মজলুমের কান্না ও আল্লাহর বিচার : জুলুমের বিরুদ্ধে ইসলামের সতর্কবার্তা
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম
একজন মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলেন। পরিবারের কাছে নেই কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য, নেই তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সংবাদ। দিন গড়ায়, মাস পেরোয়, কখনো বছরের পর বছর চলে যায়Ñকিন্তু অপেক্ষার শেষ হয় না। প্রিয়জনের সন্ধানে পরিবারের সদস্যদের প্রতিটি দিন কাটে উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা ও গভীর মানসিক বেদনায়। গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজের ঘটনা শুধু একজন মানুষের ওপর সংঘটিত অন্যায় নয়; এর অভিঘাত পৌঁছে যায় একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার কাঠামো পর্যন্ত। একজন মানুষ কোথায় আছেন, তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছেÑএ প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার তাঁর পরিবারের রয়েছে। সত্য জানার অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি মানবমর্যাদার মৌলিক অংশ।
ইসলাম মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, সম্মান ও নিরাপত্তাকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করেছে। কোরআন ও সুন্নাহতে জুলুম, অন্যায়, নির্যাতন, মিথ্যা, অপবাদ ও অধিকার হরণের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মজলুমের পাশে দাঁড়ানো, সত্য প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার করা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।তাই কোনো মানুষকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা, তাঁর অবস্থান গোপন করা, পরিবারকে অন্ধকারে রাখা, সত্য অনুসন্ধানে বাধা দেওয়া কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করা ইসলামের ন্যায়বিচারের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মানুষের জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত : মানুষের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। জীবন, নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের অধিকার আল্লাহপ্রদত্ত। কোনো ব্যক্তি অন্যায়ভাবে অন্যের জীবন ও নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে না।পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন : তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। (সুরা আন-নিসা: ২৯)। অন্যত্র আল্লাহ বলেনÑ যে ব্যক্তি কোনো প্রাণকে প্রাণের বিনিময় ছাড়া অথবা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার অপরাধ ছাড়া হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল। (সুরা আল-মায়িদা: ৩২)। এই আয়াতগুলো মানুষের জীবনের মর্যাদা ও নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে। একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করা অত্যন্ত গুরুতর অন্যায়।
জুলুমের পরিণতি ভয়াবহ : ইসলামে জুলুমের কোনো বৈধতা নেই। ক্ষমতা, পদ, সম্পদ কিংবা প্রভাবÑকোনোটিই অন্যের অধিকার হরণ করার অনুমতি দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনÑতোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহ হবে। (সহিহ মুসলিম : ২৫৭৮)। জুলুম কখনো শুধু নির্যাতিত ব্যক্তির ক্ষতি করে না; এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে। যখন ক্ষমতাবান ব্যক্তি দুর্বল মানুষের অধিকার কেড়ে নেয় এবং তার প্রতিকার হয় না, তখন মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।
মজলুমের দোয়া ও আল্লাহর বিচার : জুলুমের শিকার মানুষের আহাজারি আল্লাহর কাছে উপেক্ষিত থাকে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনÑমজলুমের দোয়া থেকে বেঁচে থাকবে; কারণ তার ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা নেই। (সহিহ বুখারি : ১৪৯৬; সহিহ মুসলিম : ১৯)। এই হাদিস জালিমের জন্য গভীর সতর্কবার্তা। মানুষ হয়তো নিজের ক্ষমতা ও প্রভাবের কারণে সাময়িকভাবে অন্যায় থেকে পার পেয়ে যেতে পারে; কিন্তু আল্লাহর বিচার থেকে কেউ পালাতে পারে না। জুলুমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আশ্বাস হলোÑদুনিয়ার বিচারে কোনো সত্য চাপা পড়ে গেলেও আল্লাহর কাছে কোনো অন্যায় অজানা থাকে না।
ন্যায়বিচার আল্লাহর নির্দেশ : ইসলামে ন্যায়বিচার কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি আল্লাহর নির্দেশ।আল্লাহ তাআলা বলেন : নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে। (সুরা আন-নিসা : ৫৮)। ন্যায়বিচারের অর্থ শুধু আদালতে বিচার করা নয়। বরং মানুষের অধিকার রক্ষা করা, সত্য অনুসন্ধান করা, অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং অপরাধের যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করাও ন্যায়বিচারের অংশ।
ন্যায়বিচারে পরিচয় বা পক্ষপাতের স্থান নেই : কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান, মতাদর্শ, পেশা বা ব্যক্তিগত পরিচয় তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে কমিয়ে দিতে পারে না। আল্লাহ বলেনÑহে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং ন্যায়বিচারের সাক্ষ্য দাও। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত না করে। (সুরা আল-মায়িদা: ৮)। এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত সুস্পষ্টÑবন্ধু-শত্রু, আপন-পর, শক্তিশালী-দুর্বলÑসবার ক্ষেত্রেই ন্যায়ের নীতি সমান হতে হবে।
পরিবারের কষ্টকে অবহেলা করা যাবে না : কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে তাঁর পরিবারের ওপর যে মানসিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি হয়, তা সহজে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। প্রতিদিনের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং প্রিয়জনের খবরের আশায় থাকা পরিবারের জন্য গভীর কষ্টের বিষয়।তাই কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা জরুরি। তাঁদের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া, নির্ভরযোগ্য তথ্য জানানো এবং তদন্তের বিষয়ে যথাসম্ভব স্বচ্ছতা বজায় রাখা মানবিক দায়িত্ব।পরিবারকে অকারণে হয়রানি করা, তাদের দুঃখকে উপহাস করা কিংবা তাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় রাখা কোনো সভ্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
সত্য গোপন করা অন্যায়ের পথ খুলে দেয় : ইসলাম সত্যকে গোপন করতে নিষেধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনÑতোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না। (সুরা আল-বাকারা: ৪২)। সত্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। সত্য মানুষের অধিকার। কোনো ঘটনার প্রকৃত তথ্য জানা থাকলে তা অন্যায়ভাবে গোপন করা, বিকৃত করা বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা সমাজে আরও বড় অন্যায়ের জন্ম দিতে পারে।
সংবাদ প্রচারে যাচাই জরুরি : নিখোঁজ বা গুমের ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সব তথ্য সত্য নয়। ভুল তথ্য, গুজব কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা একটি পরিবারের কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেনÑহে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো। (সুরা আল-হুজুরাত: ৬)। তাই কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে সংবাদ প্রচারের আগে তথ্য যাচাই করা প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব। সত্য অনুসন্ধানের নামে গুজব ছড়ানো সত্য প্রতিষ্ঠার পথ নয়।
অপবাদ ও অনুমান থেকে বিরত থাকা : কোনো মানুষ নিখোঁজ হলে তাঁকে ঘিরে নানা ধরনের অনুমান, অভিযোগ কিংবা অপবাদ ছড়াতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী।আল্লাহ বলেনÑহে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা পাপ। (সুরা আল-হুজুরাত: ১২)। তাই সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলতে হবে। কারও সম্মানহানি করে কিংবা ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়িয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
সাক্ষ্যে সত্যবাদিতা অপরিহার্য : ন্যায়বিচারের অন্যতম ভিত্তি হলো সঠিক সাক্ষ্য ও সত্য তথ্য। আল্লাহ বলেনÑন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থেকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা অথবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। (সুরা আন-নিসা : ১৩৫)। ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভয়, সম্পর্ক বা ক্ষমতার প্রভাব যেন সত্য সাক্ষ্য থেকে কাউকে বিরত না রাখে। একজন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সত্য সাক্ষ্য কখনো কখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ক্ষমতা একটি আমানত : ইসলামে ক্ষমতা ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি আমানত। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সহিহ বুখারি: ৭১৩৮; সহিহ মুসলিম: ১৮২৯)। এই হাদিস প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে জবাবদিহির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষের ওপর দায়িত্ব মানেই মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব।
মজলুমের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের শিক্ষা : ইসলাম অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করে। আল্লাহ বলেনÑসৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে তোমরা একে অপরকে সহযোগিতা করো। (সুরা আল-মায়িদা : ২)। মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর অর্থ বিশৃঙ্খলা বা প্রতিশোধ সৃষ্টি করা নয়। বরং বৈধ, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সংগত উপায়ে তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা।অন্যায়ের শিকার পরিবারের কথা শোনা, তাদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথে সহযোগিতা করা মানবিক দায়িত্ব।
বিভাগ : ইসলামী জীবন
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন
কান্তেকে বাদ দিয়ে তরুণদের নিয়ে ফ্রান্সে নতুন যুগের শুরু জিদানের
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ৪ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ডাকসু নেতাদের সাক্ষাৎ
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের
গুম আইন সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে ফয়সালা হবে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
গফরগাঁওয়ে সন্তানকে বেঁধে প্রবাসীর স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১
বট বাহিনীর গুজব রুখতে ভুমিকা রাখবে বগুড়া জিয়া সাইবার ফোর্স : বাদশা
ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা চীনের
লৌহজংয়ে অবৈধ বালুর গদিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান দেড় কিলোমিটার পাইপ বিনষ্ট, ড্রেজার বিকল
ধানমন্ডিতে শিশুদের খেলাধুলায় বাড়ল নতুন সুযোগ, চালু হলো ইনডোর প্লে-গ্রাউন্ড বাবুল্যান্ড
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের কোনো স্পষ্ট কৌশল নেই, মনে করেন ৭১% মার্কিন ভোটার
তেজগাঁওয়ে সন্দেহজনক ২৩ জন আটক
লালমাইয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে ট্রাক্টর চালককে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ৩
আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ রক্ষায় জেদ্দায় ৪১ দেশের সামরিক শীর্ষ নেতাদের বৈঠক
দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
সিরাতচর্চা : পরিশীলিত জীবন গঠনের সূতিকাগার
সউদী ঘাঁটিতে হুতি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইতালির ইউরোফাইটার যুদ্ধবিমান
মালিবাগের পর ঢাকার আরও দুই জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ
সউদীর প্রতিরক্ষায় ‘যে কোনো সীমা পর্যন্ত’ যেতে প্রস্তুত পাকিস্তান: সামরিক বাহিনী
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নবী জীবনের শিক্ষা