পর্যটকের পদভারে উপচে পড়া ভীড়ের নগরী কক্সবাজার
১৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:০২ পিএম | আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:০২ পিএম
এখন শীতের মাঝামাঝি সময়, পর্যটনের ভরা মৌসুম। ভ্রমণ পিপাসু মানুষের প্রথম পছন্দ ও আকর্ষণ মায়াবী ও রূপময়ী সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। কারণ এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম অখণ্ডিত সমুদ্র সৈকত। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ এর রূপ পরিবর্তন করে। শীত-বর্ষা-বসন্ত-গ্রীষ্ম এমন কোনো ঋতু নেই যখন সমুদ্র সৈকতের চেহারা বদলায় না। এ সমুদ্র সৈকতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি ( কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত) বালুকাময়, কদাচিৎ কাদার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বালিয়াড়ি সৈকত সংলগ্ন শামুক-ঝিনুকসহ নানা প্রজাতির প্রবাল সমৃদ্ধ বিপণি বিতান, অত্যাধুনিক হোটেল-মোটেল-কটেজ, নিত্য নবসাজে সজ্জিত পর্যটন স্পটসমূহে পর্যটকদের বিচরণে কক্সবাজার শহরে পর্যটন মৌসুমে প্রাণচাঞ্চল্য থাকে।
নাগরিক ব্যস্ত জীবনে মানুষের প্রাণ যখন ওষ্টাগত, হাজারো কাজের ভীড়ে যখন ব্যতিব্যস্ত মানুষ যখন সামনে চলার গতি পথ হারার উপক্রম হয়, খেই হারাতে বসে যখন অনাগত জীবনের গন্তব্যস্থল-ঠিক তখনই ভ্রমণ পিপাসু মানুষ জীবনের বৈচিত্র্যহীন একঘেয়েমি জীবন থেকে বেরিয়ে আসার অব্যক্ত আশা পোষণ করেন। চিন্তা, চেতনা, মনন ও সৃষ্টিশীলতায় প্রচন্ডভাবে ভ্রমণের তাগিদ অনুভব করেন। তখনই তারা অচেনাকে চেনা ও অজানাকে জানার অভিজ্ঞতা লাভের জন্য বেরিয়ে পড়েন বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছ্বাস, জীবনের সম্মোহনী পাথেয় খোঁজার অজানা আহবানে । ইট পাথরের চারদেয়ালের বন্দী-শহুরে জীবনের ঘিঞ্জিঘেরা পরিবেশ থেকে ন্যূনতম অবকাশ যাপনের চেষ্টায় সচেষ্ট থাকে মানুষের মনোপ্রবৃত্তিতে। শহরের যান্ত্রিকতা থেকে একটু ভিন্নতা খুঁজেন ভ্রমণ পিপাসুরা।
তাই ঈদের আমেজে কক্সবাজারে পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা, লাবনী ও কলাতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পর্যটকের মেলা। দেশি বিদেশি পর্যটকেরা আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে। নানা বয়সীরা পর্যটকেরা বিচ বাইক, ওয়াটার বাইক ও ঘোড়ায় চড়ে সমুদ্র দর্শন করছেন। কেউ আবার টায়ার টিউবে গা ভাসানো ও নোনা জলে গোসলে নেমেছেন। প্রিয়জনেরা এসব দৃশ্য মোবাইল ও ক্যামেরায় ধারণ করছেন। অনেককেই হিমছড়ি ও দরিয়া-নগর সৈকতে প্যারাসাইলিংয়েও সমুদ্র দর্শন করতে দেখা গেছে।
শহরের পাশাপাশি মেরিন ড্রাইভ ধরে পর্যটকেরা ইনানী, পাটোয়ার-টেক পাথুরে সৈকত ও টেকনাফের দিকে ছুটছে। এ ছাড়া সেন্ট মার্টিন, সোনাদিয়া, মহেশখালী, রামুর বৌদ্ধ পল্লি, চকরিয়ার ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, পাহাড় সমুদ্র ও অরন্য ঘেরা গোয়ালিয়া, রোহিঙ্গা ক্যাম্প দর্শন, উখিয়া টিভি টাওয়ার সংলগ্ন ইয়াহিয়া গার্ডেন, আকিজের কুমির প্রজনন কেন্দ্র পরিদর্শনসহ বিভিন্ন স্থানে নিভৃতে নিসর্গে ছুটে যাচ্ছেন পর্যটকের ঢল।
আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা, সরকারি বিভিন্ন স্তরের গোয়েন্দা সংস্থা, টুরিস্ট পুলিশ, বিচ কর্মী ও লাইফ গার্ড সদস্যরা পর্যটকদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক সজাগ আছেন।
শীত উপেক্ষা করে সাগরের নোনা জলে গা ভাসাচ্ছে শিশু কিশোর থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। সৈকতের লাবনী পয়েন্ট থেকে কলাতলি হয়ে হিমছড়ি ইনানী পর্যন্ত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাজার হাজার পর্যটকের কোলাহলে মুখর এই পর্যটন নগরী।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ায় অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ও বিজয় দিবসের ছুটি। আনন্দে কাটছে ভ্রমণ পিপাসুদের।
মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত আগাম বুকিং হয়ে গেছে সমুদ্র পাড়ের হোটেল মোটেলগুলোতে। প্রতিদিন আসছে হাজার হাজার পর্যটক। এ চাপ ৩১-ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকবে বলে আশা হোটেল ব্যবসায়ীদের।
অনেক পর্যটক হোটেল মোটেলে রুম না পেয়ে ব্যাগ ও লাগেজ নিয়ে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আশানুরুপ পর্যটকের ভীড়ে চলতি শীত মৌসুমের প্রারম্ভে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এক অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। এই মৌসুমে শত কোটি টাকার ব্যবসার আশা করছেন হোটেল মালিকগণ। তাদের মতে, গত শুক্রবার থেকে আগামী ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস-রিসোর্ট কোথাও কোনো রুম খালি নেই। ১৮ ডিসেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০% রুম খালি থাকলেও ২৬-ডিসেম্বর থেকে ৩১-ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০০% রুম বুকিং করা। আগামী দু’সপ্তাহে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্রায় ৭ লক্ষ পর্যটকের সমাগম ঘটবে বলে হোটেল মোটেল মালিকগণ মনে করছেন।
কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘এতোদিন কিছুটা পর্যটকের কমতি থাকলেও ডিসেম্বর মাসে পর্যটক বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্টানের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ায় অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে সাপ্তাহিক ও ১৬ ডিসেম্বর, খ্রীষ্টমমার্স ও থার্টিফাস্ট নাইট উদযাপন উপলক্ষে যে লম্বা ছুটি, তা কাজে লাগাতে কক্সবাজার ছুটে আসছেন পর্যটকের ঢল। অনেক পর্যটক রুম চাইলেও আমরা দিতে পারছিনা’।
কক্সবাজার হোটেল অফিসার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও বাপা কক্সবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ কলিম বলেন, 'কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। দীর্ঘ প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক দূর্যোগ কাটিয়ে মানুষ বাধাহীন ঘুরে বেড়ানোর অবারিত সুযোগ পেয়েছে। এখন পর্যটন মৌসুম, কক্সবাজার পর্যটকের পদভারে মুখরিত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। প্রতিবছর শীত মৌসুমে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের আনাগোনা থাকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক, টেকনাফের সাবরাং টুরিজম জোন। সাপ্তাহিক ছুটি, শীতের ভরা মৌসুম শেষে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল নামছে। ইতিমধ্যে শুক্রবার থেকে বিভিন্ন টুরিজম স্পটে তিল ধারনের জায়গা নেই। হোটেল-মোটেল, কটেজ প্রায় কানায় কানায় পরিপুর্ণ। কক্সবাজারে আইন শৃংখলা অবস্থা সন্তোষজনক। কক্সবাজারকে পরিবেশ বান্ধব, পর্যটক বান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করতে হবে'।
কক্সবাজার জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন,’শীতের শুরুতে পর্যটকের ভীড়ে কক্সবাজার সৈকতসহ পর্যটন স্পটগুলোতে মানুষের ঢল লেগেই থাকে। এর মধ্যে সরকারি ছুটি, বিজয় দিবসের ছুটি, শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার সমাপ্তীসহ বিশেষ কারণে হোটেল-মোটেল, রেস্টহাউস-রিসোর্টসমুহ দেশি বিদেশি অতিরিক্ত পর্যটকের পদভারে মুখরিত থাকে। অনেক সময় পর্যটকের হোটেল, মোটেল, বিভিন্ন কটেজে তিল ধারনের ঠাই থাকেনা। অতিরিক্ত পর্যটকের কারনে মানুষের লিভিং কস্ট বেড়ে যায়। অতিরিক্ত টাকা দেবার পরেও হোটেলে রুম পাওয়া যায়না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ সুযোগে অতিরিক্ত চার্জ করে বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। পর্যটকের নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ব্যাপারে প্রশাসনের নজরদারি থাকা উচিত’।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছে জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের মাধ্যমে সৈকতকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সহকারী পুলিশ সুুপার আবুল কালাম।
তিনি আরো বলেন, ‘সাপ্তাহিক ছুটিতেই পর্যটকের চাপ একটু বেশি থাকে। এসব বিবেচনায় নিয়ে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশ সজাগ রয়েছে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজারের পুলিশ সুপার বলেন, কয়েক লাখ পর্যটকের নিরাপত্তা, সমুদ্রে নিরাপদে গোসলসহ চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে মাঠে ট্যুরিস্ট পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ বলেন, ‘কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতিও ও বিভিন্ন জাতি, গোষ্টি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সাথে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অত্যন্ত সুদৃঢ় ও চমৎকার সহাবস্থান। স্থানীয় নাগরিকসহ পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইন শৃঙ্খলাবাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। পর্যটন শিল্পের বিকাশে কক্সবাজার জেলা পুলিশ শুধু নিরাপত্তা নয় কিছু টেকনোলজি বেইজড সেবাও চালু করেছে। এর মধ্যে অন্যতম অনলাইন বাসটার্মিনাল, কক্স ক্যাবসহ অনলাইন হোটেল বোর্ডার ইনফরমেশন সেন্টার। কক্সবাজার জেলার পর্যটনের স্ট্যান্ডার্ডকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে কক্সবাজার জেলা পুলিশ’।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, এখন ভরা পর্যটন মৌসুম। হাজার হাজার পর্যটকের ভীড়ে কক্সবাজার মুখরিত। এই কক্সবাজার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী জেলা। কক্সবাজারে পর্যটন বান্ধব পরিবেশ বিরাজমান। তাই নির্বিঘ্নে দেশ বিদেশের পর্য়টকরা স্বাচ্ছন্দে কক্সবাজার ভ্রমণ করতে পারবেন’।
বিভাগ : বাংলাদেশ
মন্তব্য করুন
এই বিভাগের আরও
আরও পড়ুন
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে : তারেক রহমান
ঋণখেলাপিরা যাতে মনোনয়ন না পায় চেষ্টা করবো : মির্জা ফখরুল
অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না হলে রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না : বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
টিসিবি’র এক কোটি ফ্যামিলি কার্ডধারীর মধ্যে ৩৭ লাখই ভুয়া: বাণিজ্য উপদেষ্টা
ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিশ্চিতে কারখানা পরিদর্শন ভোক্তা অধিকারের
গণপরিবহনে শৃঙ্খলায় কাউন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা
রাজধানীর তিন পার্কে ভেন্ডারের চুক্তি : শর্ত ভঙ্গের তদন্তে ডিএনসিসি
বাবা-মায়ের পুরোনো বাড়িতে যাই : শফিকুল আলম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসায় ১৫০ কোটি টাকা অনুদান
২০২৪ সালে ৩১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা
ভারতীয় ৭২ গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে অপতথ্য প্রচার
লেবানন থেকে দেশে ফিরলেন আরো ৪৭
প্লাটফর্ম বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত
শক্তিশালী অর্থনীতি ও গর্বিত জাতি গড়তে শহীদ জিয়ার দর্শন ধারণ করতে হবে : আমির খসরু
কী আছে তৌফিকার লকারে?
ঘটনার তিনদিন পর থানায় মামলা
অনিয়ম ঢাকতে তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের পাঁয়তারা
শেবাচিম হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের দুরবস্থা
৯৬টি সিএনজি ভাঙ্গাড়ি হিসাবে সাড়ে ১১ লাখ টাকায় বিক্রি
৩১ দফা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে রূপগঞ্জে বিএনপির সমাবেশ