ঢাকা   শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিশ্বনবী সা.-এর চিরন্তন মু’জিযা আল-কুরআন

Daily Inqilab হা. মাও. খন্দকার ফখরুদ্দীন হোসাইনী

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬ এএম | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬ এএম

(পূর্বে প্রকাশিতের পর)

ইয়াহূদীদের ধর্মশাস্ত্র ‘তাওরাত’-এ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্বন্ধে নিম্নরূপ অনেক ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। এ প্রসঙ্গে নিম্নে কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থ থেকে কতিপয় উদ্ধৃতি পেশ করছি:“The Lord thy God will raise up unto thee a prophet frm the midst of thy brethren, like unto me. Unto him ye shall hearken.” -(Duet. 15 : 18)“তোমাদের প্রভু (ঈশ্বর) তোমাদের ভ্রাতৃদিগের মধ্য হতে আমার (মূসার) মতই একজন পয়গম্বর উত্থিত করবেন, তাঁর কথা তোমরা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে।”

অন্যত্র আছে:“I will raise them up aa prophet from among ther brithren, like unto thee, and willl put my words in his mouth and he shall speak unto them all that I shall command him. and it shall come to pass hat whosoever will not hearken unto my words which he shall speak in my name, I will require it of him.” -(Duet, 18 ; 18-19)

 

তাওরাত কিতাব মূলতঃ বর্তমান বাইবেলের একটি অংশ। এটা বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament) বলে পরিচিত। পুরাতন নিয়মের এ গ্রন্থটি ইয়াহূদিদের বিভিন্ন পবিত্র সহীফার সংকলন। যাকে ইয়াহূদি পন্ডিতগণ তিন অংশে বিভক্ত করেছেন:

১. তাওরাত (বিধি-বিধান)।

২. আম্বিয়ায়ে কেরাম-এর সহীফাসমূহ (prophets) ও

৩. পবিত্র সহীফাসমূহ (Hagiographa অথবা কেবল Writings)।

উপরোক্ত বিভক্তি হতে এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, সমগ্র পুরাতন নিয়ম তাওরাত নয়; কেননা, তাওরাত ব্যতীত আরও সহীফা রয়েছে সেগুলি ইয়াহূদীদের পবিত্র গ্রন্থের অপরিহার্য অংশ। তবে ঐ সমস্ত সহীফার মধ্যে তাওরাত-এর একটি বিশেষ গুরুত্ব ও পবিত্র আসন রয়েছে।

ফরাসী দার্শনিক ও পন্ডিত Capellus (আনু. ১৬২৪ খৃ.) প্রমাণ করেন যে, তাওরাতের যে মূল হিব্রু পাঠ বর্তমান, তা সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ নয়। Reimarus নামক একজন জার্মান পন্ডিত ১৭৪৭ খৃস্টাব্দে এক বিরাট গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যাতে তিনি বাইবেলকে আল্লাহর পক্ষ হতে অবতারিত (revelation/ওহী) হওয়া অস্বীকার করেন। আরও একজন জার্মান পন্ডিত Lessing (আনু. ১৭২৯-৮১খৃ.)-ও দাবী করেন যে, বাইবেলে উল্লেখিত ঘটনাবলীর উপর ইতিহাসের বুনিয়াদ রাখা যেতে পারে না। বাইবেলের সমালোচনামূলক গবেষণার দিক দিয়ে খৃষ্টীয় সপ্তদশ ও অষ্টদশ শতাব্দী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা উল্লেখিত পন্ডিতবর্গ ছাড়াও কতিপয় বিখ্যাত দার্শনিকও এই জাতীয় মতামত পেশ করেন। যাদের মধ্যে দার্শনিক স্পিনোযা (Spinozg) ও হব্স (Hobbes) -এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য।-ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ পৃ.১১১-১১৩

যাবূর: ‘যুবুর’ আরবী শব্দের বহুবচন যাবূর অর্থাৎ লিখিত বিষয় বা বস্তু; এমন গ্রন্থ যা স্পষ্ট লিপিতে লিখিত হয়ে থাকে। কিন্তু পরিভাষায় যাবূর শব্দ দ্বারা ঐ আসমানী কিতাবকে বোঝানো হয় যা হযরত দাউদ আ.-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এ মর্মে কুরআনে কারীমে সূরা নিসার ১৬৩ নং আয়াতাংশে ইরশাদ হয়েছে : “আমি দাঊদকে যাবূর দান করেছিলাম।” এবং সূরা আম্বিয়ার ১০৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে: “ওয়ালাক্বাদ কাতাবনা ফিয্যাবূরি মিন বা’দিয্যিকরি” আয়াতদ্বয়ে যে ‘যাবূর’ শব্দের উল্লেখ রয়েছে তা শাব্দিক অর্থে নয়; বরং মুফাস্সিরীনে কেরামের মতে এ দ্বারা হযরত দাউদ আ.-এর উপর অবতীর্ণ আসমানী কিতাবকেই বোঝানো হয়েছে। ইমাম রাগিব ইস্পাহানী রহ. বলেন, “অনেকের মতে যাবূর এমন এক কিতাবের নাম, যা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক তত্ত্বকথা সম্বলিত, যার মধ্যে শরীয়তের কোন আহকাম নেই। আর কিতাব তাকেই বলে, যার মধ্যে শরঈ আহকাম ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের কথা থাকে। হযরত দাঊদ আ.-এর যাবূর গ্রন্থে শরীয়তের কোন নির্দেশ ছিল না। জ্ঞানপূর্ণ তাত্ত্বিক সহীফা হওয়ার কারণে তাকে যাবূর বলা হয়েছে। খলীফা হারুনুর রশীদের আযাদকৃত গোলাম আহমাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে সালাম থেকে বর্ণিত আছে যে, যাবূর দ্বারা ঐ সকল মাযামীর/গীত কে বোঝানো হয়েছে যা ইয়াহূদী ও নাসারাগণ সাধারণভাবে ব্যবহার করত। যার সংখ্যা ছিল ১৫০টি। - ইসলামী বিশ্বকোষ খন্ড,২১ ও মাও.ইসহাক ফরীদী রহ. রচিত “ইসলামী আকীদা”

ইঞ্জীল: হযরত ঈসা আ.-এর উপর অবতীর্ণ আসমানী কিতাবের নাম। বর্তমানে যা বিকৃতরূপে বাইবেল নামে পরিচিত। হযরত ঈসা আ. ছিলেন ইসরাঈলী বংশোদ্ভূত। তাঁর মাতৃভাষা, আঞ্চলিক ভাষা ও ধর্মীয় ভাষা ছিল হিব্রু। কেউ কেউ একে হিব্রু মিশ্রিত সুরিয়ানী ভাষা বলে বর্ণনা করেছেন। অধিকন্তু বলা যায় তার ভাষা ছিল আরামী বা আরামী-র কোন শাখা। ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা-র বর্ণনামতে তিনি ও তাঁর শিষ্যগণ আরামী ভাষায় কথা বলতেন। অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে মূল ইঞ্জীলের ভাষা ছিল সুরিয়ানী। বলাবাহুল্য, বাইবেল পুরাতন নিয়ম ও নতুন নিয়মের সমষ্টি হিসেবে বাইবেলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। যথা:

১. পুরাতন নিয়ম (Old Testament)। এ অংশটি মূলতঃ তাওরাত। যা ইয়াহূদীদের বিভিন্ন সহীফার সংকলন।

২. নতুন নিয়ম (New Testament)। এ অংশটি মূলতঃ ইঞ্জীল ও অন্যান্য সহীফা সম্বলিত।

‘ইঞ্জীল’ শব্দটিকে সাধারণভাবে একটি গ্রীক শব্দরূপে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। গ্রীক ভাষায় শব্দটির অর্থ সুসংবাদ। অক্সফোর্ড অভিধানে বলা হয়েছে শব্দটি anggelos থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর অর্থ পয়গম্বর। একটি দুর্বল মতানুসারে যার অর্থ মূল, ভিত্তি, কোন কিছু বের করা। এরূপ হলে ইঞ্জীল শব্দের ভাবার্থ হবে জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎপত্তিস্থল। ‘তাজুল ঊরূস’ গ্রন্থকার ইঞ্জীল শব্দটিকে সুরিয়ানী ভাষা থেকে উদ্ভূত বলেছেন। সম্ভবতঃ ইঞ্জীলকে ইঞ্জীল (অর্থাৎ সুসংবাদ) বলার কারণ হলো- হযরত ঈসা আ. শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুসংবাদ নিয়ে এসেছিলেন। যেমন কুরআনে হাকীমে সূরা সাফ্ফ এর ৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে : “এবং সুসংবাদদাতারূপে এমন রসূলের যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমদ।”

বাইবেল: (Bible) শব্দের অর্থ গ্রন্থসমূহের সংকলন। এটি মধ্যযুগীয় ল্যাটিন ভাষা থেকে গৃহীত। বাইবেল সমগ্র ইয়াহূদী ও খ্রিস্টান সমাজের ধর্মীয় গ্রন্থের দুইটি অংশ তথা ১. পুরাতন নিয়ম (Old Testament) ও ২. নতুন নিয়ম (New Testament)- এর সমষ্টিকে বাইবেল বলা হয়। প্রকাশ থাকে যে, নতুন নিয়মের তুলনায় পুরাতন নিয়ম বৃহদাকারের। গোটা বাইবেল যদিও সমগ্র ইয়াহুদী ও খ্রীস্টান সমাজের ধর্মীয় গ্রন্থ। কিন্তু ইয়াহুদিদের মৌলিক ধর্মীয় গ্রন্থ হলো পুরাতন নিয়ম। ইয়াহূদীগণ নতুন নিয়ম মান্য করে না। খ্রিস্টানগণ প্রথম থেকেই পুরাতন নিয়মকে তাদের পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে মেনে নিয়েছে, বরং খ্রিস্টীয় প্রথম/দ্বিতীয় শতাব্দীতে সাধারণভাবে তাদের পবিত্র গ্রন্থ পুরাতন নিয়মই ছিল। তবে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে বর্তমান আকারে রক্ষিত নতুন নিয়মকে তারা মেনে নেয়। - ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা-র Chambers End Bible শিরো.

ড. মরিস বুকাইলি ‘বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান’ গ্রন্থের ৯০-৯২ পৃষ্ঠায় লিখেন, খ্রীস্টধর্মের গোড়া থেকে যে সব ধর্মীয় রচনাবলী চালু ছিল, সেগুলিতে কোথাও বাইবেলের নতুন নিয়মে সন্নিবেশিত চারটি সুসমাচারের (বর্তমান ইঞ্জিলের ১-৪ খন্ডের) কোন উল্লেখ নাই। আসলে এই চার সুসমাচারের উল্লেখ আমরা দেখতে পাই পৌলের রচনাবলী প্রকাশিত হওয়ার অনেক পরের বিভিন্ন রচনায়। সময়টা দ্বিতীয় খ্রীস্টশতাব্দীর মাঝামাঝি- সঠিকভাবে বলতে গেলে, ১৪০ খ্রীস্টাব্দের দিকে। এই সময়ের বিভিন্ন রচনাতে সুসমাচারসমূহের একটি সংকলনের উল্লেখ দেখা যায়। এ ছাড়া দ্বিতীয় শতাব্দীতে দেখা যায়, বহু খ্রীস্টান লেখক পৌলের চিঠিপত্র সম্পর্কে পরিজ্ঞাত ছিলেন। ১৯৭২ সালে সম্পাদিত ‘ইক্যুমেনিক্যাল ট্রান্সলেশন অব দি বাইবেল,নিউ টেস্টামেন্ট’ এর ভূমিকায় এসব তথ্যের উল্লেখ আছে।-(Pub, Editions du Cerf et las Bergers et les Mages, Paris.)

এই গ্রন্থখানি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য এ কারণে যে, শতাধিক ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট বিশেষজ্ঞ সম্মিলিতভাবে এই অনুবাদকর্মটি সম্পন্ন করেছেন। বস্তুত, মথি ও মার্ক এবং লুক্ লিখিত বাইবেলের তিনটি সুসমাচার ৭০ খ্রীস্টাব্দের পূর্বে রচিত হয়েছিল বলে এ ট্রাইকট যে দাবী তুলেছেন, তা মোটেও ধোপে টেকেনা। এর মধ্যে মার্ক লিখিত সুসমাচারটি ব্যতিক্রম হলেও হতে পারে। অনেকের দেখাদেখি এ ট্রাইকটের মতো খ্যাতিমান ও বিজ্ঞ ভাষ্যকারও আগু বাড়িয়ে এসে সুসমাচার লেখকদের একেবারে প্রেরিত অর্থাৎ যীশুর নির্বাচিত সহচর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ কারণে তিনি এইসব সুসমাচার রচনার যে তারিখ নির্দেশ করেছেন, তা হয়ে পড়েছে যীশুর জীবনকালের সমসাময়িক। পক্ষান্তরে যোহন সম্পর্কে এ ট্রাইকট জানাচ্ছেন যে, যোহন মোটামুটিভাবে ১০০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। অথচ সাধারণভাবে খ্রীস্টানগণ সব সময়ই যোহনকে যীশুর সাথে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদানকারী ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। এদিকে বাইবেলের যে সুসমাচারটি যোহনের নামে চলে আসছে সে যোহন আদৌ সেটির লেখক কিনা, তা সাব্যস্ত করাও কঠিন। তবুও অন্য অনেকের সাথে এ ট্রাইকটের মতো বিজ্ঞ ভাষ্যকারও যোহনকে (মথির মতোই) সুসমাচারে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনার ‘রাজসাক্ষী’ হিসাবে উপস্থাপিত করেছেন। বেশীর ভাগ সমালোচকই কিন্তু যোহন কর্তৃক ৪র্থ সুসমাচার রচনার ধারণা সমর্থন করেন না।

এখানে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বাইবেলের নতুন নিয়মের সুসমাচার চারটি যদি ‘প্রেরিত’ তথা যীশুর সহচরদের ‘স্মৃতিকথা’ না হয়ে থাকে, তাহলে এ সব এলো কোত্থেকে? ক্যালম্যান তাঁর ‘দি নিউ টেস্টমেন্ট’ পুস্তকে বলেছেন : “মার্ক, মথি ও লুক লিখিত সুসমাচার তিনটির বর্ণনাভঙ্গি নিখুঁত সাহিত্যগুণসম্পন্ন হতে পেরেছে। কিন্তু কোনো বর্ণনারই ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নাই।” (Pub Presses Universitaires de France Paris 1967)

কথিত আছে যে, উপরোল্লেখিত চারটি সুসমাচার উপরোক্ত চার শিষ্য কর্তৃক রচিত। কিন্তু মথি, মার্ক, লুক ও যোহন-এর মধ্যে যোহন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তিনি হযরত ঈসা আ.-এর সাথী ছিলেন। অবশিষ্ট তিনজন সম্পর্কে গবেষকদের মত হলো তারা হযরত ঈসা আ.-এর শিষ্য নন। ইঞ্জীল শরীফ হিসেবে পরিচিত এই সুসমাচারসমূহ কখন কিভাবে রচিত হয়েছিল সে সম্পর্কে ড. মরিস বুকাইলি বলেন, হযরত ঈসা আ. কে আসমানে উঠিয়ে নেয়ার সত্তর বছর পর নিউ টেষ্টামেন্টের সূসমাচারসমূহ লিপিবদ্ধ করা হয়। পুস্তক আকারে লিপিবদ্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ ঐশী বাণীসমূহ জনকথা তথা মানুষের স্মৃতি-নির্ভর কাহিনী ছিল মাত্র। -বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান

ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ১১ সংস্করণে বলা হয়েছে: যতদূর জানা যায় হযরত ঈসা আ. ও তাঁর সহচরগণ তাদের জীবদ্দশায় পুরাতন নিয়মকে নিজেদের হিদায়েতের জন্য যথেষ্ট মনে করতেন। ফলে হযরত ঈসা আ.-এর মৃত্যুর পর ২০ বৎসর পর্যন্ত কেউই নতুন গ্রন্থ সংকলনের প্রয়োজন অনুভব করেনি। তারপর প্রয়োজন দেখা দিলে আদি পুস্তক (Old Testament) কে নমুনা হিসেবে সামনে রেখে ধীরে ধীরে ইঞ্জীল সংকলনের কাজ আরম্ভ করা হয়। সম্ভবত : Origen (১৮৫-২৫৪ খৃ.)-ই ছিলেন প্রথম খৃস্টান পন্ডিত যিনি পরিস্কারভাবে ধরতে পেরেছিলেন যে, বাইবেল, বিশেষতঃ পুরাতন নিয়ম-এর ভিতর কতকগুলি বাক্য এমন যা হয়তো অর্থগত দিক থেকে বিশুদ্ধ নয় অথবা নৈতিকতার মানদন্ডে নিম্নমানের ও নিন্দার্হ। কিন্তু তিনি রূপক বর্ণনা পদ্ধতি অবলম্বন করত: নিজেকে এভাবে প্রবোধ দেন যে, এরূপ ক্ষেত্রে বাহ্যিক শব্দ দ্বারা উচ্চতর অর্থ অনুসন্ধান করতে হবে। অগাষ্টিন (৩৫৪-৪৩০খৃ.) ও টমাস একুইনাস (১২২৫-৭৪খৃ.) একই মত গ্রহণ করেন। -প্রাগুক্ত

ড. মরিস বুকাইলি আরও বলেন, একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, বাইবেলের এসব গ্রন্থে বিভিন্ন পয়েন্টম্বর কর্তৃক প্রাপ্ত ওহী বা প্রত্যাদেশের সংমিশ্রণ অবশ্যই রয়েছে কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা এই যে, এসব প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত বাণীর ভিত্তিতে সেকালের লেখকরা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে যেসব রচনা আমাদের উপহার দিয়েছেন তা আমরা ওল্ড টেস্টামেন্ট বা তাওরাত নামে পাচ্ছি। সেকালের লেখকরা বিভিন্ন নবীর প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত বাণীর মধ্যে পরিবর্তন তো করেছেনই, অধিকন্তু তারা নিজেদের স্বার্থে নিজস্ব যুগের এবং পরিবেশের প্রয়োজনে বর্ণিত বিষয়বস্তুর ব্যাপক রদবদল, এমনকি সংযোজন ঘটাতেও বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ করেননি। তাই লক্ষ্য করা যায় যে, ইয়াহূদিদের গির্জার যেমন বিভিন্নতা রয়েছে তেমনি গির্জাভিত্তিক বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে সম্পূর্ণ পৃথক পৃথক বাইবেল। কেননা বাইবেল সম্পর্কে গির্জাভিত্তিক ধারনা ভিন্ন ভিন্ন। তাই ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় অনুবাদের বেলায় তাদের পক্ষে একমতে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। - বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান, ইসলামী বিশ্বকোষ ৩য় খ.

আজ পশ্চিমারা এক দুর্গতির জালে আটকা পড়েছে সত্য, কিন্তু তারা যেহেতু অনুসন্ধিৎসু-নির্ভীক ও জঙ্গম, সেহেতু তারা স্বাধীন ও সংস্কারমুক্ত এবং যেহেতু তারা সততই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী, হয়তোবা তাই সকল কুহকিনী মিথ্যার দাসত্ব ছিন্ন করে প্রকৃত সত্যকে তারা একদিন সাদরে আলিঙ্গন করবেই। তাদেরই অন্যতম বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর হান্টিংটন যথার্থই বলেছেন যে, আগামী দিনের যুদ্ধ সংঘটিত হবে সভ্যতার সঙ্গে সভ্যতার, সংস্কৃতির সাথে সংস্কৃতির, সেই যুদ্ধে বর্তমান ধনবাদী ব্যবস্থায় লজ্জিত দুঃখিত ও অনুতপ্ত মার্কিনীরা যদি ইসলামের সর্বকল্যাণময় সুশীতল ছায়াতলে এসে সমবেত হয়, পৃথিবী তাতে বিস্মিত হবেনা। মহান প্রভুর রহস্যময় অভিপ্রায় হয়তোবা এরকমই। আমরা এতে আশাহত নই যে, মাওলাপাক মুসলিমের লাঞ্চিত মস্তকে আবার পরিয়ে দেবেন আধুনিক বিশ্বের সম্মানিত উষ্ণীষ। আল্লাহুম্মাহদিনাস্ছিরা-ত্বাল মুসতাক্বীম !!! (সমাপ্ত)

লেখক: প্রবন্ধকার, গ্রন্থকার ও শায়খুল হাদীস জামিয়া ইসলামিয়া ইলমুল ইলাহী ১৭৩ দারুসসালাম ঢাকা।


বিভাগ : ধর্ম দর্শন


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

আরও পড়ুন

ময়মনসিংহ সুইমিং পুলে ডেঙ্গুর ‘আস্তানা’!

ময়মনসিংহ সুইমিং পুলে ডেঙ্গুর ‘আস্তানা’!

ম্যাকলমোর বিতর্কে এবার আইরিশ রেডিওতে বন্ধ এড শিরানের গান

ম্যাকলমোর বিতর্কে এবার আইরিশ রেডিওতে বন্ধ এড শিরানের গান

ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে মানিকগঞ্জে যুবদলের পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কর্মসূচি

ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে মানিকগঞ্জে যুবদলের পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কর্মসূচি

মক্কায় হামলা চালায়নি হুথিরা, মুসলিম বিশ্বের সহানুভূতি পেতে মিথ্যাচার সউদীর!

মক্কায় হামলা চালায়নি হুথিরা, মুসলিম বিশ্বের সহানুভূতি পেতে মিথ্যাচার সউদীর!

কক্সবাজার ঘিরে সরকারের মহাপরিকল্পনা

কক্সবাজার ঘিরে সরকারের মহাপরিকল্পনা

ইনকিলাবের সাংবাদিক হাফিজুর রহমান মিন্টুর ইন্তেকাল

ইনকিলাবের সাংবাদিক হাফিজুর রহমান মিন্টুর ইন্তেকাল

উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়বে ভাবা মূর্খদের কাজ: কিম ইয়ো-জং

উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়বে ভাবা মূর্খদের কাজ: কিম ইয়ো-জং

জাতিসংঘ অধিবেশনে পেজেশকিয়ানসহ ইরানি শীর্ষ নেতাদের ভিসা দিল যুক্তরাষ্ট্র

জাতিসংঘ অধিবেশনে পেজেশকিয়ানসহ ইরানি শীর্ষ নেতাদের ভিসা দিল যুক্তরাষ্ট্র

ছুটির দিনে সকালে ‘অস্বাস্থ্যকর’ ঢাকার বাতাস

ছুটির দিনে সকালে ‘অস্বাস্থ্যকর’ ঢাকার বাতাস

ইরান নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত ট্রাম্পের

ইরান নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত ট্রাম্পের

ফরিদপুরে ‘শ্রমিক কল্যাণ’এর নামে সড়কে চাঁদাবাজি

ফরিদপুরে ‘শ্রমিক কল্যাণ’এর নামে সড়কে চাঁদাবাজি

আত্রাই বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় মাছ ফিরিয়ে আনতে ৮ স্থানে ২৭১ কেজি পোনা অবমুক্ত

আত্রাই বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় মাছ ফিরিয়ে আনতে ৮ স্থানে ২৭১ কেজি পোনা অবমুক্ত

সেনাবাহিনী-হুথি-সউদী সংঘাতে ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় নিহত ৬৩

সেনাবাহিনী-হুথি-সউদী সংঘাতে ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় নিহত ৬৩

মিশিগানে মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

মিশিগানে মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

বাটেক্সপোতে জাতীয় ঐকমত্যের ঐতিহ্য ধরে রাখার আহ্বান মিয়া গোলাম পরওয়ারের

বাটেক্সপোতে জাতীয় ঐকমত্যের ঐতিহ্য ধরে রাখার আহ্বান মিয়া গোলাম পরওয়ারের

কক্সবাজারে পুলিশের অভিযানে ১০ আসামি গ্রেফতার

কক্সবাজারে পুলিশের অভিযানে ১০ আসামি গ্রেফতার

হরমুজে সেনা পাঠাবে না দক্ষিণ কোরিয়া

হরমুজে সেনা পাঠাবে না দক্ষিণ কোরিয়া

ফরিদপুরে নিজ জমির গাছ কাটতেও লাগবে বন বিভাগের অনুমতি

ফরিদপুরে নিজ জমির গাছ কাটতেও লাগবে বন বিভাগের অনুমতি

ভূমি সেবায় ১ শতাংশ দুর্নীতিও বরদাশত নয়: ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

ভূমি সেবায় ১ শতাংশ দুর্নীতিও বরদাশত নয়: ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের আগেই রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের

ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের আগেই রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের