ক্যান্সারের বিরুদ্ধে চাই সচেতনতা
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০২ এএম | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০২ এএম

মরণঘাতক ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে প্রতিবছরের মতো এবারও ০৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হল বিশ্ব ক্যান্সার দিবস ২০২৫। এই ঘাতক ব্যাধির প্রতিকারে ব্যবস্থা নিতে সরকার ও ব্যক্তি বিশেষের ওপর তাগিদ দিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হল। আমাদের মধ্যে অধিকাংশই কোনো না কোনো ভাবে ক্যান্সারের সম্মুখীন হয়েছে; অর্থাৎ আমাদের পরিচিত কেউ না কেউ আছেনই যিনি কিনা ক্যান্সারে আক্রান্ত বা পূর্বে আক্রান্ত হয়েছিল। ২০০০ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড সামিটে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রতিনিধি সম্মিলিতভাবে ৪ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব ক্যান্সার দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। বিশ্ব ক্যান্সার দিবসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল মানুষদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, ক্যান্সারের বিভিন্নতাকে বোঝা এবং সেই সাথে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রকে এই সমস্যাটি সম্পর্কে অবগত করা।
> ক্যান্সার কতোটা সন্নিকটে?১৯৯০ সাল থেকে করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছরে নতুন ৮.১ মিলিয়ন ক্যান্সারে আক্রান্তের তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৪ সাল নাগাদ বছরে ১৮.১ মিলিয়ন নতুন রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। এটি এমন একটি রোগ, যার কারণে প্রতিবছর প্রায় ৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন মানুষ মারা যাচ্ছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগই আমাদের মতো দেশের মানুষ। এর পেছনে বহু কারণ থাকতে পারে। অংশগ্রহণকারী ক্যানসার বিশেষজ্ঞগণ জানান খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে ধূমপান বা মদ্যপান কিংবা ব্যায়ামের অভাবেও এ ধরনের রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এমনকি শুধু তামাকই সারা পৃথিবীতে ২২ শতাংশ মানুষের মৃত্যুর কারণ। এছাড়া আমাদের দেশের প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার সুব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত। আমাদের দেশেও ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে এটি ২০ লাখের বেশি। ক্যান্সার আক্রান্তদের মধ্যে ৩০ বছর থেকে ৬৯ বছর বয়সী শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ রোগীর অকাল মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ক্যান্সার আক্রান্তদের অকাল মৃত্যুরোধে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরুর উপর গুরত্বারোপ করেছে। আমাদের দেশে তামাকজনিত ক্যানসারগুলোতে পুরুষেরা বেশি আক্রান্ত হয়। খাদ্যনালি ও কোলন ক্যানসারেও পুরুষেরা বেশি আক্রান্ত হয়। যদিও প্রোস্টেট ক্যানসার তুলনামূলকভাবে কম। আর নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার, জরায়ু মুখের ক্যানসার, খাদ্যনালি, কোলন ক্যানসার, ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে আজকাল নারীদের ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও বাড়ছে। আর নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই নাক-কান-গলার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার বেড়ে চলেছে। প্রচলিত ক্যান্সার সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যথাক্রমে ফুসফুস, স্তন ও অন্ত্রের ক্যান্সার। বৈশ্বিকভাবে এই বিষয়কে গুরুত্বের সাথে যদি এখনই না নেওয়া হয় তবে ধারণা করা যায় যে ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে ক্যান্সার জনিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৩.১ মিলিয়নে দাঁড়াবে। যদিও বর্তমানে মানুষের মধ্যে পাওয়া ক্যান্সারের ৪০% এরও বেশি নিরাময়যোগ্য এবং আক্রান্ত রোগীর বেঁচে যাওয়ার সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো সচেতনতা এবং সুস্থ জীবনযাত্রা। সঠিক তথ্য, জীবনধারায় পরিবর্তন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে আমরা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারি।
> ক্যান্সারের কারণ ও ঝুঁকিক্যান্সারের মূল কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে বিভিন্ন গবেষণায় কিছু প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, যা এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।১. তামাক ও ধূমপান : ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। ফুসফুস, মুখগহ্বর, গলা, পাকস্থলী এবং অন্ত্রের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ধূমপান সরাসরি দায়ী। তামাকের মধ্যে থাকা নিকোটিন ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ শরীরের কোষগুলোর উঘঅ ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্যান্সারের সৃষ্টি করে।২. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস : অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত লবণ ও চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফাইবারযুক্ত খাবার, শাকসবজি ও ফলমূল কম খেলে অন্ত্র ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৩. শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: নিয়মিত ব্যায়াম না করা এবং অতিরিক্ত স্থূলতা শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, যা স্তন, কোলন ও অন্যান্য ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।৪. অ্যালকোহল সেবন : অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন লিভার, মুখ, গলা এবং খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।৫. বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত কারণ : বায়ুদূষণ, কীটনাশক ও অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শেও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।৬. বংশগত ও জিনগত কারণ : কিছু ক্যান্সার পারিবারিকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। যদি পরিবারের কারও ক্যান্সার থাকে, তবে অন্য সদস্যদের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
> ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা :১. ক্যান্সার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান : সঠিক তথ্য জানা ও তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অনেক মানুষ ক্যান্সার সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে, যা তাদের অকারণে আতঙ্কিত করে তুলতে পারে।
২. স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং : ক্যান্সার প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা গেলে এটি প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করা সহজ হয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিশেষ করে যাদের পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।৩. জনসচেতনতা প্রচারণা : বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা, হাসপাতাল ও স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমেও ক্যান্সার প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
> সুস্থ জীবনযাত্রার মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধ :১. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস : সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া-ফাইবারযুক্ত খাবার যেমন: ব্রাউন রাইস, ওটস, বাদাম গ্রহণ। প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা। পর্যাপ্ত পানি পান করা। ২. নিয়মিত ব্যায়াম : প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। হাঁটা, দৌড়, সাইক্লিং, যোগব্যায়াম ইত্যাদি শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ করে।
৩. ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার : ধূমপান ও অ্যালকোহল ক্যান্সারের প্রধান কারণগুলোর একটি। এগুলো থেকে দূরে থাকলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুলাংশে কমে যায়।৪. মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা : দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও উদ্বেগ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ধ্যান, যোগব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার মাধ্যমে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা জরুরি।৫. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা : বিশেষ করে ৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। স্তন ক্যান্সারের জন্য ম্যামোগ্রাফি, জরায়ু ক্যান্সারের জন্য প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট এবং পুরুষদের জন্য প্রোস্টেট ক্যান্সারের স্ক্রিনিং করা দরকার।
৬. দূষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা : বায়ুদূষণ, কীটনাশক ও অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা দরকার। মুখোশ পরিধান করা, বিশুদ্ধ পানি পান করা ও অর্গানিক খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে শরীরকে বিষাক্ত রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
> ক্যান্সার নিরাময় ও চিকিৎসার অগ্রগতি : আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে বর্তমানে ক্যান্সার নিরাময়ে নানা পদ্ধতি বিদ্যমান।কেমোথেরাপি: ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা হয়।রেডিওথেরাপি: উচ্চ-শক্তির রশ্মির মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়।সার্জারি: টিউমার অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয়।ইমিউনোথেরাপি: শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়। পরিশেষে বলতে চাই, ক্যান্সার একটি জটিল ও মারাত্মক রোগ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য। সচেতনতা ও সুস্থ জীবনযাত্রার মাধ্যমে আমরা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারি। টিকা দিয়েও কয়েকটি ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়- যকৃতের ক্যান্সার, মেয়েদের জরায়ুমুখ ক্যান্সার এর মধ্যে অন্যতম।
মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদহোমিও চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি ন্যাশনাল হোমিও রিসার্চ সেন্টার অলংকার শপিং কমপ্লেক্স চট্টগ্রাম ইমেইল : drmazed96@gmail.com
বিভাগ : স্বাস্থ্য
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন

টাঙ্গাইলে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা বলে ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ, প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগীদের সংবাদ সম্মেলন

মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে শত্রুরা অত্যাচার চালাতে পারবে না

লাকসামে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে কনস্টেবলকে মারধরের অভিযোগ

গৃহকর্মী মারধরের ঘটনায় পরীর বিরুদ্ধে জিডি

রাশিয়াকে ফুটবলের মানচিত্রে ফেরার জন্য দোয়া করতে বললেন ফিফা সভাপতি

মুসলমানদের ওয়াকফ সম্পত্তি যেভাবে লুট হচ্ছে ভারতে

বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আগামী দুই বছরের জন্য বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ

রাজবাড়ীতে ছাত্রদল নেতার অফিসে হামলা - মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও স্বেচ্ছাসেবকদল নেতার গাড়িতে আগুন

ভুরুঙ্গামারীতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা আটক

পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ ওয়ানডেতেও চ্যাপম্যানকে পাচ্ছে না নিউজিল্যান্ড

নরসিংদীতে ছোট ভাইয়ের শাবলের আঘাতে বড় ভাই নিহত

হারানো বিজ্ঞপ্তি

ড. ইউনূসকে যা বললেন নরেন্দ্র মোদি

বিগত সরকারগুলো রাজনীতিকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছে: ডা. ইরান

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করলেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী

ওয়াকফ সংশোধনী বিল নিয়ে জনতা দলের দুই নেতার পদত্যাগ

দৌলতপুর সীমান্তে মাদকের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘর্ষ ও গুলি : আহত-২

খেলাফত আন্দোলনের আমীরের ইন্তেকালে ইসলামী আন্দোলন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের শোক

হিন্দু জাতি ভুয়া, কিন্তু বলিভিয়ায় তাদের জমি দখল বাস্তব

মনোহরগঞ্জে ৪বছরের নাতনিকে ধর্ষণচেষ্টা, অভিযুক্ত মনিরকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দিলো এলাকাবাসী