মজলুমের পাশে দাঁড়ানো নববী আদর্শ
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম
চলতি সময়ে বিশ্বজুড়ে অন্যায়, অবিচার, শোষণ আর মানবতার অবমাননা নিত্যদিনের স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। সবল যেখানে অবলীলায় দুর্বলকে গ্রাস করছে, আইন যেখানে প্রভাবশালীদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে, সেখানে আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি মানবজাতির জন্য মুক্তির দিশারি হতে পারে। সেটি হলো ‘হিলফুল ফুযুল’ বা ‘কল্যাণকামী শান্তি সংঘ’। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর নবুয়তপূর্ব জীবনের এক অনন্য, গৌরবোজ্জ্বল এবং বৈপ্লবিক অধ্যায় এটি। এটি ছিল মূলত মজলুমের পাশে দাঁড়ানো, মানবাধিকার রক্ষা এবং সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক কালজয়ী নববী আদর্শ, যা সমকালীন পঙ্কিল সমাজ গঠনে সবচেয়ে বড় দাওয়াই।
বর্বরতার অন্ধকার ও অশান্তির দাবানল : তৎকালীন আরব সমাজ ছিল জাহেলিয়াত বা বর্বরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। গোত্রীয় অহংকার, লুটপাট, খুনোখুনি আর নারীর অবমাননা ছিল সাধারণ বিষয়। সামান্য কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোত্রগুলোর মধ্যে যুগের পর যুগ ধরে যুদ্ধ চলত। এমনই এক রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ছিল ‘হারবুল ফিজার’ বা অন্যায় সমর। কায়স ও কুরাইশ গোত্রের মধ্যে সংঘটিত এই যুদ্ধের ভয়াবহতা, নির্বিচার রক্তপাত এবং অমানবিক নিষ্ঠুরতা তরুণ মুহাম্মদ (সা.) কে গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত করে। তিনি ভাবলেন, এভাবে একটি সমাজ চলতে পারে না; মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
একটি আর্তনাদ এবং বিবেকবানের জাগরণ : ফিজার যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই মক্কায় এক চরম ও জঘন্য অন্যায় সংঘটিত হয়। ইয়েমেনের জুবাইদ গোত্রের এক ব্যবসায়ী কিছু পণ্য নিয়ে মক্কায় আসেন। মক্কার প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি আস বিন ওয়ায়েল সেই সমস্ত পণ্য ক্রয় করে। কিন্তু পণ্য হস্তগত করার পর সে তার মূল্য পরিশোধ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়। বিদেশি, অসহায় ও মক্কায় কোনো আত্মীয় বা গোত্রীয় শক্তি না থাকায় সেই ব্যবসায়ী মক্কার কুরাইশ নেতাদের দরজায় দরজায় ঘুরেও কোনো বিচার পাননি। চরম নিরুপায় ও ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি পরদিন ভোরে কাবা ঘরের পাশে আবু কুবাইস পাহাড়ে আরোহণ করেন এবং উচ্চস্বরে মক্কাবাসীর বিবেককে জাগ্রত করে নিজের ওপর হওয়া জুলুমের বিবরণ দিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন।
একটি অসহায় মানুষের এই করুণ আর্তনাদ মক্কার কতিপয় নীতিবান ও বিবেকবান যুবকের হৃদয়ে প্রচ- নাড়া দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর চাচা যুবাইর বিন আবদুল মুত্তালিবের বিশেষ উদ্যোগে এবং আবদুল্লাহ বিন জুদানের বাড়িতে মক্কার প্রভাবশালী হাশেম, মুত্তালিব, জহুরা ও তাইম গোত্রের প্রগতিশীল তরুণেরা সমবেত হন। সেখানে দীর্ঘ আলোচনার পর তারা একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যা ইতিহাসে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তৎকালীন তরুণ মুহাম্মদ (সা.) এই চুক্তি সম্পাদনে ও পরিকল্পনা প্রণয়নে অত্যন্ত সক্রিয়, অগ্রণী এবং দূরদর্শী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
হিলফুল ফুযুলের মূল অঙ্গীকারসমূহ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই শান্তি সংঘের সদস্যরা আল্লাহর নামে প্রধানত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট শপথ বা অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন তা হলো -দেশ থেকে অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম ও উগ্রতা সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হবে। বহিরাগত (বিদেশি মুসাফির) ও স্থানীয় নির্বিশেষে মক্কায় অবস্থানরত সব মজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কোনো অত্যাচারী, জালেম বা অপরাধীকে মক্কার বুকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। দুর্বল, এতিম ও ধনহীনদের পাশে দাঁড়িয়ে সামাজিক সাম্য ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা হবে। সমাজ থেকে সব ধরনের হানাহানি ও গোত্রীয় যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে আনা হবে।এই অঙ্গীকার কেবল কাগজের চুক্তি ছিল না, বরং সংঘের যুবকেরা আস বিন ওয়ায়েলের বাড়ি ঘেরাও করে সেই বিদেশি ব্যবসায়ীর পাওনা টাকা আদায় করে দিয়েছিলেন।
নববী জীবনের অনন্য শিক্ষা ও বিশ্বজনীনতা : নবুয়ত পাওয়ার পর এবং মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) হিলফুল ফুযুলের সেই দিনগুলোর কথা অত্যন্ত গর্ব এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেন। তিনি মদিনার জীবনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আবদুল্লাহ বিন জুদানের বাড়িতে আমি এমন একটি চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম, যার বিপরীতে আমাকে যদি লাল রঙের অত্যন্ত মূল্যবান উটও (তৎকালীন আরবের সবচেয়ে দামি সম্পদ) দেওয়া হতো, তবুও আমি তা গ্রহণ করতাম না। আজ ইসলামের যুগেও যদি কেউ আমাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন কোনো চুক্তির দিকে আহ্বান করে, তবে আমি সানন্দে তাতে সাড়া দেব। (সুনানে বায়হাকি)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এই পবিত্র বাণী প্রমাণ করে, সমাজ থেকে অন্যায় দূর করা, শান্তি ও মানবাধিকার রক্ষা করার লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের গ-িতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিশ্বজনীন ও শাশ্বত এক মানবিক দায়িত্ব।
সমকালীন সমাজে হিলফুল ফুযুলের প্রাসঙ্গিকতা গভীরভাবে উল্লেখযোগ্য। আজকের আধুনিক ও সভ্য দাবিদার সমাজে হিলফুল ফুযুলের আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি, বরং এর প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়েছে। রাজনীতি, আইন ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সমাজে আজও দুর্বলদের জমি, সম্পদ ও মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হিলফুল ফুযুল আমাদের শেখায়, মজলুমের কোনো দল বা জাত নেই। সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তার পাশে দাঁড়ানো এবং অত্যাচারীর হাতকে রুখে দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব।
হিলফুল ফুযুল ছিল মূলত তরুণদের একটি সম্মিলিত উদ্যোগ। আজকের তরুণ সমাজ যদি অপরাধ, মাদক, গ্যাং কালচার ও অনৈতিকতা ছেড়ে সমাজ সংস্কার ও সেবামূলক কাজে এগিয়ে আসে, তবে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। হিলফুল ফুযুল চুক্তির সময় কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল কেবল নিখাদ মানবকল্যাণ। বর্তমান পৃথিবীর নানামুখী সংকটের মূলে রয়েছে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। এই হানাহানি বন্ধে হিলফুল ফুযুলের অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি।
হিলফুল ফুযুল কেবল ইসলামের ইতিহাসের একটি প্রাচীন চুক্তি নয়, এটি মানব মুক্তির একটি জীবন্ত ও চিরন্তন দর্শন। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এই মহান আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে পারলে সমাজ থেকে সব ধরনের জুলুম-নির্যাতন চিরতরে বিদায় নেবে। আসুন, মহানবী (সা.)-এর এই কালজয়ী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, মজলুমের মুখে হাসি ফোটাই এবং একটি শান্তিময় পৃথিবী বিনির্মাণে অংশীদার হই।
বিভাগ : ইসলামী জীবন
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ৪ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ডাকসু নেতাদের সাক্ষাৎ
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের
গুম আইন সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে ফয়সালা হবে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
গফরগাঁওয়ে সন্তানকে বেঁধে প্রবাসীর স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১
বট বাহিনীর গুজব রুখতে ভুমিকা রাখবে বগুড়া জিয়া সাইবার ফোর্স : বাদশা
ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা চীনের
লৌহজংয়ে অবৈধ বালুর গদিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান দেড় কিলোমিটার পাইপ বিনষ্ট, ড্রেজার বিকল
ধানমন্ডিতে শিশুদের খেলাধুলায় বাড়ল নতুন সুযোগ, চালু হলো ইনডোর প্লে-গ্রাউন্ড বাবুল্যান্ড
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের কোনো স্পষ্ট কৌশল নেই, মনে করেন ৭১% মার্কিন ভোটার
তেজগাঁওয়ে সন্দেহজনক ২৩ জন আটক
লালমাইয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে ট্রাক্টর চালককে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ৩
আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ রক্ষায় জেদ্দায় ৪১ দেশের সামরিক শীর্ষ নেতাদের বৈঠক
দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
সিরাতচর্চা : পরিশীলিত জীবন গঠনের সূতিকাগার
সউদী ঘাঁটিতে হুতি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইতালির ইউরোফাইটার যুদ্ধবিমান
মালিবাগের পর ঢাকার আরও দুই জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ
সউদীর প্রতিরক্ষায় ‘যে কোনো সীমা পর্যন্ত’ যেতে প্রস্তুত পাকিস্তান: সামরিক বাহিনী
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নবী জীবনের শিক্ষা
নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে হামাসকে হামলার সুযোগ করে দিয়েছিল ইসরায়েল: হান্টার বাইডেন