বৈষম্য থেকে সৃষ্ট দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও গণবিক্ষোভ

Daily Inqilab জামালউদ্দিন বারী

১০ জুলাই ২০২৪, ১২:০৪ এএম | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৪, ১২:০৪ এএম

দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা এক গভির খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। গত ১৫ বা ১৭ বছরে এর শেষ ধাপ শুরু হলেও স্বাধীনতাত্তোর কালেই বৈষম্য, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সমাজ প্রগতির এই অগস্ত্যযাত্রা শুরু হয়েছিল। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত ও অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় মাথামোটা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উস্কানি ও অকস্যাৎ আক্রমণে বাধ্য হয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের জনগণ। ৯ মাসে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশের সংবিধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভারতীয় আধিপত্যবাদের অনুপ্রবেশ আমাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বাধীন সত্ত্বার বিরুদ্ধে অবিরাম কালো থাবা বিস্তার করে রেখেছে। আধিপত্যবাদের জন্য হুমকি সৃষ্টি করায় স্বাধীনতার এক দশকের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযোদ্ধা বীরোত্তম জিয়াউর রহমানের মত রাষ্ট্রনায়ককে অপমৃত্যুর সম্মুখীন হতে হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে দুইটি হত্যাকা-ের প্রকৃতি ও রকমফের ভিন্ন হলেও রদশ গঠন ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে এই দুই রাজনৈতিক নেতার অসামান্য দেশপ্রেম ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব আঞ্চলিক শক্তির জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকতেই পারে। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ একাট্টা হলেও মূলত প্রতিবেশী দেশের গোপন সমর্থনের কারণেই তা দীর্ঘায়িত হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন বর্জনের কারণে এরশাদ বিপাকে পড়লেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে আওয়ামী লীগ এরশাদের পাতানো নির্বাচনে গিয়ে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে সহায়তা করেছিল। অনেকে মনে করেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ করার পেছনে ভারতের ইন্ধন ছিল। ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের বর্জন ঘোষণার পর দিল্লী থেকে উড়ে আসা ভারতীয় কূটনীতিকদের তেলেসমাতি কারবার যেন এরশাদকে ৮৬ সালের প্রতিদান দিতে বাধ্য করার নামান্তর। দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করলেও এরশাদকে অংশগ্রহণে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টিকে অনেকটা রাজনৈতিক আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। একই সাথে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, পরমত সহিষ্ণুতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে একটি জাতীয় সংহতির পরিবেশ ও সম্ভাবনাকেও নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এরই পথ ধরে গত দেড় দশকে দেশ থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। দেশে সুষ্ঠু কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা না থাকায় দেশের মেধাবী সন্তানরা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ডাকে চলে যাচ্ছে। লাখ লাখ তরুণ-তরুণী ইউরোপ-আমেরিকা, জাপান-কোরিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছে। শত শত যুবক নানা দেশ ঘুরে ভূমধ্য সাগরের পথে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকে কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পড়ে বিদেশের জেলে বন্দিত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। আবার অনেকে সাগরে সলিল সমাধি হয়ে জীবনের করুণ পরিনতির শিকার হয়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে দেশে উপযুক্ত চাকরি না পেয়ে সাইপ্রাস, ইতালি, মালয়েশিয়া গিয়ে যারা কৃষি খামারে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের অনেকেই দেশে নিজেদের পৈত্রিক জমিতে কামলা খাটাতেও যায়নি। অথচ এসব যুবকের সমান যোগ্যতা নিয়ে লাখ লাখ ভারতীয়, চীনা ও শ্রীলঙ্কান তরুণ বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানা, বায়িং হাউজ ও আইটি সেক্টরে কাজ করছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের এগিয়ে যাওয়ার পথে কত ধরণের কৃত্রিম বাঁধা ও ফাঁদ পাতা হয়েছে।

কৃষি প্রধান অনুন্নত বাংলাদেশে শিল্পায়ণের যাত্রা শুরু হয়েছিল সাতচল্লিশোত্তরকালে কয়েকটি পাটকল, বস্ত্র কারখানা এবং কাগজকল ও জাহাজ নির্মাণ ডকইয়ার্ড স্থাপনের মধ্য দিয়ে। ছিচল্লিশ সালে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। সে সময় পাকিস্তানপন্থী ঊর্দূভাষী বিহারিরা প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলায় আশ্রয় নেয়। একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধের পর এদেরকেই আটকে পড়া পাকিস্তানি আখ্যায়িত করে বৈষম্যের শিকারে পরিনত করা হয়েছে। অথচ এরাই এদেশের শিল্পকারখানায় প্রথম অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করে দেশের শিল্পায়নের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিহার বা উত্তর প্রদেশ থেকে আসা বিহারিরা বাংলাদেশকেই নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তারা তাদের বেতন বা আয়ের অংশ অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেয়নি। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে লাখ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার বছরের পর বছর ধরে উপযুক্ত চাকরি না পেলেও লাখ লাখ ভারতীয় নাগরিক গার্মেন্ট, চামড়া শিল্প, আইটি ও ওষুধ শিল্পের উচ্চ পদে চাকরি করে শত শত কোটি ডলার অবৈধভাবে নিয়ে যাচ্ছে। তারা বিজনেস ভিসা, ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে এসে রফতানিমুখী শিল্প কারখানায় উচ্চ বেতনে চাকরি করলেও কোনো রেজিস্ট্রেশন, বৈধতা ও ডাটাবেজ না থাকায় দেশের কোনো সংস্থার কাছেই এদের সঠিক পরিসংখ্যান খুঁজে পাওয়া যায় না। বিদেশিদের চাকরি পেতে হলে এ-থ্রি ভিসায় আবেদন করতে হয়। যেকোনো ভিসায় এসে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করে ধরা পড়লে মাত্র ৩০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ থাকায় অবৈধ ভারতীয়রা আইন, রীতি-নীতির কোনো তোয়াক্কা করছে না। তারা বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা ভারতে নিয়ে গেলেও বাংলাদেশ সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। বিশ্বের কোথাও বাংলাদেশের রেমিটেন্স যোদ্ধারা এমন সুযোগ পাচ্ছে না। লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে খরচের টাকা উঠাতে এবং কাজের বৈধ কাগজপত্র ঠিক করতেই তাদের কয়েক বছর লেগে যায়। অথচ বাংলাদেশের চাকরির বাজারে অবৈধ ভারতীয়রা মৌরসি পাট্টা খুলে বসেছে। দেশের সরকারি প্রশাসন প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ নানা কোটা সাজিয়ে দেশের মেধাবী যুবকদের বঞ্চনার পন্থা সৃষ্টি করেছিল। সেসব মেধাহীন, দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেসরকারি চাকরিতে ভারতীয়দের অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে দেশীয় কর্মীদের বঞ্চিত করে দেশে বেকারত্বের পরিস্থিতি তৈরী করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে লাখো প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা, বৈষম্য, লুটপাট, সম্পদ পাচারের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বঞ্চিত করে একটি বিশেষ শ্রেণীর মানুষের সম্পদশালী হয়ে ওঠা, চাকরিতে বাঙ্গালীদের অধিকারকে খর্ব করার অভিযোগ তুলেছিল রাজনৈতিক নেতারা। বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য আজকের বাস্তবতা তখনকার চেয়েও বেশি জটিল ও দুর্ভাগ্যজনক। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে অকার্যকর করে তোলা হয়েছে। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষায় মানহীনতা, বৈষম্য, দুর্নীতি-বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণের শিকার হয়ে শিক্ষার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনকে চরমভাবে ব্যহত করা হয়েছে। শিক্ষার মানহীনতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিযোগিতামুলক জব মার্কেটে দেশীয় তরুণ প্রজন্মকে বঞ্চিত করে ভারতীয়দের সুযোগ দিয়ে দেশ থেকে বছরে শত শত কোটি ডলার নিয়ে যাওয়ার মওকা সৃষ্টি করা হয়েছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতাসীনদের তোয়াজ করে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে পাকাপোক্ত করার গোপণ সমঝোতা এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেট। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে এবং প্রশাসনে অগ্রাধিকারভাবে বিশেষ সম্প্রদায় এবং পরীক্ষিত তাবেদার ব্যক্তিদের বসানোকে অনেকে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী শাসকদের তোষণ নীতির অংশ বলে মনে করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব নিয়ে নেটিজনদের প্রায়শ ট্রল করতে দেখা যায়। যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সরকারি চাকরিতে অন্তত ২০ শতাংশ মুসলমান থাকার কথা, সেখানে তাদের অবস্থান ৩ শতাংশেরও কম। অথচ বাংলাদেশের মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সেক্টরের শীর্ষ পদে হিন্দুরা বৈষম্যহীনভাবে চাকরি করছে। এসব নিয়ে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন তোলা আমাদের স্বাভাবিক রুচিবোধে বাঁধে। নিয়োগ ও পদায়ণের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক-অযৌক্তিক পরিসংখ্যান এসব প্রশ্ন ও বিতর্ক অনিবার্য করে তুলেছে। দেশের কর্মক্ষেত্রে ভারতীয়দের সংখ্যাবৃদ্ধি হঠাৎ করে হয়নি। এক-এগারো পরবর্তী মহাজোটি সরকারের আমলে তা বাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশে যখন ভারত প্রভাবিত সরকারের দ্বারা হিন্দুদের ক্ষমতায়নের অভিযোগ ক্রমে জোরালো হচ্ছে, তখন ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে শিক্ষা, চাকরি ও সামাজিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলমানদের অংশগ্রহণ সঙ্কুচিত করার নানাবিধ প্রকল্প শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজ্য সরকার সেখানকার মাদরাসায় শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়ায় সেখানকার একুশ হাজার মাদরাসা শিক্ষক চাকরি হারাতে বসেছে। উত্তর প্রদেশ মাদরাসা বোর্ডের প্রধান ইফতিখার আহমেদ জাবেদ এ প্রসঙ্গে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, বিজেপি সরকারের এমন সিদ্ধান্তে মুসলমান শিক্ষক ও ছাত্ররা ৩০ বছর পিছিয়ে পড়বে। তিনি এ অর্থায়ন বন্ধ না করতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে একটি আবেদন পাঠিয়েছেন।

উপমহাদেশের রাজনীতি ও সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি নরেন্দ্র মোদি সরকারকে বলেছেন, তারা যেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে সম্ভাব্য সবকিছু করেন। বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজিক প্রক্রিয়ার গভীর স্তরে তার সুদূরপ্রসারি প্রভাব ক্রমে লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষাব্যবস্থায় নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্ট চলছে। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের ধর্মীয় শিক্ষা, মূল্যবোধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পৃক্ত কারিক্যুলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও হিন্দুত্ববাদী বিষয় যুক্ত করার অভিযোগ নিয়ে মাঠ গরম হতে দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় এক সময়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব ও আঞ্চলিক র‌্যাংকিংয়ে এক-দুইশ’র মধ্যেও নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা, সুষ্ঠু ধারার যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা রুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে দেশের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। আর এসব করা হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদী একরৈখিক রাজনৈতিক চেতনাকে সামনে রেখে। সরকারি চাকরিতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধার বদলে নানা কোটা, রাজনৈতিক বিবেচনা এবং অনৈতিক পন্থায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। চাকরি এবং ভর্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটাপ্রথা সবচেয়ে বড় বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে এসে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও প্রত্যাশার জায়গাগুলোকে অন্ধকারে রেখে কোটার নামে দেশের বিপুল সংখ্যক মেধাবী সন্তানদের বঞ্চিত করে দেশের বাইরে চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। দেশের হাজার হাজার মেধাবী তরুণ দেশের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন দেশের গবেষণা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও নিজ দেশের কর্মক্ষেত্রে ভারতীয় তরুণদের অবাধ বিচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এভাবেই বাংলাদেশে ভারসাম্যহীন একটি কায়েমী স্বার্থবাদী চক্র গড়ে উঠেছে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে, গণমাধ্যমের মালিক ও কর্মীদের মধ্যে, বুদ্ধিজীবী ও সাংষ্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ভারতের অনুঘটকরাই বেশি সক্রিয় ও সরব। তাদের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে শাহবাগে একটি গণজাগরণ মঞ্চের নাটক সাজিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে শিখ-ী বানিয়ে অনেক কিছু ওলটপালট করে দিতে সক্ষম হয়েছিল। সেটি ছিল একটি ফ্যাসিবাদী প্রপাগান্ডা। সেই জাগরণের প্রকাশ্য কুশীলবরা ইতিমধ্যে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে হারিয়ে গেছে। গত দেড় দশকে দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো দাবি আদায়ের আন্দোলনে ব্যর্থ হলেও ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোটাবিরোধী আন্দোলন করে সফল হয়েছিল। সরকার বাধ্য হয়েছিল, তাদের দাবি মেনে নিয়ে কোটা বাতিলের পরিপত্র জারি করতে। আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে এ দেশে অনেক কিছুই ঘটেছে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়ে যে বিচ্ছিন্নতা, বিপন্নতা, দুর্বৃত্তায়ণের সূচনা হয়েছিল, তা থেকে জাতি বের হতে পারেনি। কোটাবিরোধী আন্দোলনে ভীত হয়ে তা বাতিল করে ২০১৮ সালে সরকার যে পরিপত্র জারি করেছিল, সম্প্রতি আদালত তা বাতিল করে দিয়ে বৈষম্যের শিকার হওয়া তরুণ প্রজন্মকে আবারো রাজপথে ঠেলে দেয়া হয়েছে। কোটাবিরোধী আন্দোলনের সাথে দেশের সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী একাত্ম্য হয়ে বৃহত্তর আন্দোলন শুরু করেছে। ইতিমধ্যে তা ‘বাংলা ব্লকেডে’ রূপ নিয়েছে। এটা কোনো রাজনৈতিক দলের বা পক্ষে-বিপক্ষের আন্দোলন নয়। দেশকে মেধাশূন্যতা ও বৈষম্যমুক্ত করার ক্ষেত্রে ন্যুনতম প্রথম ধাপ হচ্ছে, কোটা বাতিল করে সর্বত্র মেধাবিদের প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা। সেই সাথে বেসরকারি খাতের প্রধান জব মার্কেট থেকে লাখ লাখ অবৈধ ভারতীয়, চীনা, শ্রীলঙ্কানদের বিদায় করে দেশের শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। অবৈধ বিদেশি শ্রমিকরা বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স নিয়ে যাচ্ছে। তাদের জায়গায় দেশেÑবিদেশে ছড়িয়ে থাকা মেধাবীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট থেকে কয়েক বছরের মধ্যে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।

[email protected]


বিভাগ : সম্পাদকীয়


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

আরও পড়ুন

সিএমএসএমই খাতের ২৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল সম্পর্কে এনআরবিসি ব্যাংকের মতবিনিময় সভা

সিএমএসএমই খাতের ২৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল সম্পর্কে এনআরবিসি ব্যাংকের মতবিনিময় সভা

সকাল থেকে জলাবদ্ধতায় ঢাবির দুই হল, ভোগান্তি চরমে

সকাল থেকে জলাবদ্ধতায় ঢাবির দুই হল, ভোগান্তি চরমে

মালয়েশিয়ায় মেশিনারি মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ

মালয়েশিয়ায় মেশিনারি মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ

পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী

পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী

জুনে সড়ক দুর্ঘটনা ৭৩০টি, নিহত ৬৪২ : বিআরটিএ

জুনে সড়ক দুর্ঘটনা ৭৩০টি, নিহত ৬৪২ : বিআরটিএ

নেপালে আস্থা ভোটে হেরে প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিলেন প্রচণ্ড

নেপালে আস্থা ভোটে হেরে প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিলেন প্রচণ্ড

চট্টগ্রামে কোটা সংস্কার আন্দোলনে 'ভুয়া ভুয়া' স্লোগান, পিছু হটলো পুলিশ

চট্টগ্রামে কোটা সংস্কার আন্দোলনে 'ভুয়া ভুয়া' স্লোগান, পিছু হটলো পুলিশ

কোটা সংস্কারের নামে বিএনপি জামায়াতের সন্তানেরা মাঠে নেমেছে : সিলেটে যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক নিখিল এমপি

কোটা সংস্কারের নামে বিএনপি জামায়াতের সন্তানেরা মাঠে নেমেছে : সিলেটে যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক নিখিল এমপি

মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে থাকতে ভারতের সাথে দেশবিরোধী কোন চুক্তি জনগণ মানবে না- ইসলামী মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ

মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে থাকতে ভারতের সাথে দেশবিরোধী কোন চুক্তি জনগণ মানবে না- ইসলামী মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ

লালমনিরহাটে তিস্তায় কমছে বন্যার পানি,ভাঙ্গন আতঙ্কে নদী পাড়ের হাজারো মানুষ

লালমনিরহাটে তিস্তায় কমছে বন্যার পানি,ভাঙ্গন আতঙ্কে নদী পাড়ের হাজারো মানুষ

খালিদ সাইফুল্লাহ আহ্বায়ক- জুবায়ের হাসিব সদস্যসচিব -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রপক্ষের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা

খালিদ সাইফুল্লাহ আহ্বায়ক- জুবায়ের হাসিব সদস্যসচিব -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রপক্ষের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা

রাশিয়ায় যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত

রাশিয়ায় যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত

সিরাজদিখানে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল মেকানিকের মৃত্যু

সিরাজদিখানে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল মেকানিকের মৃত্যু

চার রাকাত বিশিষ্ট সুন্নাত নামাজের শেষ দুই রাকাতে সুরা ফাতেহার পরে সুরা মিলানো প্রসঙ্গে।

চার রাকাত বিশিষ্ট সুন্নাত নামাজের শেষ দুই রাকাতে সুরা ফাতেহার পরে সুরা মিলানো প্রসঙ্গে।

অবৈধ সম্পদের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি আদালতে  দুদকের মামলায় থেকে খালাস পেলেন তিতাসের কর্মচারী জহিরুল ইসলাম

অবৈধ সম্পদের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি আদালতে দুদকের মামলায় থেকে খালাস পেলেন তিতাসের কর্মচারী জহিরুল ইসলাম

স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রেতাত্মারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত

স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রেতাত্মারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত

ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে রেজুলেশ খাতা ছিনতাইয়ের অভিযোগ

ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে রেজুলেশ খাতা ছিনতাইয়ের অভিযোগ

আখাউড়া থানা পুলিশের অভিযানে ৯ আসামী গ্রেফতার

আখাউড়া থানা পুলিশের অভিযানে ৯ আসামী গ্রেফতার

স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ভর করেছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর : কাদের

স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ভর করেছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর : কাদের

জীবন কী ও কেমন

জীবন কী ও কেমন