রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা ও পৌরসভা এলাকায় গোশত সমিতি বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। বাজার থেকে অনেক কমমূল্যে ফ্রেস মাংশ পাচ্ছে মানুষ। এর সাথেযুক্ত বিভিন্ন গ্রামের লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্রতিবছর বাড়ছে গোশত সমিতির সংখ্যা। শুধু মাত্র গোদাগাড়ী পৌর এলাকায় শতাধিক গরু জবাই করা হচ্ছে। গোশত সমিতির প্রত্যেক সদস্য সপ্তাহে ১০০/২০০ টাকা চাঁদা জমা দেন। জমা করা টাকায় গরু কিনে এনে শবে কদরের দিন থেকে শুরু হয় পশু জবাইয়ের কাজ। চলে ঈদের দিন পর্যন্ত। ঈদুল ফিতরের দুই বা এক দিন আগে জবাই করে সদস্যরা গোশত ভাগ করে নেন। এরপর পরের বছরের জন্য তহবিল গঠন করে সমিতির কার্যক্রম চলে।
গোদাগাড়ী পৌরসভার মহিশালবাড়ী, শিবসাগর, মাদারপুর, সিএন্ডবি, গড়েরমাঠ, আঁচূয়া, হাটপাড়া, বারুইপাড়া, রেলওয়ে বাজার, সুলতানগঞ্জ, জামায়াতির মোড়, সারাংপুর, শ্রীমন্তপুর এবং উপজেলার রেলগেট, কদমহাজির মোড়, সাবদিপুর, ভাটোপাড়া, হরিসংকরপুর, পিরিজপুর, বিদিরপুর, প্রেমতলী, কুমুরপুর, রাজাবাড়ী, চাঁপাল, বসন্তপুর, গোগ্রাম, কাঁকনহাট, দেলসাদপুর, রিশিকুল, পাকড়ী, বাসুদেবপুর, বালিয়াঘাটা, কামারপাড়া প্রভূতি এলাকায় সমিতি করার প্রবণতা বেশী বলে জানা গেছে।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহিশালবাড়ী গোশত সমিতির মূল উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী মাইনুল ইসলাম জানান, সমিতিতে এবার ২৪ জন সদস্য। প্রতি সপ্তাহে সদস্য প্রতি ১০০ টাকা করে অর্থ জমা রাখেন। বছর শেষে রোজার ঈদের আগে জমানো টাকা দিয়ে গরু কিনে আজ ২৮ রমজান জবাই করে সমিতির সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় গরু কেনা হয়েছিল চামড়া ৮ হাজার টাকা, ভূড়ি ৪ হাজার টাকা, পাঁ ২৩ শ ৫০ টাকা টাকায় বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। কসাইকে সাড়ে তিন হাজার টাকা দেয়া হয়েছে ভাগ প্রতি মাংশ হয়েছে ৬ কেজি ২শ গ্রাম। প্রতি কেজি ষাঁড় গরুর মাংশ পড়েছে ৬ শ ৮০ টাকা। মহিশালবাড়ী বাজারে সকালে গাভী গরু জবাই করে ষাঁড় গরুর মাংশ বলে ৮০০ / ৮৫০ টাকা কেজি বিক্রি করছেন দেদারসে। তুলনামূলক বাজার দরের চেয়ে কম দামে এবং একসঙ্গে বেশি পরিমাণ ষাঁড়ের গোশত পেয়ে প্রত্যেকেই খুব খুশি হয়।
তিনি জানান, ৫ বছর আগে তিনি গ্রামের কয়েক বন্ধুর সঙ্গে উদ্যোগ নিয়ে এ গোশত সমিতি গঠন করেন। সমিতির মাধ্যমে গরু কিনে মাংস ভাগ করায় কম দামে ফ্রেশ মাংস পাওয়ায় গ্রামের লোকজন ব্যাপক উৎসাহিত হয়।
আমার আর এক বন্ধু শাহাদত শাহর সমিতিতে সদস্য সংখ্যা ৪২ জন্য তারা এ বছর ১ লাখ ৪২ হাজার টাকায় ষাঁড় ক্রয় করেছে। তাদের মাংশ ৬৫০ টাকা কেজি হতে পারে।
অন্য সমিতির সদস্য রফিকুল ইসলাম বাবলু ও ব্যাংকার আবুল কাশেম জানান, তাদের সমিতিতে সভাপতি, সেক্রেটারি ও ক্যাশিয়ার রয়েছেন। ক্যাশিয়ার বানানো হয়ে থাকে। প্রত্যেক সদস্যকে টাকার হিসেব রাখা হয়। তারা এবার ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় রাজশাহী সিটিহাট থেকে একটি ষাঁড় গরু কিনে এনে জাবাই করেছে, মাংশও বেশ সুবিধা হচ্ছে।
কলা ব্যবসায়ী মোঃ ইব্রাহিম ও মাহাতাব উদ্দীন জানান, এ বছর সমিতির সদস্য সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ২টি গরু কেনা হয়েছে । বুধবার জবাই করে সদস্যদের মাঝে মাংশ বন্টন করে দেয়া হবে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মানুষ কমমূল্যে ভাল গরুর মাংশ খেতে পারবে ইনসাল্লাহ। গরুর মাংসের দাম পড়েবে ৬৪০ টাকা।
রাজাবাড়ী এলাকার মতিয়ার রহমান জানান, তারা সারা বছর ধরে সপ্তাহে সপ্তাহে টাকা জমা দিয়েছেন। এতে বছর শেষে ৬ হাজার টাকা জমা হয়েছিল, তিনি টেরই পাননি। কিন্তু এখন একবারে ৬ হাজার দিয়ে তিনি মাংস কিনতে পারতেন না। এছাড়া এখানে যে দাম পড়ছে সে দামে কসাইরা মাংশ বিক্রি করে না। তাতে ওজনে কম, পানি দেওয়া ও তেল-চর্বি, হাড় দিয়ে ভরা থাকে।
বিদিরপুর এলাকার একটি সমিতির সদস্য ভ্যানচালক করিম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ঈদে ছেলেপেলের কাপড়চোপড় কিনে টাকা শ্যাষ অয়া যায়। কোনোমতে তেল-সেমাই কিনি। আবার মাংস কেনব কীভাবে? যখন থেকে সমিতিতে নাম দিয়েছি। ঈদের আগে ৭কেজি মাংস পাইছি।’
মহিশালবাড়ী মহল্লার প্রভাষক রায়হান জানান, গ্রামের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তসহ সব শ্রেণির মানুষ এ সমিতিতে সদস্য হয়েছেন। সদস্যরা বছরে অল্প অল্প করে টাকা জমা রাখেন বলে বছর শেষে তারা টেরই পান না যে এত টাকা হয়েছে। এ পদ্ধতি না থাকলে দরিদ্র মানুষের পক্ষে ৫/৬ কেজি মাংস কেনার সাধ্য হত না। অনেক সময় ২/৩ জনে একজন সদস্য হয়ে মাংশ ভাগ করে আনন্দ উপভোগ করছেন।
এদিকে মাংস বিক্রেতা শামীম রেজা জানান, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তারা আগে যে মাংস বিক্রি করতেন তা এখন অর্ধেকও হচ্ছে না। কারণ গ্রামে গ্রামে একাধিক গোশত সমিতি হয়েছে। সমিতির লোকজন নিজেরাই গরু-মহিষ কিনে জবাই করে মাংস ভাগ করেন।
তবে কসাইয়ের কাজ করা কিছু ব্যক্তি জানান, গ্রামে গ্রামে সমিতি বেড়ে যাওয়ায় তাদের কাজের চাহিদা বেড়ে গেছে।মাংস সমিতির সদস্য জানান ভ্যানচালক ও ব্যবসায়ী ইমাম হোসেন জানান মানুষ মাংস সমিতি করে গরীব, ভ্যানচালক, শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ মাংশ খেতে পারেন। খুব ভাল উদ্যেগ।
শাহাদত ও রবিউল জানান, তারা গ্রুপে ৪ জন কাজ করেন। গরুপ্রতি ৩/৪ হাজার টাকা ইনকাম করছেন। তাদের ১০ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, এখন গ্রামে গ্রামে অনেক সমিতি গড়ে উঠছে। ফলে এত বেশি সংখ্যক পশু জবাই হচ্ছে যা ঈদুল আজহার চেয়ে কম নয়। একটি গরু প্রসেস করতে তাদের দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগে। তারা গরু প্রসেস করতে ৩-৪ হাজার টাকা মজুরি নেন আর মহিষ ৪-৫ হাজার টাকা নেন। ফলে ঈদ মৌসুমে তাদের জনপ্রতি প্রতিদিন ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় থাকছে।
গোদাগাড়ী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ শায়লা শারমিন জানান, সুস্থ সবল গরু জবাই করে জনসাধারণ আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছেন। ভোক্তারা যেমন উপকৃত হচ্ছেন তেমনি গো খামারিরা ঈদুল ফিতরেও একটি বাজার ধরতে পারছেন। এতে খামারি ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হচ্ছেন সমিতিগুলোর পরিচালকরা যদি সরাসরি খামার থেকে পশু সংগ্রহ করতে আগ্রহী হন তাহলে তারা অফিস থেকে তাদের সহযোগিতা করবেন বলে জানান এ কর্মকতা। একই মন্তব্য করেন, ভেটেরিনারি সার্জন ডাঃ রিপা রানী ও প্রানিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডাঃ আরিফুল ইসলাম ।