কীভাবে মানুষ ও প্রকৃতির সুরেলা সহাবস্থান গড়েছে চীন
১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট চীনের জন্য ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে ধারণকারী এক বিশেষ দিন। এই দিনেই গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের পরিবেশবিষয়ক আইন সংহিতা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। একই দিনে চীন চতুর্থ জাতীয় পরিবেশ দিবস পালন করে এবং ‘সবুজ পাহাড়-নদীই স্বর্ণ-রৌপ্য পর্বত’—ধারণা প্রবর্তনের ২১তম বার্ষিকীও উদযাপন করে। ক্যালেন্ডারে এই তিন ঘটনার সম্মিলন যেন একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—পরিবেশবান্ধব সভ্যতা নির্মাণের ধারণা এখন কেবল সামাজিক ঐকমত্য নয়, অটল রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা বাংলাদেশের জন্যও চীনের এই পথচলা যোগাতে পারে দারুণ অনুপ্রেরণা।
একসময় চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশদূষণের যন্ত্রণাও ছিল। কিন্তু গত এক দশক ধরে চীন অভূতপূর্ব দৃঢ়তার সঙ্গে পরিচ্ছন্ন আকাশ, নির্মল পানি ও দূষণমুক্ত মাটির জন্য লড়াই করেছে। পেয়েছে ভুরি ভুরি সাফল্য।
বেশ কয়েক বছর বেইজিংয়ের বাসিন্দা হিসেবে আমি এই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষদর্শী। দশ বছর আগেও শীত ও বসন্তে বাইরে বের হলে মাস্ক পরা বলতে গেলে বাধ্যতামূলক ছিল। ধূসর আকাশ দেখে বোঝার উপায় ছিল না—এটি মেঘলা আকাশ, নাকি কুয়াশা ও দূষণের আস্তরণ। অথচ এখন প্রতিদিনই নীল আকাশ হাতছানি দেয়।
২০২৫ সালে চীনের প্রিফেকচার-স্তর ও তার ওপরে থাকা শহরগুলোতে দূষণকারী কণা পিএম২.৫-এর গড় ঘনত্ব ২৮.০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটারে নেমে এসেছে। ভালো মানের বাতাসের দিনের অনুপাত পৌঁছেছে ৮৯.৩ শতাংশে, যা তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর সর্বোচ্চ।
আমার বাড়ির কাছের বেইজিংয়ের ‘মাতৃকা নদী’ হিসেবে পরিচিত ইয়ংতিং নদীও বদলে গেছে। পুনরায় জল ভরাট ও পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের ফলে নদীর দুই তীর এখন সবুজে শোভিত। আশপাশে গড়ে উঠেছে পাঁচটি পার্ক।
ইয়াংজি নদীর প্রধান ধারার পানির মান টানা ছয় বছর এবং হুয়াংহে নদীর পানির মান টানা চার বছর ধরে স্থিতিশীলভাবে দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে।
চীনের বনভূমি আচ্ছাদনের হার এখন ২৫ শতাংশের বেশি। মরুকরণ ও বালুকাময় ভূমির বিস্তার কমানোর ক্ষেত্রেও চীন ‘দ্বিগুণ হ্রাস’ অর্জন করে বিশ্বের শীর্ষ স্থানে আছে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে চীনের পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ‘বিশেষায়িত সংশোধন’ থেকে ‘ব্যবস্থাগত ব্যবস্থাপনা’য় গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রূপান্তর।
‘পাহাড়, নদী, বন, কৃষিজমি, হ্রদ, তৃণভূমি ও বালি—সবই একটি জীবনসম্প্রদায়’—এই ধারণাকে সামনে রেখে চীন এখন আর পরিবেশের প্রতিটি সমস্যাকে বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবিলা করে না। বরং একটি বাস্তুতন্ত্রের সামগ্রিক ভারসাম্য বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত সমাধান খোঁজে।
নদীদূষণ, বায়ুদূষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের বহুমুখী চ্যালেঞ্জে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই ব্যবস্থাগত চিন্তাধারা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশবিষয়ক আইন সংহিতা কার্যকর হওয়াটা চীনের সবুজ অভিযাত্রায় একটি শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করেছে। এটি চীনের নাগরিক আইন সংহিতার পর দ্বিতীয় ‘সংহিতা’ নামধারী আইন। এতে রয়েছে পাঁচটি খণ্ড ও ১ হাজার ২৪২টি ধারা।
৩০টির বেশি সংশ্লিষ্ট আইনকে একীভূত করে এই সংহিতা পরিবেশ সুরক্ষায় অনতিক্রম্য সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে পরিবেশগত পণ্যের মূল্যায়ন ও পরিবেশগত সুরক্ষা ক্ষতিপূরণের মতো ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠা করেছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নতুন জ্বালানিচালিত যানবাহনের মতো সবুজ শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি চীন ঐতিহ্যবাহী শিল্পে অতি-নিম্ন কার্বন নির্গমন রূপান্তরও এগিয়ে নিয়েছে এবং গড়ে তুলেছে বিশ্বের বৃহত্তম পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। চীনে এখন প্রতি ১০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৪ কিলোওয়াট-ঘণ্টাই আসে সবুজ বিদ্যুৎ থেকে।
কার্বন নিঃসরণ কমানো, দূষণ হ্রাস, সবুজায়ন সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—এই চার লক্ষ্যকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার মডেলই ‘সবুজ পাহাড়-নদীই স্বর্ণ-রৌপ্য পর্বত’ ধারণার সবচেয়ে প্রাণবন্ত ব্যাখ্যা। এর মূল বার্তা হলো—পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরস্পরবিরোধী নয়; বরং সঠিক নীতি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে।
বাংলাদেশেও দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নগরায়ণ ঘটছে। একই সঙ্গে বাড়ছে যানজট, বায়ুদূষণ এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো ‘উন্নয়নের সঙ্গে আসা সমস্যা’ও। এ ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা অন্তত তিনটি স্তরে বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হতে পারে।
প্রথমত, ‘পরিবেশগত মূলধন’-এর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা। কেননা, বাংলাদেশে রয়েছে বিস্তৃত নদ-নদী, উর্বর ভূমি এবং অনন্য প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।
চীনের ‘দুই পর্বত’ ধারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—পরিবেশ রক্ষা মানে শুধু প্রকৃতি রক্ষা নয়, উৎপাদনশক্তিকেও রক্ষা করা।
‘আগে দূষণ, পরে পরিশোধন’—এই পুরনো পথ এড়িয়ে শুরু থেকেই প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশগত সুবিধাকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। সবুজ পর্যটন, পরিবেশবান্ধব কৃষি কিংবা স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক শিল্প এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ব্যবস্থাগত ব্যবস্থাপনা ও বহুপক্ষীয় স্বার্থের সমন্বয় করতে হবে। চীন আন্তঃপ্রাদেশিক নদী অববাহিকায় অনুভূমিক পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে নদীর উজান ও ভাটির অঞ্চলের উন্নয়নগত স্বার্থে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে। এতে পরিবেশ সংরক্ষণকারীরা যাতে উপকৃত হন, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশের জন্য এই অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে গঙ্গার মতো আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থকে একসঙ্গে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিজ্ঞতা চিন্তার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। চীনের ‘আবর্জনামুক্ত শহর’ নির্মাণ এবং গ্রামীণ পরিবেশ উন্নয়নের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য চাহিদার সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তৃতীয়ত, জনগণের কল্যাণকে ভিত্তি করে পরিবেশগত জনকল্যাণ নিশ্চিত করা জরুরি।
চীনের চেচিয়াং প্রদেশের ইউ গ্রাম এখানে যুৎসই উদাহরণ হতে পারে। একসময় এই গ্রামে পাহাড় থেকে পাথর উত্তোলন ছিল আয়ের উৎস, সেখানে এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই অর্থনৈতিক সম্পদ। পাথর না বিক্রি করে সেখানে এখন ‘বিক্রি’ হচ্ছে দৃশ্যপট।
চীনে সুন্দর পরিবেশকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বিশেষায়িত শিল্পও দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সবুজ পাহাড়-নদী শুধু সংরক্ষণের বিষয় নয়; এগুলো মানুষের জীবিকা ও কল্যাণের উৎসও হতে পারে।
এই পরিবেশগত সমৃদ্ধির পথ দারিদ্র্য বিমোচন ও জনকল্যাণ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের জন্যও আকর্ষণীয় হতে পারে।
কুয়াশা ও ধোঁয়ায় ঢাকা বেইজিংকে ধীরে ধীরে নীল আকাশের শহরে পরিণত হতে দেখা মানুষ হিসেবে আমি জানি এই পরিবর্তন কতটা কঠিন ছিল। এটি একদিনে ঘটেনি। এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য কারখানার সংস্কার, বিপুলসংখ্যক আইন ও বিধির বাস্তবায়ন এবং কোটি কোটি মানুষের পরিবেশ সম্পর্কে চিন্তাভাবনার পরিবর্তন।
যেহেতু এই পরিবর্তন কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত, তাই এর অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মূল্যও অনেক বেশি।
বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য চীনের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—দূরদর্শিতা, দৃঢ়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকলে একটি দেশ একই সঙ্গে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে এগিয়ে নিতে পারে। মানুষ ও প্রকৃতির সুরেলা সহাবস্থান নিশ্চিত করে আধুনিকায়নের একটি নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব।
চীন গত ২১ বছর এই পথে হাঁটছে। সামনে আরও দীর্ঘ পথ বাকি। সেই পথচলার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা চীন তার সহযাত্রী দেশগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা, বেইজিং।
বিভাগ : জাতীয়
মন্তব্য করুন
এই বিভাগের আরও
আরও পড়ুন
ভিন্ন জাতে বিয়ে: ভারতে দলিত পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিল কনেপক্ষ
বড়লেখায় মুন্নী হত্যা মামলায় প্রধান আসামি ছামেলী গ্রেপ্তার
মুন্সীগঞ্জে বাস-প্রাইভেটকার সংঘর্ষ, নিহত ৪
ইউআইইউ গড়ল বংলাদেশের নতুন ড্রোন ইতিহাস: বিশ্বে ৪র্থ
বগুড়ায় গ্যাস ফিলিং স্টেশনে বিষ্ফোরণে আহত পাঁচ
বিশ্বজয়ী হাফেজদের বিতর্কিত বই প্রদান ও সংবিধান বিষয়ে আইনমন্ত্রীর মন্তব্যের নিন্দা হেফাজতে ইসলামের
চুয়াডাঙ্গার ভারত সীমান্ত থেকে ৮১ লাখ ৭০ হাজার ৬৫০ টাকার অবৈধ মালামাল উদ্ধার করেছে বিজিবি
নোয়াখালীতে ৭৫ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ করলেন ফখরুল ইসলাম এমপি
কুষ্টিয়ায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার তরুণীর মৃত্যু, সাবেক স্বামী আটক
সাগর গিলছে বরগুনার উপকূল, ঝুঁকিতে জনপদ
২০২৯ সালের জুনে শেষ হবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ৬ লেনের নির্মাণ: সড়ক পরিবহন মন্ত্রী
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু
ধামরাইয়ে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসা সেবা পেলেন ৫ শতাধিক দরিদ্র মানুষ
৪৬ বছর ধরে সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথচলা
বাংলাদেশের দুর্গম চরাঞ্চলে ৮ লাখের বেশি রোগীকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল
ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ইইউর আহ্বান
কোন এলাকায় কত শতাংশ বাড়ি ভাড়া পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা
প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্য ভবন নির্মাণে নয়, শিক্ষার্থীর শেখায় : ববি হাজ্জাজ
পঞ্চগড়ে যুবদলের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান
বুড়িগঙ্গা রক্ষায় চালু হলো বর্জ্যের বিনিময়ে ভাসমান বাজার