দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

তুরস্কে গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরেছেন এরদোয়ান

Daily Inqilab অনলাইন ডেস্ক

২৬ মার্চ ২০২৫, ০৩:৩৫ পিএম | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৫, ০৩:৩৬ পিএম

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ২২ বছর ধরে তুরস্ক শাসন করছেন। তার শাসনামলে দেশটির গণতান্ত্রিক ভিত্তি ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়েছে। ২০১৭ সালে সংবিধান পরিবর্তনের পর থেকে এরদোয়ান প্রায় অবারিত ক্ষমতায় দেশ পরিচালনা করছেন। তার সরকার এখন তুরস্কের বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা সংস্থাসহ প্রায় সব গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

 

তবুও এতদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তুরস্ককে ‘প্রতিযোগিতামূলক স্বৈরতন্ত্র’ বলে অভিহিত করতেন যেখানে বিরোধী দল তত্ত্বগতভাবে নির্বাচন জিততে পারে এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাঝে মাঝে জিতেও থাকে। কিন্তু, গত ১৯ মার্চ ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুর গ্রেফতারের ঘটনা সেই চিত্র বদলে দিতে পারে।

 

এরদোয়ানকে অনেকেই ১৯৯০-এর দশক থেকে সম্ভাব্য একনায়ক হিসেবে দেখে আসছেন। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্র হলো একটি ট্রাম; গন্তব্যে পৌঁছালে তা থেকে নেমে যেতে হয়।’ যদিও ক্ষমতার শুরুর বছরগুলোতে এরদোয়ান অনেককে আশ্বস্ত করেছিলেন, তবে পরে তিনি বিরোধীদের দমন করতে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।

 

২০১৫ সালে কুর্দিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে বহু নেতাকে কারাগারে পাঠান এরদোয়ান। পরের বছর ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়, যাদের অনেকেরই অভ্যুত্থানের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। একই সঙ্গে তিনি গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেন।

 

কিন্তু ইমামোগলুর গ্রেফতার এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। ইস্তাম্বুলের এই জনপ্রিয় মেয়র ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ানের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসছিলেন। গত বছর তার দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) স্থানীয় নির্বাচনে এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একেপি) পার্টিকে পরাজিত করে চমক দেখায়। অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও দুর্নীতির অভিযোগ এরদোয়ানের জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইমামোগলু সিএইচপির প্রধান নেতা হয়ে উঠলে তুরস্কে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে কারাগারে পাঠানো প্রমাণ করে, এরদোয়ান ক্ষমতা হারানোর চেয়ে গণতন্ত্র বিলুপ্ত করাকেই শ্রেয় মনে করছেন।

 

এরদোয়ান এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ আন্তর্জাতিক মহল এখন দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক গণতন্ত্রের মানদণ্ড নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছে না। ইউরোপ ব্যস্ত রয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ট্রাম্পের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তুরস্ককে প্রয়োজন মনে করছে, বিশেষত ইউক্রেনের জন্য সম্ভাব্য শান্তিরক্ষী বাহিনী সরবরাহের ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে, ২০১৫-১৬ সালের শরণার্থী সংকটের পর থেকে ইইউ তুরস্কের ওপর নির্ভর করছে অভিবাসীদের আটকে রাখার জন্য।

 

ইমামোগলুর গ্রেফতারের পর ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিক্রিয়াও ছিল নড়বড়ে, তারা কেবল তুরস্ককে ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে’ বলেই ক্ষান্ত থেকেছে। যদিও ফ্রান্স ও জার্মানি তুলনামূলকভাবে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আসলে, ইউরোপ আরও কঠোর হতে পারতো। তুরস্কের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে এবং এরদোয়ানের কৌশলগত স্বার্থে আঘাত হেনে ইইউ তাকে চাপ দিতে পারতো।

 

তবে আন্তর্জাতিক শক্তি এরদোয়ানকে স্বৈরতন্ত্রে রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে না—তা পারে কেবল তুর্কি জনগণই। কিছু নাগরিক তার কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিষয়ে শঙ্কিত, অন্যরা ক্রমশ খারাপ হতে থাকা অর্থনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিনিয়োগকারীরা সংস্কারের আশা ছাড়ছেন।

 

এরই মধ্যে ইমামোগলুর গ্রেফতারের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছে এবং পুলিশি দমন-পীড়নের মুখোমুখি হচ্ছে। গণতান্ত্রিক বিশ্ব তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করবে, কিন্তু বাস্তবে তাদের জন্য কিছু করার সম্ভাবনা খুব কম।


বিভাগ : আন্তর্জাতিক


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

আনুষ্ঠানিক বন্ধ ইউএসএআইডি
৯৫ বছরে এমন ভূমিকম্প দেখেনি থাইল্যান্ড
রাজতন্ত্রের দাবিতে নেপালে বিক্ষোভ সংঘর্ষ, সাংবাদিকসহ নিহত ২
ফিলিস্তিনপন্থি প্রতিবাদে ৩০০ শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল
ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপকে কাজে লাগাতে পারে পেন্টাগন
আরও
X

আরও পড়ুন

ফিরেই মেসির গোল, মায়ামির জয়

ফিরেই মেসির গোল, মায়ামির জয়

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে স্থল মাইন বিস্ফোরণে এক ব্যক্তির পা ক্ষত-বিক্ষত

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে স্থল মাইন বিস্ফোরণে এক ব্যক্তির পা ক্ষত-বিক্ষত

বহুল সমালোচিত ডিজনির 'স্নো হোয়াইট' বক্স অফিস শীর্ষে

বহুল সমালোচিত ডিজনির 'স্নো হোয়াইট' বক্স অফিস শীর্ষে

এমবাপের জোড়া গোলে রিয়াল মাদ্রিদের জয়

এমবাপের জোড়া গোলে রিয়াল মাদ্রিদের জয়

দোষী প্রমাণিত হলে কি শাস্তি হতে পারে আনচেলত্তির?

দোষী প্রমাণিত হলে কি শাস্তি হতে পারে আনচেলত্তির?

আনুষ্ঠানিক বন্ধ ইউএসএআইডি

আনুষ্ঠানিক বন্ধ ইউএসএআইডি

৯৫ বছরে এমন ভূমিকম্প দেখেনি থাইল্যান্ড

৯৫ বছরে এমন ভূমিকম্প দেখেনি থাইল্যান্ড

রাজতন্ত্রের দাবিতে নেপালে বিক্ষোভ সংঘর্ষ, সাংবাদিকসহ নিহত ২

রাজতন্ত্রের দাবিতে নেপালে বিক্ষোভ সংঘর্ষ, সাংবাদিকসহ নিহত ২

ফিলিস্তিনপন্থি প্রতিবাদে ৩০০ শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল

ফিলিস্তিনপন্থি প্রতিবাদে ৩০০ শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল

নালিতাবাড়ীতে ৯৫ ড্রেজার ধ্বংস কারাদণ্ড ৩ জন কে

নালিতাবাড়ীতে ৯৫ ড্রেজার ধ্বংস কারাদণ্ড ৩ জন কে

ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপকে কাজে লাগাতে পারে পেন্টাগন

ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপকে কাজে লাগাতে পারে পেন্টাগন

‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় বাধাদানকারীদের জাতি ক্ষমা করবে না’

‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় বাধাদানকারীদের জাতি ক্ষমা করবে না’

নাটক প্রেম ভাই

নাটক প্রেম ভাই

নাটক লাস্ট উইশ

নাটক লাস্ট উইশ

ঈদে সায়েরা রেজার নতুন গান

ঈদে সায়েরা রেজার নতুন গান

ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পেয়েছে অপার্থিবের প্রথম অ্যালবাম আবছা নীল কণা

ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পেয়েছে অপার্থিবের প্রথম অ্যালবাম আবছা নীল কণা

নগরকৃষকদের নিয়ে কৃষকের ঈদ আনন্দ

নগরকৃষকদের নিয়ে কৃষকের ঈদ আনন্দ

হানিফ সংকেতের ঈদের নাটক ‘ঘরের কথা ঘরেই থাক’

হানিফ সংকেতের ঈদের নাটক ‘ঘরের কথা ঘরেই থাক’

মিয়ানমারে ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১৬০০ ছাড়াল

মিয়ানমারে ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১৬০০ ছাড়াল

ভূমিকম্প বিধ্বস্ত থাইল্যান্ডের রাস্তায় সন্তানের জন্ম দিলেন তরুণী

ভূমিকম্প বিধ্বস্ত থাইল্যান্ডের রাস্তায় সন্তানের জন্ম দিলেন তরুণী