ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০২৪ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩১

সাফা মারওয়া : হাজেরা আ. এর স্মৃতিধন্য দু’টি পাহাড়

Daily Inqilab এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্শী

১৪ জুন ২০২৪, ১২:১৬ এএম | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ১২:১৬ এএম

আল্লাহ তা‘আালার মকবুল বান্দাহদের থেকে প্রতিপন্ন এমন সব কর্মকাÐ যা তারা এবাদতের নিয়তে আদায় করে থাকেন, যেগুলো সরাসরি নির্ধারিত এবাদত নয়। কিন্তু পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে এগুলো এতই পছন্দনীয় ও মুস্তাহাব হয়ে থাকে যে, সেগুলো সম্মানিত এবাদতের অংশ বানিয়ে দেয়া হয়। এর উদাহরণ হযরত হাজেরা আ.-এর সাইয়্যেদেনা ইসমাঈল আ.-এর জন্য পানির তালাশে সাফা ও মারওয়া দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে পাগলের মতো দৌড়ানো। আল্লাহ তা‘আলার নিকট এই প্রিয় সেবিকার এই কাজ এতই পছন্দনীয় হলো যে, তিনি একে মানাসেকে হজের অংশ বানিয়ে দিলেন, ব্যবহারিক ভাষায় একে ‘সাঈ’ বলে এবং তা হজ ও ওমরার ওয়াজিবসমূহের অন্তর্ভুক্ত।

একথা সুস্পষ্টভাবে জানা থাকা দরকার যে, সাঈ এর সাত চক্করের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো জিকির, দোয়া কালাম, ওয়াজিফা অথবা কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয় না। তবে আপনি যদি ইচ্ছা করেন তবে কোরআনুল কারীমের বিভিন্ন সূরা তেলাওয়াত করতে পারেন, বিভিন্ন দোয়া, তাসবিহাত ও মোনাজাত করতে পারেন। দরুদ শরীফ বারবার পাঠ করতে পারেন। আর যদি স্মরণে কিছুই না আসে, তাহলে শুধু আল্লাহর নাম জিকির করতে পারেন। অথবা যেকোনো উত্তম কালেমা আপনার মনে আসে পাঠ করতে পারেন। এসবই জায়েজ। যদি কোনো কিছু মনে না আসে তবে চুপচাপ সাঈ এর সাত চক্কর সাফা এবং মারওয়ার মধ্যে পূর্ণ করুন।

সাফা এবং মারওয়ার সাঈ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক পটভ‚মিকাকে তুলে ধরে ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হি.) এবং অন্যান্য হাদিস শাস্ত্রের ইমামগণ এবং তাফসির শাস্ত্রের ইমামগণ বহুসংখ্যক হাদিস ও রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে একটি রেওয়ায়েত হলো এই : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, হযরত ইব্রাহীম আ., হযরত হাজেরা আ. এবং দুগ্ধপোষ্য ছেলে হযরত ইসমাঈল আ.-কে (শাম থেকে) মক্কায় নিয়ে আসলেন। তৎকালে মক্কায় মানুষ আবাদ ছিল না এবং পানির নাম-নিশানাও ছিল না। সুতরাং তিনি এ দু’জনকে বাইতুল্লাহর কাছে ছেড়ে দিলেন এবং একটি পোটলায় কিছু খেজুর এবং মশকের মধ্যে কিছু পানিও তাদের দিলেন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আরও বর্ণনা করেছেন : হযরত ইসমাঈল আ.-এর মাতা হাজেরা আ. ইসমাঈল আ.-কে দুগ্ধপান করাতে লাগলেন এবং সেই পানি হতে পান করতে লাগলেন। এক সময় তার মশকের পানি শেষ হয়ে গেল। যার ফলে তিনি এবং তার ছেলে পিপাসার্ত হয়ে পড়লেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, তার দু’বছর বয়স্ক ছেলে পিপাসা-কাতর হয়ে উভয় পা মাটিতে মারছেন। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তিনি পানির তালাশে বের হলেন।

সেই স্থানের কাছেই ছিল ‘সাফা’ পাহাড়, এতে আরোহণ করে করে উপত্যকার এদিকে-সেদিকে তাকাতে লাগলেন। যদি কিছু নজরে আসে। কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। সুতরাং সাফা হতে অবতরণ করে উপত্যকায় চলে আসলেন এবং পরিধেয় বসন আঁটসাঁট করে বিপদগ্রস্ত মানুষের মতো দ্রæত দৌড়ে তিনি তা পার হলেন এবং ‘মারওয়া’ পাহাড়ে আরোহণ করে এদিকে-সেদিকে কোথাও মানুষকে তালাশ করতে লাগলেন। কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। এভাবে তিনি (সাফা এবং মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে) সাতবার চক্কর দিলেন। বর্ণনাকারী আরও বলেন, হুজুর আকরাম সা. ইরশাদ করেছেন, এ কারণেই মানুষ সাফা এবং মারওয়ার মধ্যে (হযরত হাজেরা আ.-এর সুন্নাতের ওপর আমল করতে গিয়ে) সাঈ করেন। (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া : খ. ২, পৃ. ১২২৮-১২২৯, বর্ণনা সংখ্যা ৩১৮৪)।

এ ঘটনার প্রায় ৫ হাজার বছর অতিবাহিত হয়েছে। এখন সেই উপত্যকা নেই, এমনকি সেই পাহাড়ি অবস্থাও নেই। এমনকি আল্লাহর প্রিয় সেই সেবিকা হাজেরা আ.-এর ওপর যে অবস্থার অবতারণা ঘটেছিল, তাও অবশিষ্ট নেই। তারপরও হাজী সাহেবান আল্লাহর নির্দেশ পালনস্বরূপ সাঈ করেন। যখন হাজী সাহেবান ও ওমরাকারীগণ সাফা এবং মারওয়ার সেই অংশে উপস্থিত হন, তখন তারাও দৌড়ে সেই স্থান অতিক্রম করেন। হযরত হাজেরা আ. স্বীয় কলিজার টুকরা হযরত ইসমাঈল আ. এর জন্য পানির তালাশে এক পাহাড় হতে অন্য পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে নিচু এই উপত্যকাকে পাড়ি দেওয়ার জন্য দৌড়ে ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রিয় সেবিকা হাজেরা আ.-এর এই আমল খুবই পছন্দীয় হলো। আর আজও আমরা সেই পেরেশানি ও হৃদকম্পনের খেয়ালে ও চিন্তায় ধারণ করে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ পালনার্থে সাঈ করি।

 

 


বিভাগ : শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ ইসলাম


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

সন্তানদের কিসের উপর রেখে যাচ্ছি-২
সন্তানদের কিসের উপর রেখে যাচ্ছি-১
কে অন্ধ, কে চক্ষুষ্মান
সে-ই স্বাধীন যে সিজদা করে এক আল্লাহকে
বান্দা জানে না, কিসে তার কল্যাণ-২
আরও

আরও পড়ুন

প্রবাসীদের যে জন্য সুখবর দিলো মালয়েশিয়া

প্রবাসীদের যে জন্য সুখবর দিলো মালয়েশিয়া

জাবি শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় মামলা, তদন্ত কমিটি গঠন, ফটকে তালা, মশাল মিছিল

জাবি শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় মামলা, তদন্ত কমিটি গঠন, ফটকে তালা, মশাল মিছিল

মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে থাকবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল

মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে থাকবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল

"নতুন সিনেমা নিয়ে ফিরছেন গ্লোবাল তারকা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি"

"নতুন সিনেমা নিয়ে ফিরছেন গ্লোবাল তারকা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি"

ড. ইউনূসকে নিয়ে খালেদা জিয়ার পুরোনো যে বক্তব্য ভাইরাল

ড. ইউনূসকে নিয়ে খালেদা জিয়ার পুরোনো যে বক্তব্য ভাইরাল

নতুন নির্বাচন কমিশনের প্রতি ইসলামী আন্দোলনের শুভ কামনা

নতুন নির্বাচন কমিশনের প্রতি ইসলামী আন্দোলনের শুভ কামনা

আলোচনায় ফ্যাসিস্ট হাসিনার ‘টুস করে ফেলে দেয়ার’ হুমকি

আলোচনায় ফ্যাসিস্ট হাসিনার ‘টুস করে ফেলে দেয়ার’ হুমকি

দীর্ঘ ১৫ বছর সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে পারেনি: খোকন

দীর্ঘ ১৫ বছর সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে পারেনি: খোকন

'ইউটিউব ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে অভিনেতা তারিক আনাম খানের নাটক'

'ইউটিউব ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে অভিনেতা তারিক আনাম খানের নাটক'

বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান

বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান

ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর বোর্ড অব গভর্নর সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানীকে জমিয়াতুল মোদার্রেসীন ও দারুননাজাত মাদরাসা’র সম্বর্ধনা

ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর বোর্ড অব গভর্নর সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানীকে জমিয়াতুল মোদার্রেসীন ও দারুননাজাত মাদরাসা’র সম্বর্ধনা

সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানীকে জমিয়াতুল মোদার্রেসীন ও দারুননাজাত মাদরাসা’র সংবর্ধনা

সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানীকে জমিয়াতুল মোদার্রেসীন ও দারুননাজাত মাদরাসা’র সংবর্ধনা

লালমোহনে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত যুবদল নেতা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

লালমোহনে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত যুবদল নেতা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

চকরিয়ার বিএনপি নেতা আবু তাহের চৌধুরীর মৃত্যুতে সালাহউদ্দিন আহমদ ও হাসিনা আহমদের শোক

চকরিয়ার বিএনপি নেতা আবু তাহের চৌধুরীর মৃত্যুতে সালাহউদ্দিন আহমদ ও হাসিনা আহমদের শোক

উইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামছে বাংলাদেশ

উইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামছে বাংলাদেশ

বেইজিং সংস্কৃতি ও পর্যটন ব্যুরো ও আটাবের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত

বেইজিং সংস্কৃতি ও পর্যটন ব্যুরো ও আটাবের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানের সাক্ষাৎ

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানের সাক্ষাৎ

দেশের বাজারে ফের বাড়ল সোনার দাম

দেশের বাজারে ফের বাড়ল সোনার দাম

সবচেয়ে কম মূল্যে বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ দিচ্ছে নেপাল: নেপাল রাষ্ট্রদূত

সবচেয়ে কম মূল্যে বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ দিচ্ছে নেপাল: নেপাল রাষ্ট্রদূত

আগামী নির্বাচন নিয়ে দিল্লি ভয়ংকর পরিকল্পনা করছে: যুক্তরাষ্ট্র জাগপা

আগামী নির্বাচন নিয়ে দিল্লি ভয়ংকর পরিকল্পনা করছে: যুক্তরাষ্ট্র জাগপা