উন্নয়নের দিগন্ত ‘পদ্মা ব্যারাজ’
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৩ এএম | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম
পদ্মার উজানে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ বা ব্যারাজ নির্মাণ করে ভারত এক তরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ছয় কোটি মানুষ। নাব্য হারিয়ে পদ্মাসহ মৃত প্রায় ৫০ নদী। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে হুমকির মুখে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। ভারতের এই পানি আগ্রাসনের অর্ধশত বছর ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। মরণবাঁধ ফারাক্কা দিয়ে গত পাঁচ দশক ধরে ভারত বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকাকে মহাসংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদও শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। কিন্তু এখন পর্যন্ত নতুন কোনো চুক্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে ঘিরে দেশবাসী নতুন আশার আলো দেখছে।
দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে অনুমোদন পেল দেশের বহুল আলোচিত ও কাক্সিক্ষত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। এ প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গত ১৩ মে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আরো আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্রীয় সমাধান হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও পরিবেশ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ফারাক্কার ভয়াল ছোবলে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের নদীসহ সামগ্রিক পরিবেশ হুমকির মুখে। এ অবস্থায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশ, নদীর জীবন, অর্থনীতি এবং কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে যুগান্তকারী ও বহুমুখী উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। এটি এই অঞ্চলের মরুকরণ রোধ করে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানির ঘাটতি মোকাবিলা, নদীব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সামগ্রিক পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিতব্য ব্যারাজে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনাকে ব্যাপক শক্তিশালী করবে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, সুন্দরবন রক্ষা, নদীর নাব্যসংকট দূরীকরণ, মৎস্য চাষ ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষাসহ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে পদ্মা ব্যারেজের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হবে। পদ্মা ব্যারেজ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪টি জেলায় অর্থনৈতিক রূপান্তর ও বিপ্লব ঘটবে। এ অঞ্চলে বহুমুখী উন্নয়নের দুয়ার উন্মোচিত হবে। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব ঘটবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও মাছের উৎপাদন বাড়বে। সেইসঙ্গে যুক্ত হবে আধুনিক প্রযুক্তির নানা সুযোগ-সুবিধা।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদীর নাব্যসংকট দূর হবে। সারা বছর অভ্যন্তরীণ নৌযোগাযোগ সচল রাখতে সাহায্য করবে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ অনেকাংশে কমিয়ে দেবে। প্রকল্পের আওতায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ইছামতি-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে গোদাগাড়ী পাম্প হাউস, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলার প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে।
এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ব্যারাজের ওপর সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে এটিকে বহুমুখী করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এর ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ জন শ্রমিক কাজের সুযোগ পাবেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এছাড়া ৩ হাজার ৪৫০ একর জমিতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের জন্য সাতটি উপগ্রহ শহর ও আধুনিক গ্রামীণ টাউনশিপ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন কমিয়ে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। প্রকল্পটি দেশের মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ অঞ্চলে প্রভাব ফেলবে। চারটি বিভাগ, ২৬টি জেলা এবং ১৬৩টি উপজেলায় এর সুফল পৌঁছাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে গত জানুয়ারিতে প্রায় ছয় দশকের আলোচনার পর প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। ২৫ জানুয়ারির একনেক সভায় এটি উপস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হলেও উচ্চ ব্যয়ের কারণে তড়িঘড়ি অনুমোদন না দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করে প্রথম ধাপে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অনুমোদনের প্রস্তাব দেয়। সরকারি অর্থায়নে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি পানি নির্গমন পথ, ১৮টি নিম্নস্রোত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, মাছ চলাচলের বিশেষ পথ, নৌযান চলাচলের লক এবং নদীতীর রক্ষাবাঁধ। গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর জন্য তিনটি পানি গ্রহণ কাঠামো নির্মাণ করা হবে। নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে গড়াই-মধুমতি ব্যবস্থায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার খনন এবং হিসনা নদী ব্যবস্থায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। ব্যারাজের মাধ্যমে ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলাধার তৈরি হবে, যেখানে অতিরিক্ত বড় ধরনের ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। এর ফলে পর্যটন, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকা-ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি জলবিদ্যুতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নদীর দুই তীরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
বিভাগ : জাতীয়
মন্তব্য করুন
এই বিভাগের আরও
আরও পড়ুন
রোনালদোকে নিয়েই পর্তুগাল দল ঘোষণা নতুন কোচের
বিদ্যুৎ বিপর্যয়: লন্ডনের কিংস ক্রস স্টেশনে ট্রেন চলাচলে চরম বিশৃঙ্খলা, ভোগান্তিতে যাত্রীরা
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো: ল্যাভরভ
পাটের পাশাপাশি পাটকাঠির চাহিদাও প্রচুর গ্রাম পল্লীতে
সার্ককে ফের সক্রিয় করতে ভুটানের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ
সাগরে লঘুচাপের পূর্বাভাস, রূপ নিতে পারে ঘূর্ণিঝড়ে
সাহস থাকলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের দুর্নীতির তদন্ত করুন: নাহিদ ইসলাম
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ৭৪৭
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সব জেলা পরিষদকে সরকারের জরুরি নির্দেশনা
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হেডের দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড
সাতক্ষীরায় গুড়পুকুর পাড়ে মনসা পূজা অনুষ্ঠিত, এবছরও বসছে না মেলা
লং মার্চে কোনো বাধা সৃষ্টি হলে সে বাধা উপেক্ষা করেই রংপুরের দিকে অগ্রসর হবো : এটিএম আজহারুল ইসলাম
গবাদিপশু পালনে বদলে যেতে পারে বরগুনার গ্রামীণ অর্থনীতি
শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করলেন রাশেদ খান
‘ইংলিশ লেবু’ হয়ে ব্যাচেলর পয়েন্টে আ খ ম হাসান
শেখ হাসিনা কালকেই আসুক, হাতকড়া নিয়ে রিসিভ করব : পর্যটনমন্ত্রী
উখিয়ায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পুরাতন পিস্তল উদ্ধার
টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করে মনিরুল
লং মার্চের নামে আওয়ামীলীগকে মাঠে নামার সুযোগ করে দিলে সেটি ভালো হবে না : রাশেদ খান
বিরল সম্মান : হোয়াইট হাউসে নয়, অ্যান্ড্রুজ ঘাঁটিতেই শি’কে স্বাগত জানাবেন ট্রাম্প