমদানি বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বেশ কিছু বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে আরও সফলতা আনতে হলে ব্যবসা সহজ করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
ঋণের সুদহার কমানোয় বাংলাদেশ ব্যাংককে সাধুবাদ জানিয়ে প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বা রেপো রেট কমিয়েছে। ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে নীতি সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় কম সুদে অর্থ ধার নিতে পারবে। এতে গ্রাহক পর্যায়েও ঋণের সুদহার কমবে বলে আশা করছি।
একই সঙ্গে ১৪-১৫ শতাংশ চড়া সুদের হার কিছুটা কমলে নতুন উদ্যোক্তারা কম খরচে পুঁজি সংগ্রহ করতে পারবেন, যা নতুন ব্যবসা শুরু ও বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটাতে সহায়তা করবে এবং দেশের জন্য ভালো কিছু হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক এই শিক্ষক বলেন, পুরনো ব্যবসায়ীদের পক্ষ্যে চড়া সুদের ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা এবং সেই সাথে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা পুরনো বা নতুন—যেকোনো ব্যবসায়ীর জন্যই অত্যন্ত কঠিন। উচ্চ সুদ ব্যবসায় পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে ব্যবসার টিকিয়ে রাখার ক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। যদিও বিশেষ বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রণোদনামূলক বিভিন্ন স্কিমের মাধ্যমে তাদের সুযোগ করে দিচ্ছে। তারপরও ব্যবসায়ীদের সুযোগ ও পরিধি বাড়াতে সুলভ মূল্যে ঋণের ব্যবস্থা প্রণোদনামূলক স্কিমে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যাতে তারা ব্যবসার সম্প্রসারণ করতে পারেন। একই সঙ্গে নীতিমালা শিথিল করে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ এবং জামানত বা কোল্যাটারালের শর্ত কিছুটা শিথিল করার কথা বরেন তিনি। প্রবীণ এই অর্থনীতিবীদ বলেন, নতুন করে ব্যবসা বড় করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর মওকুফ বা হ্রাসের সুযোগ দিলে ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়ানোর বাড়তি শক্তি পাবেন।
বিদেশি বড় বিনিয়োগে গুরুত্বারোপ করে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনাসহ বাংলাদেশের লজিস্টিক খাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত-ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এই বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও শুধু ডিপি ওয়ার্ল্ডই নয়, ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস, সিঙ্গাপুরের পিএসএ এবং সউদী আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল সহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থাও বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামোতে বিনিয়োগে আগ্রহী। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য হাব-এ পরিণত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
একই সঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও প্রস্তাব মূল্যায়ন নিয়ে সময় ক্ষেপন না করে দ্রুত তাদের দেওয়ার তাগিদ দেন। প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, অনুমোদনে দেড়ি হলে সমস্যা। দ্রুত করে ফেলতে হবে। করে ফেলেছি বিশ্বের কাছে বার্তা দিতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, নতুন নতুন বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম হবে বলে উল্লেখ করেন প্রফেসর আবু আহমেদ। শেয়ারবাজারে ভালো ও মানসম্মত নতুন কোম্পানি আনতে এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগকে স্বাগত জানিয়ে আবু আহমেদ বলেন, মানসম্মত আইপিও বা তালিকাভুক্তি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি ছিল। এভাবে আর্থিকখাতে উৎসাহ দিতে পারলে মুডি’স সহ অন্যান্য র্যাংকিংয়েও ভালো বার্তা যাবে বিশ্বের কাছে।
প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ বা সাড়ে ৩ শতাংশ। এটাকে দ্রুত সাড়ে ৪ বা ৫-এ উন্নীত করতে হলে অবশ্যই বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে। আর সে জন্য সব ধরণের উদ্যোগ নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিভাগ : জাতীয়
মন্তব্য করুন
এই বিভাগের আরও
আরও পড়ুন
ভারত দলে প্রথমবার নামান, ওয়ানডেতে নাবি
শেরপুরে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩ নেতাকর্মী গ্রেফতার
ভারতে পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা যাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে: ভারতীয় হাইকমিশনারকে মাহ্দী আমিন
এড শিরানের সফর থেকে বাদ, গাজার জন্য ১০ লাখ ডলার সহায়তা দিচ্ছেন ম্যাকলমোর
অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই: এমপি মতিয়ার রহমান
চতুর্মুখী রাজনৈতিক ও সামরিক চাপে সউদী যুবরাজ: অনিশ্চয়তায় ‘ভিশন ২০৩০’
উখিয়ায় সাজাপ্রাপ্তসহ বিভিন্ন মামলায় ৯ আসামি আটক
রাজশাহীর বাঘায় কিস্তির টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা
নরওয়ের সঙ্গে স্থানীয় সরকারে কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যাশা
ভূমি অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিতে চালু হচ্ছে ‘জিও ফেন্সিং’
উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নকল ওষুধ ও ওষুধ তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামসহ ভুয়া চিকিৎসক গ্রেপ্তার
মার্কিন বন্ড বিক্রি বাড়াল চীন: ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে ট্রেজারি হোল্ডিং
অপশক্তির মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: হুইপ জি কে গউছ
আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইরানের অপ্রতিরোধ্য উত্থান
হলিউডে রিমেক হচ্ছে বিজয় সেতুপতির ‘মহারাজা’
রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলায় শূন্য সহনশীলতা দেখাচ্ছে সরকার: আইনমন্ত্রী
ইউএস ওপেনে ধাক্কার পর চায়না ওপেনে ফিরছেন জোকোভিচ
মেধা ও যোগ্যতার যেকোনো অর্জনকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
‘সূর্য সেন হলের সিঁড়িতে জিন্নাহর ছবি নোংরামির চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম’
বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম