বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন চিরকাল
১৪ আগস্ট ২০২৩, ০৮:১২ পিএম | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৩, ১২:০৭ এএম

বঙ্গবন্ধু ছিলেন সকল বাঙালির বন্ধু ও খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের পরমাত্মীয়। তিনি গরিব, নিপীড়িত-নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত মানুষের সাথে থেকেছেন আজীবন। নায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে যিনি সর্বদা ছিলেন বদ্ধপরিকর। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে আজীবন নির্দ্বিধায় সংগ্রাম করে গেছেন ব এই বীর নায়ক। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কথা ভেবেছেন। বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিবাদী ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর অন্ধকারের অতল গহীনে ডুবতে থাকা বাঙালি জাতির মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় আবির্ভূত হয়ে নায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন একের পর এক বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, তৎকালীন বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন আবশ্যক। না হলে পাকিস্তানি শাসক চক্রের যাতাকলে বাঙালিরা নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হবে। কেননা, পাকিস্তান সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব দিক থেকেই চরম বৈষম্যের শিকার হতে হয়। পাকিস্তানের বেশিরভাগ অর্থনৈতিক আয়ের খাত পূর্ব পাকিস্তানভিত্তিক হলেও পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে বেশ দমিয়ে রাখা হয়। এভাবে পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি শোষণের মাত্রা দিনের পর দিন বাড়তে থাকে, যা ক্রমান্বয়ে বাঙালির মনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে বাঙালিরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। যেগুলোর প্রতিফলনে বাঙালি জাতির ইতিহাসে খচিত হয় ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪-এর সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলন। আন্দোলনগুলোর প্রতিটিতে সামনে থেকে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু, যার ফলে কোনো আন্দোলনই বিফলে যায়নি এবং সফল পরিসমাপ্তি হয় স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে।
বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি অনেক কিছু শিক্ষা দেয়। সে রাজনীতি কখনো ভাগাভাগির হিসাব করেনি, সে রাজনীতিতে ক্ষমতা দখলের কৌশল ছিল না। সে রাজনীতিতে ছিল না প্রতিহিংসাপরায়ণ বা উদ্ধতপূর্ণ আচরণ। বঙ্গবন্ধু সর্বদা দলের নির্দেশনা মেনেছেন, রাজপথে থেকেছেন, জেল-জুলুম সয়েছেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশার প্রতিটি স্তরে সততা, নিষ্ঠা এবং মানুষের জন্য ভালোবাসার প্রমাণ রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু শুধুমাত্র একজন সফল রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, পাশাপাশি তিনি দেশের সার্বিক উন্নয়নে নজর দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন যথেষ্ট বিজ্ঞান অনুরাগী এবং বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গড়ে তোলার পিছনে বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টা এবং অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর যার প্রতিফলন সুস্পষ্ট লক্ষণীয়। বঙ্গবন্ধু ভালোভাবেই অনুধাবন করেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশের মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানোর জন্য শিক্ষার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে হবে এবং সে শিক্ষা অবশ্যই বিজ্ঞানধর্মী হতে হবে। সে উদ্দেশ্যে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া লাখ লাখ স্কুল-কলেজকে তিনি পুনর্গঠিত করেছিলেন। বিজ্ঞান ও শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর যে ভালোবাসা ও প্রচেষ্টা ছিল স্বাধীনতার পর সরকার গঠনের সাথে সাথে তার একের পর এক প্রতিফলন শুরু হয়। ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই দেশসেরা বিজ্ঞানী, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (তৎকালীন পাকিস্তান বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ) এর প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ড. কুদরত-এ-খুদাকে নিয়ে শিক্ষা কমিশন গঠন করার মাধ্যমে প্রকাশ পায় বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও শিক্ষাকে কতটুকু মূল্যায়ন করেছিলেন।
১৯৫৫ সালে বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদার পরিচালনায় পাকিস্তান বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ নামে যাত্রা শুরু করে স্বাধীনতার পরে দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে বঙ্গবন্ধু অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ১৯৭৩ সালে ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ড. কুদরাত-এ-খুদার অক্লান্ত পরিশ্রমে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে গড়ে ওঠে আরও দুইটি শাখা গবেষণাগার। পরবর্তীতে জয়পুরহাট এবং ঢাকার সাভারের নয়ারহাটে দুইটি শাখা গবেষণাগার স্থাপিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের সদস্যপদ পায়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় ভূউপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন, যার সুফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশ টেলি কমিউনিকেশন আদান-প্রদানে মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করছে। পরমাণু গবেষণার মাধ্যমে দেশকে কীভাবে উপকৃত করা যায় সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১৯৭৩ সালে গঠন করেছিলেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে চারদিকে শুরু হয়েছিল রোগ-শোক এবং হাহাকার। চারিদিকে দেখা দিয়েছিল খাদ্য সংকট। তখন বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করেছিলেন কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তিকে প্রাধান্য না দিলে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর খাবার যোগানো খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে এবং তখন থেকেই তিনি কৃষি গবেষণার উন্নয়নে জোর দেন। ধান গবেষণার গুরুত্ব অনুধাবন করে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে আইন পাসের মাধ্যমে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। এছাড়াও কৃষি গবেষণার মাধ্যমে দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, ইক্ষু গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনসহ অনেক প্রতিষ্ঠান সৃজন করেন। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, ড. কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনসহ আরও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ভিতর দিয়ে বিজ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে একাগ্রতা ছিল, সেটার স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন, সুতীক্ষè লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দেশের সকল গবেষণা প্রতিষ্ঠান বীরদর্পে এগিয়ে চলেছে। যে ধারাবাহিকতা অবশ্যম্ভাবী বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশকে উন্নত থেকে উন্নততর কাতারে নিয়ে যাবে। দেশ গড়ার জন্য যথেষ্ট সময় বঙ্গবন্ধু পাননি। কিন্তু যেটুকু পরিকল্পনা উনি করে গিয়েছিলেন তার বাস্তব প্রতিফলন এবং সুফল আমরা সর্বদা হাতেনাতে পাচ্ছি।
অতি সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পৃথিবীর খুবই কম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাঁর মতো এতটা ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা লাভ করতে পেরেছিলেন। তিনি সর্বদা ভাবতেন, সকল বাঙালি তাঁর বন্ধু। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, স্বাধীন দেশে কোনো বাঙালি তাঁর নিজের বা পরিবারের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে না। আর এই বিশ্বাস থেকেই সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে তিনি থাকতেন তাঁর প্রিয় বাসভবন ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাসায়। বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার এ বাড়িটি বঙ্গবন্ধুর অসম্ভব প্রিয় ছিল। কিন্তু তাঁর এই অগাধ বিশ্বাসের কোনো মূল্যই দেয়নি অকৃতজ্ঞ কিছু নরপশু। ১৯৭৫ সালের এইদিনে ঘাতকেরা ভীরু কাপুরুষের মতো বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে সশস্ত্র আক্রমণ চালায় যে আক্রমণের বর্বরতা ইতিহাসে বিরল। ঘাতকরা সেইরাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে উপস্থিত সবাইকে হত্যা করে। রেহাই পাইনি আট বছর বয়সের নিষ্পাপ ছোট্ট শিশু বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল। এভাবেই নারকীয়-পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ইতিহাসে রচিত হয় বাঙালি জাতির জন্য আরও একটি কালো অধ্যায়। নির্মম এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া খুবই কঠিন।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।
ajoymondal325@yahoo.com
বিভাগ : বিশেষ সংখ্যা
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন

ইসরায়েলে আঘাত হেনেছে গাজা থেকে ছোড়া একাধিক রকেট

৫ বছর পর গোলহীন ম্যানচেস্টার ডার্বি

মার্কিন শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তাব ভিয়েতনামের : ট্রাম্পের জন্য কি তা যথেষ্ট হবে?

প্রতারণার দায়ে ইভ্যালির রাসেল-শামীমার তিন বছরের কারাদণ্ড

‘শূন্য শুল্ক পরিস্থিতি’ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের’ পক্ষে ইলন মাস্ক

মানবপাচার রোধে বাংলাদেশ নিজ প্রতিশ্রুতিতে অটল :স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

বিপুল পরিমাণ গাঁজা পাচারের চেষ্টা ব্যর্থ : বেশ ক’জন গ্রেফতার

মিয়ানমারের ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ৩ হাজার ৪৫৫ ইউএসএআইডির তিন কর্মী বরখাস্ত

ভারতে ওয়াকফ সংশোধনী বিল পাস নিয়ে আসিফ নজরুলের উদ্বেগ

নির্বাচনের সব কাজ ভালোভাবে এগোচ্ছে : সিইসি

আওয়ামী লীগপন্থী ৭২ আইনজীবী কারাগারে, ১১ জনের জামিন

বাঁশখালীতে বিষ দিয়ে বোনের ধান ক্ষেত জ্বালিয়ে দিলো ভাই

নতজানু ও দলকানা সাংবাদিকতা ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটায় -কাদের গণি

কুষ্টিয়ায় ধর্ষণের শিকার সেই শিশুর ঘর পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি -প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি পেশ

আসামিদের ছাড়িয়ে নিতে জীবননগর থানা ঘেরাও

টাকার লোভে আ.লীগকে ফিরিয়ে আনতে চাইছে কিছু রাজনৈতিক দল -নজরুল ইসলাম খান

গফরগাঁওয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেফতার

চুয়েটে লেভেল-১ স্নাতক কোর্সে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু ৯ এপ্রিল

নাটোরে সাংবাদিকের ওপর সন্ত্রাসী হামলা