আইফোন চাই, না হলে জীবন শেষ! সন্তানকে প্রযুক্তির নেশা থেকে বাঁচাবেন কীভাবে?
২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৭ এএম | আপডেট: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
একটি ফোন। দাম হয়তো এক লাখ টাকা। কারও কাছে সেটি নিছক একটি প্রযুক্তিপণ্য, কারও কাছে আবার সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু সেই ফোনটি যদি কোনো কিশোরের কাছে নিজের সম্মান, বন্ধুদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কিংবা ‘আমি কে’-এই প্রশ্নের উত্তর হয়ে যায়, তখন বিপদটা ফোনের দামে থাকে না, বিপদটা থাকে তার মাথার ভেতরে।
সম্প্রতি ভারতের মহারাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনা সেই বিপদের ভয়াবহ দিকটি সামনে এনেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৮ বছর বয়সী এক তরুণকে নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ফোন কেনা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। পরে সে পাহাড়ের কিনারায় চলে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলে। শেষ পর্যন্ত তরুণটি প্রাণ হারায়; তাকে বাঁচাতে গিয়ে তার বাবাও পড়ে যান এবং পরে মা-ও প্রাণ হারান।
ঘটনাটি এতটাই মর্মান্তিক যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে অনেকেই প্রশ্ন করছেন-একটি ফোনের জন্য একজন মানুষ কীভাবে নিজের জীবনকে এত তুচ্ছ ভাবতে পারে?
কিন্তু প্রশ্নটি আসলে আরও গভীর।
ফোন কি আসলেই আসল অপরাধী?
না।
একটি আইফোন, অ্যান্ড্রয়েড ফোন, গেমিং কনসোল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে কোনো শিশুকে আত্মহত্যাপ্রবণ বানায়-এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
বরং প্রযুক্তি অনেক সময় এমন কিছু মানসিক ও সামাজিক সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে, যেগুলো আগে থেকেই শিশুর ভেতরে তৈরি হয়েছে।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসও এখন শুধু ‘কত ঘণ্টা স্ক্রিন দেখছে’-এই হিসাবের বাইরে গিয়ে শিশুর বয়স, পরিপক্বতা, কনটেন্ট, পারিবারিক পরিবেশ, ঘুম, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে।
অর্থাৎ, সমস্যাটি অনেকটা এমন- ফোন হাতে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ফোন ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া হয়নি।
১. ‘আমারও চাই’ থেকে ‘আমার থাকতেই হবে’
শিশু আগে দেখত পাশের বাড়ির ছেলের নতুন সাইকেল। এখন সে দেখে বন্ধুর হাতে সর্বশেষ মডেলের ফোন, দামি হেডফোন, স্মার্টওয়াচ কিংবা গেমিং ডিভাইস।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই তুলনাটাকে আরও তীব্র করেছে।
একজন কিশোর দিনের পর দিন এমন ভিডিও দেখতে পারে যেখানে দামি ফোন, পোশাক, গাড়ি, রেস্টুরেন্ট ও বিলাসী জীবনকে সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
ধীরে ধীরে তার মস্তিষ্কে একটি বিপজ্জনক ধারণা তৈরি হতে পারে- আমার কাছে এটা নেই মানে আমি পিছিয়ে আছি।
তারপর শুরু হয়-
-
ওর আছে, আমার নেই কেন?
-
আমার সব বন্ধুর আছে।
-
আমাকে নিয়ে সবাই হাসে।
-
আমার বাবা-মা আমাকে কিছুই দিতে চান না।
এই ‘চাই’ যখন ‘অধিকার’ হয়ে যায়, তখন প্রত্যাখ্যান সহ্য করার ক্ষমতা কমতে থাকে।
২. শিশুকে সবকিছু দিয়ে দেওয়াও সবসময় ভালোবাসা নয়
অনেক বাবা-মা সন্তানের কান্না থামাতে ফোন দেন।
-
খেতে বসবে না? ফোন দিন।
-
পড়তে বসবে না? ফোন দিন।
-
বাইরে গেলে বিরক্ত করবে? ফোন দিন।
-
চুপ থাকবে? ফোন দিন।
অর্থাৎ ফোন হয়ে যায় শিশুর instant reward।
শিশু তখন শিখে যায়-অস্বস্তি হলেই একটি ডিভাইস চাইতে হবে।
কিন্তু জীবনের বড় শিক্ষা হলো, সব চাওয়া পূরণ হয় না।
যে শিশু ছোটবেলা থেকে ‘না’ শুনতে শেখেনি, সে বড় হয়ে প্রত্যাখ্যান, ব্যর্থতা, অপেক্ষা কিংবা আর্থিক সীমাবদ্ধতা সামলাতে সমস্যায় পড়তে পারে।
৩. সোশ্যাল মিডিয়া তৈরি করছে ‘তুলনার বাজার’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের সেরা অংশটাই দেখায়।
ফলে একজন কিশোর ভাবতে পারে-
-
অন্য সবাই সুখী।
-
অন্য সবাই সুন্দর।
-
অন্য সবাই ধনী।
-
অন্য সবার দামি ফোন আছে।
-
শুধু আমি পিছিয়ে।
এই ধরনের social comparison আত্মমর্যাদায় চাপ তৈরি করতে পারে। American Psychological Association-এর advisory-তেও কিশোরদের অনলাইন অভিজ্ঞতা, সামাজিক তুলনা, অনলাইন বৈষম্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
৪. ‘না’ শুনলে রাগ-তারপর বিস্ফোরণ
কিশোর বয়সে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনও বিকশিত হচ্ছে। তাই একজন প্রাপ্তবয়স্ক যে বিষয়কে বলবে-ঠিক আছে, এবার না হলে পরে কিনব।
একজন আবেগপ্রবণ কিশোর সেটিকে ভাবতে পারে-আমাকে কেউ বোঝে না। আমার জীবন শেষ। আমার বাবা-মা আমার শত্রু।
এখানেই impulsive decision-এর ঝুঁকি।
বিশেষ করে যদি তার মধ্যে আগে থেকেই হতাশা, একাকিত্ব, bullying, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, পড়াশোনার চাপ, সম্পর্কের সমস্যা বা মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা থাকে।
সাম্প্রতিক ওই ভারতীয় ঘটনায় আগের একটি আত্মহত্যার চেষ্টার তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৫. প্রযুক্তি আসক্তির লক্ষণ কোথায়?
সবচেয়ে বড় ভুল হলো-শিশু দিনে পাঁচ ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করলেই তাকে ‘আসক্ত’ বলা।
আসক্তির মতো সমস্যায় বরং দেখা যেতে পারে-
-
ফোন সরিয়ে নিলে অস্বাভাবিক রাগ বা অস্থিরতা
-
পড়াশোনা ও ঘুম নষ্ট হওয়া
-
পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া
-
আগের প্রিয় কাজগুলোতে আগ্রহ হারানো
-
বারবার লুকিয়ে ফোন ব্যবহার করা
-
ডিভাইসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা
একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু মোট screen time নয়-বরং addictive pattern বা নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের সঙ্গে কিশোরদের মানসিক সমস্যা ও suicidal ideation-এর সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
৬. বাবা-মায়ের ভুলও কম নয়
এখানে সন্তানকে একা দোষ দিলে ভুল হবে।
অনেক পরিবারে বাবা-মা নিজেরাই সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত।
-
বাবা খাবার টেবিলে ফোন দেখছেন।
-
মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত।
-
সন্তানও নিজের ফোনে ব্যস্ত।
তারপর একদিন বাবা-মা বললেন-ফোনটা রেখে পড়তে বসো! সন্তান তখন প্রশ্ন করতে পারে-আপনারা কেন রাখছেন না?
এখানে সন্তানকে প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানোর আগে বাবা-মাকেও উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
তাহলে কী করবেন?
প্রথম শিক্ষা হবে-
ফোন তোমার জীবনের একটি যন্ত্র, তোমার জীবন নয়।
দ্বিতীয় শিক্ষা-
দামি জিনিস না পাওয়া মানে তুমি কম গুরুত্বপূর্ণ নও।
তৃতীয় শিক্ষা-
না শুনলে রাগ করা যায়, কাঁদা যায়, হতাশ হওয়া যায়-কিন্তু নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা যায় না।
চতুর্থ শিক্ষা-
সমস্যা হলে বাবা-মায়ের কাছে বলতে হবে, পালিয়ে নয়।
American Academy of Pediatrics-এর Family Media Plan-ও পরিবারকে একসঙ্গে বসে প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করতে উৎসাহিত করে।
তবে নিয়ম মানে শুধু-প্রতিদিন এক ঘণ্টা ফোন!
এটা যথেষ্ট নয়। পরিবারকে ঠিক করতে হবে-কোন সময় ফোন ব্যবহার হবে, কোথায় ব্যবহার হবে, কোন ধরনের কনটেন্ট দেখা যাবে, রাতে ফোন কোথায় থাকবে, পড়াশোনা ও ঘুমের সঙ্গে এর ভারসাম্য কীভাবে হবে এবং বাবা-মাও সেই নিয়ম কতটা মেনে চলবেন।
কারণ সন্তানকে শুধু ফোন থেকে দূরে রাখলে হবে না।
সন্তানকে এমন একটি জীবন দিতে হবে যেখানে ফোন ছাড়াও তার আনন্দ, বন্ধু, আত্মসম্মান, সাফল্য এবং ভালোবাসার জায়গা থাকে।
(আর এখান থেকেই শুরু হবে দ্বিতীয় পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কীভাবে এমন সন্তান তৈরি করা যায়, যে দামি ফোন না পেলেও ভেঙে পড়বে না, ব্যর্থ হলেও আবার উঠে দাঁড়াবে, আর রাগের মুহূর্তে নিজের জীবনকে শাস্তি হিসেবে ব্যবহার করবে না?)
বিভাগ : লাইফস্টাইল
মন্তব্য করুন
এই বিভাগের আরও
আরও পড়ুন
বিরোধী দল দেশকে দাসত্বের মধ্যে রাখতে চায়: আবুল খায়ের ভূঁইয়া
বরিশাল মহানগর পুলিশের প্রথম কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি প্রতিযোগিতা সম্পন্ন
৩৪ দিন পর গণনা : শাহজালাল মাজার দানবাক্সে প্রায় ৮৯ লাখ টাকা , মিললো স্বর্ণ ও ১৫ দেশের মুদ্রা
প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে উদ্যোক্তা নির্বাচনে কোন তদবির চলবে না : বাংলাদেশ ব্যাংক গর্ভনর
সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সরকার এগিয়ে যাবে: হুইপ মোঃ আখতারুজ্জামান মিয়া এমপি
হাঙরের আক্রমণে সাঁতারুর মৃত্যু: অস্ট্রেলিয়ায় ‘'ক্যাচ-অ্যান্ড-কিল’ নির্দেশ জারি
ফরিদপুরে জেলা গাইড ক্যাম্পের ‘মহা তাঁবু জলসা’
রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের স্বার্থে সকলের সহযোগিতা অপরিহার্য: ড. খন্দকার মারুফ
১৫ মিনিটে তাণ্ডব চালিয়ে প্রবাসীর ঘরে ডাকাতি ফটিকছড়িতে
শ্রীমঙ্গলে দুই মাসের বই পড়া উৎসব সমাপ্ত: ল্যাপটপ জয়ের লড়াইয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নে শিক্ষার্থীরা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সফল হতে ঐক্য ও জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই: ডা. জাহিদ হোসেন
গাজায় নিহত ২০ হাজার শিশুর নাম সম্বলিত কাফনের কাপড়ের প্রদর্শন জাতিসংঘে
এফওপিএল প্রণয়ন করার দাবিতে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান
ইতালি ও ইন্টার মিলান কিংবদন্তি মাজ্জোলার চিরবিদায়
গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে গুরুতর আহত নারী ও শিশু, অবস্থা আশঙ্কাজনক
আফ্রিকান ফুটবল কনফারেন্সে আমন্ত্রিত ইনফান্তিনো
জনগণকে দেওয়া ওয়াদা রক্ষায় বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স
মিরপুরে চলন্ত বাসে আগুন
‘বিশ্বজয়ী হাফেজদের হাতে এলজিবিকিউ প্রপাগান্ডা বই তুলে দেয়া জাতির জন্য লজ্জাজনক’
বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এসডিজি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর