ঈদ ঘিরে ব্যস্ত সময় চলছে দর্জিপাড়ায়

Daily Inqilab বিশেষ সংবাদদাতা :

৩০ মার্চ ২০২৫, ০২:৩০ এএম | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৫, ০২:৩০ এএম

গ্রাহকের মাপজোখ নিয়ে সুনিপুণ হাতে কাপড় কাটছেন কাটিং মাস্টার। কাটা টুকরো সেলাই করে পছন্দের পোশাক তৈরি করছেন কারিগররা। কেউবা করছেন ইস্ত্রি। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এমনই ব্যস্ততা কুষ্টিয়ার দর্জিপাড়ায়।বুধবার দুপুরে কুষ্টিয়ার নবাব সিরাজুদ্দৌলা সড়ক ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

আসন্ন ঈদ ঘিরে খুব সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছেন দর্জিরা। যেন দম ফেলার ফুরসত নেই তাদের। মাস্টার ও কারিগরদের এমন ব্যস্ততা চলবে চাঁদরাত পর্যন্ত।

কথা হয় কুষ্টিয়া ক্লাসিক টেইলর্সের মাস্টারের সঙ্গে। তার ভাষ্য, প্রথম দিকে তেমন কাজ ছিল না। ১০ রোজার পর থেকে ভিড় বেড়েছে। এখন পর্যন্ত শতাধিক অর্ডার জমা পড়েছে। প্রতিটি থ্রিপিস ও পাঞ্জাবি তৈরিতে মজুরি নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা। প্রতিটি শার্টে ৪৫০, আর প্যান্ট তৈরিতে ৫০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, আগের মতো আর কারিগর পাওয়া যাচ্ছে না এ কাজে।

১১ মাস পর কাজের চাপ বেড়েছে। চলবে চাঁদরাত পর্যন্ত। হেঁসে হেঁসে কথাগুলো বলেন কুষ্টিয়া ক্লাসিক টেইলর্সের কারিগর। তিনি বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করছি। দিনে ৪ থেকে ৬টি শার্ট (জামা) বা প্যান্ট তৈরি করা যাচ্ছে।’ তার ভাষ্য, রমজান চলে গেলেই কাজ কমে যাবে। তখন অনেক দিন একটাও কাজ থাকে না। অনেকেই দর্জির কাজ ছেড়ে দিয়েছেন।

বাজারে তুলনামূলক স্বল্প মূল্যের তৈরি পোশাকে সয়লাব। দর্জির মজুরির টাকায় বস্ত্রালয়ে পোশাক কিনতে পাওয়া যায়। সে জন্য দিনে দিনে পোশাক তৈরিতে আগ্রহ কমছে মানুষের। রমজান ব্যতীত অন্য সময় দর্জিদের তেমন একটা কাজ থাকে না। আবার দর্জির কাজ শিখতে সময় লাগে বেশি। এসব কারণে এ কাজে নতুন লোক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার সংসারের খরচ মেটাতে দর্জির কাজ ছেড়ে অন্য কাজে যোগ দিচ্ছেন কেউ কেউ। এসব তথ্য জানিয়েছেন কাটিং মাস্টার ও কারিগররা। শুধু শহর নয়, গ্রাম-গঞ্জের দর্জিপাড়ায়ও ব্যস্ততা বেড়েছে।

দর্জিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে কোনো উৎসব বা ঈদে মানুষ সাধারণত দুই ধরনের পোশাক পছন্দ করে। একটি হলো তৈরি পোশাক, অন্যটি নিজের ইচ্ছে মতো ডিজাইন ও রুচিশীল পিস বা সিট কাপড় কিনে দর্জি দিয়ে বানানো পোশাক।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় দর্জিপাড়ায় সেকালের খটখট শব্দ আর শোনা যায় না। ১০-১২ বছর আগে কুমারখালী শহরে ৮-১০টি দর্জির দোকানে কাজ করতেন ৪০ থেকে ৫০ জন দর্জি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই শহরে দোকান বেড়ে হয়েছে ১৫ থেকে ১৮টি। কিন্তু দোকান বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি দর্জির সংখ্যা। বর্তমানে কাজ করছেন ৪৫ থেকে ৬০ জন দর্জি। এ বছর প্রতিটি প্যান্ট তৈরির মজুরি নেওয়া হচ্ছে ৫০০-৫৫০ টাকা, শার্ট তৈরিতে ৪০০-৪৫০, পাঞ্জাবিতে ৫০০-৫৫০ এবং থ্রিপিস ও টুপিসের মজুরি নেওয়া হচ্ছে ৩০০-৪০০ টাকা।

১৮ বছর ধরে পোশাক তৈরি করছেন বড়বাজারের আব্বাস টেইলর্স তিনি জানান, পাঁচ বছর আগেও দোকানে ১২ জন কারিগর ছিলেন। এখন আছেন মাত্র তিনজন। আগের চেয়ে আয় বেড়েছে, তবে কারিগর বাড়েনি। তাঁর ভাষ্য, বছরের অন্যান্য সময় তেমন কাজ থাকে না। সে সময় কারিগরদের সংসার চলে না। তাই অনেকেই দর্জি পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। ৬ মাস আগে মিজানুর রহমান নামে তাঁর এক কারিগর পেশা বদল করে ভ্যান চালাচ্ছেন।
পেশা বদল করা মিজানুর রহমান শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগ্রামের বাসিন্দা। ফোনে তিনি বলেন, দর্জির মজুরির টাকায় এখন বাজারে ভালো পোশাক কিনতে পাওয়া যায়। মানুষ আর আগের মতো পোশাক বানাতে চায় না। দর্জির কাজ করে দিনে ২০০-৩০০ টাকা আয় হতো। তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই এখন ঋণের টাকায় ভ্যান তৈরি করে চালাচ্ছেন তিনি। প্রতিদিন ৫০০-৭০০ টাকা আয় হচ্ছে।

একই এলাকার দর্জি গোলাম মোস্তফা জানান, রমজানের পরে চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ করেন তিনি। কখনওবা খরচ জোগাতে ঢাকায় যেতে হয় তাঁকে।

কাজ শিখতে সময় বেশি লাগা, তৈরি পোশাকের দাপট, বছরের অন্যান্য সময়ে কাজ না থাকাসহ নানা কারণে কারিগরের সংকটের কথা জানালেন কুমারখালী দর্জি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি কাজী হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অল্প দিনে কাজ শেখানোর ব্যবস্থা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করলে কারিগর বাড়ানো সম্ভব হতো।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মিকাইল ইসলামের ভাষ্য, পোশাক তৈরির প্রাচীন এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।


বিভাগ : বাংলাদেশ


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

বরিশালের মিষ্টি ‘মরিচ-ক্যাপসিকাম’ বিদেশে রপ্তানী হলেও কৃষকগন ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ
রাজবাড়ীতে প্রবাসীর স্ত্রীর ঘরে ঢুকে হত্যা করে টাকা লুটের আসামী সুবর্ণচর থেকে গ্রেপ্তার
ফুলবাড়ী সীমান্তে বিএসএফের রাবার বুলেটে ভারতীয় চোরাকারবারি নিহত
দিনাজপুরে বিশ্বনবী (সা.)-কে নিয়ে কটুক্তি, এলাকাজুড়ে উত্তেজনা
টাঙ্গাইলে জামায়াতের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত
আরও
X

আরও পড়ুন

বরিশালের মিষ্টি ‘মরিচ-ক্যাপসিকাম’ বিদেশে রপ্তানী হলেও কৃষকগন ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ

বরিশালের মিষ্টি ‘মরিচ-ক্যাপসিকাম’ বিদেশে রপ্তানী হলেও কৃষকগন ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ

সাধারণ সাজে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন কিংবদন্তী রুনা লায়লা

সাধারণ সাজে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন কিংবদন্তী রুনা লায়লা

রাজবাড়ীতে প্রবাসীর স্ত্রীর ঘরে ঢুকে হত্যা করে টাকা লুটের আসামী সুবর্ণচর থেকে গ্রেপ্তার

রাজবাড়ীতে প্রবাসীর স্ত্রীর ঘরে ঢুকে হত্যা করে টাকা লুটের আসামী সুবর্ণচর থেকে গ্রেপ্তার

ফুলবাড়ী সীমান্তে বিএসএফের রাবার বুলেটে ভারতীয় চোরাকারবারি নিহত

ফুলবাড়ী সীমান্তে বিএসএফের রাবার বুলেটে ভারতীয় চোরাকারবারি নিহত

দিনাজপুরে বিশ্বনবী (সা.)-কে নিয়ে কটুক্তি, এলাকাজুড়ে উত্তেজনা

দিনাজপুরে বিশ্বনবী (সা.)-কে নিয়ে কটুক্তি, এলাকাজুড়ে উত্তেজনা

টাঙ্গাইলে জামায়াতের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত

টাঙ্গাইলে জামায়াতের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত

ফেরার ম্যাচে মলিন মেসি,হারল মায়ামি

ফেরার ম্যাচে মলিন মেসি,হারল মায়ামি

হাসপাতাল বেডেই কেটেছে যাদের ঈদ!

হাসপাতাল বেডেই কেটেছে যাদের ঈদ!

পাবনায় ছুরিকাঘাতে যুবক খুন

পাবনায় ছুরিকাঘাতে যুবক খুন

আমেরিকান প্রবাসী দেশে এসে ডাকাতের কবলে

আমেরিকান প্রবাসী দেশে এসে ডাকাতের কবলে

সামাজিক বিরোধে প্রাণ গেল যুবকের

সামাজিক বিরোধে প্রাণ গেল যুবকের

ধূ-ধূ বালুচরে পরিণত তিস্তাঃ চরম হুমকির মুখে নদী তীরবর্তী জীববৈচিত্র

ধূ-ধূ বালুচরে পরিণত তিস্তাঃ চরম হুমকির মুখে নদী তীরবর্তী জীববৈচিত্র

কালীগঞ্জে বেদে পল্লীতে প্রতিপক্ষের হাতে যুবক খুন, আটক ১

কালীগঞ্জে বেদে পল্লীতে প্রতিপক্ষের হাতে যুবক খুন, আটক ১

মসজিদ গুলো শিরক ও বিদয়াত মুক্ত রাখা মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব -নাসির উদ্দিন মজুমদার

মসজিদ গুলো শিরক ও বিদয়াত মুক্ত রাখা মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব -নাসির উদ্দিন মজুমদার

দুর্নীতিবাজ টিউলিপের সাফাই দেয়ার চেষ্টা, কি বলছেন?

দুর্নীতিবাজ টিউলিপের সাফাই দেয়ার চেষ্টা, কি বলছেন?

থাইল্যান্ড পৌঁছেছেন প্রধান উপদেষ্টা, বিকালে ভাষণ

থাইল্যান্ড পৌঁছেছেন প্রধান উপদেষ্টা, বিকালে ভাষণ

এবারও বিশ্বের ধনীদের তালিকার শীর্ষে ইলন মাস্ক

এবারও বিশ্বের ধনীদের তালিকার শীর্ষে ইলন মাস্ক

বিমসটেক সমুদ্র পরিবহন চুক্তি সই, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক

বিমসটেক সমুদ্র পরিবহন চুক্তি সই, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় যা বলছেন বিশ্ব নেতারা

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় যা বলছেন বিশ্ব নেতারা

সিলেটে  নিষিদ্ধ  সংগঠন ছাত্রলীগের ৭ নেতা  গ্রেফতার

সিলেটে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ৭ নেতা গ্রেফতার