বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অবস্থান, গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তন কতটুকু?

Daily Inqilab ইনকিলাব ডেস্ক

০৮ মার্চ ২০২৫, ০৩:২৭ পিএম | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৫, ০৩:৩৪ পিএম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি আলোচনার বিষয়। বিশেষত সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রসঙ্গ আরও গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও দেশে নারীদের অংশগ্রহণ আন্দোলন ও সংগ্রামে দৃশ্যমান, তবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং কার্যকর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নারীরা এখনও পিছিয়ে আছেন। এই প্রতিবেদনটিতে আমরা নারীর রাজনৈতিক অবস্থান, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তবতা, এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করব।

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নারীদের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। ১৯৮০-এর দশক থেকে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে নারী ছিলেন এবং এখনও আছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি হন, এবং খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়্যারম্যান পদে আসেন। তারা দুজনই তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের শাসন ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রেখে এসেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও রাজনৈতিক দলের ভেতরে নারীর অবস্থান সুসংহত হয়নি। ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকলেও, কোনো দলই তা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য পূরণের নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা রাজপথে দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করেছেন। কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী এবং গৃহিণী সবাই নিজেদের দাবির জন্য আন্দোলনে অংশ নেন। বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের এই অংশগ্রহণ শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিকেই জোরালো করেনি, বরং সাধারণ জনগণকে আরও সচেতন করেছে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর দেখা যাচ্ছে, রাজনীতিতে নারীদের উপস্থিতি কমছে, বিশেষত নতুন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোতেও নারীদের সংখ্যা আশানুরূপ নয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নারীরা কি শুধুমাত্র আন্দোলনের সময়ই গুরুত্ব পান, নাকি রাজনীতির মূল স্রোতে তাদের উপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার চেষ্টা করা উচিত?

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব থাকলেও, তা অনেকাংশে প্রতীকী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবারতন্ত্র এবং অর্থের প্রভাবের কারণে অনেক নারী শুধু নামমাত্র পদে আছেন, কিন্তু বাস্তবে তারা দলের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান স্বীকার করেছেন, তৃণমূল থেকে নারীদের নেতৃত্বে আনার প্রচেষ্টা থাকলেও, স্থানীয় পর্যায়ে তা ব্যাহত হয় এবং পরিবারের সদস্যদেরই পদ দেওয়া হয়।

 

নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনহীনতা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নারীদের ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা সামনে এসেছে। ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর বাধা, সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং নারীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। একদিকে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে কোটার বাধ্যবাধকতা কমানো হচ্ছে, অন্যদিকে সরাসরি নির্বাচনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রাখার পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের ভেতরে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে, তাহলে ভোটের মাধ্যমে তাদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ কতটুকু?

 

রাজনীতিতে নারীদের জন্য কোটা থাকা উচিত নাকি যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের জায়গা পাওয়া উচিত—এ নিয়ে বিতর্ক আছে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কোটা ব্যবস্থা নারীদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, কারণ এটি অনেক ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে, অনেকে মনে করেন, সমাজে নারীদের দীর্ঘদিনের অবহেলিত অবস্থান পরিবর্তন করতে কোটা একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। আইনজীবী ফওজিয়া করিম ফিরোজ মনে করেন, নারীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে রাজনীতিতে জায়গা পাওয়া উচিত, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কোটার মাধ্যমেই তাদের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন।

 

রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কাগজে-কলমে নারীদের উপস্থিতি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, বাস্তবেও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় বসাতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা থাকলে এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলে নারীরা আরও বেশি করে রাজনীতির মূলধারায় আসতে পারবেন।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে অনেক আশার আলো দেখা গেলেও, বাস্তব চিত্র এখনও প্রতিকূল। আন্দোলনে নারীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি তাদের ক্ষমতায়নকে বোঝায়, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে এই ক্ষমতা কতটুকু স্থায়ী তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। নারীদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, এবং সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। গণঅভ্যুত্থানের পরও নারীর অবস্থান কতটা পরিবর্তন হয়েছে, তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা


বিভাগ : রাজনীতি


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

ড. ইউনূস ৪ বছর ক্ষমতায় থাকলে দেশ মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরের মতো হবে: ব্যারিস্টার ফুয়াদ
প্রয়োজনে অন্য দলের সঙ্গে জোট হতে পারে : আখতার
আ.লীগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গচ্ছিত টাকাও লুটপাট করে খেয়েছে
পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু হয়েছে খালেদা জিয়ার
বেগম খালেদা জিয়া যে হাতটা উড়াইবো এই হাতের পক্ষে ৮০ পার্সেন্ট সিট পাবে- এডভোকেট ফজলুর রহমান
আরও
X

আরও পড়ুন

মানিকগঞ্জে রাস্তার পাশে রক্তাক্ত কার্টুন ঘিরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি, ঘটনাস্থলে শত শত লোকের ভিড়

মানিকগঞ্জে রাস্তার পাশে রক্তাক্ত কার্টুন ঘিরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি, ঘটনাস্থলে শত শত লোকের ভিড়

থাইল্যান্ডে মোদীকে ড. ইউনূস একটি পুরনো ছবি উপহার দিলেন

থাইল্যান্ডে মোদীকে ড. ইউনূস একটি পুরনো ছবি উপহার দিলেন

প্রতিটি লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে পাড়ে ভিড়ছে

প্রতিটি লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে পাড়ে ভিড়ছে

নেত্রকোণায় চাঞ্চল্যকর মাজেদা হত্যাকাণ্ডঃ ২ যুবক গ্রেফতারঃ মোবাইল-টাকা উদ্ধার

নেত্রকোণায় চাঞ্চল্যকর মাজেদা হত্যাকাণ্ডঃ ২ যুবক গ্রেফতারঃ মোবাইল-টাকা উদ্ধার

শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

যুক্তরাষ্ট্রের যানবাহনের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ কানাডার

যুক্তরাষ্ট্রের যানবাহনের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ কানাডার

আল্লামা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী হুজুরের ইন্তেকাল, রাত ১০টায় জানাযা

আল্লামা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী হুজুরের ইন্তেকাল, রাত ১০টায় জানাযা

ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ব্যবস্থায় জনমানবহীন পেঙ্গুইন-পাখির দ্বীপও অন্তর্ভুক্ত

ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ব্যবস্থায় জনমানবহীন পেঙ্গুইন-পাখির দ্বীপও অন্তর্ভুক্ত

শেরপুরে লেবু চাষে ভাগ্য খুলেছে জুলহাস উদ্দিনের

শেরপুরে লেবু চাষে ভাগ্য খুলেছে জুলহাস উদ্দিনের

বিলুপ্তির পথে শেরপুরের তেঁতুল গাছ, মুখরোচক আচারের প্রধান উপকরণ তেঁতুল!

বিলুপ্তির পথে শেরপুরের তেঁতুল গাছ, মুখরোচক আচারের প্রধান উপকরণ তেঁতুল!

মাদারীপুরে কৃষকের হাত কেটে নিল সন্ত্রাসীরা

মাদারীপুরে কৃষকের হাত কেটে নিল সন্ত্রাসীরা

মিয়ানমারে ভূমিকম্পের পরপরই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জান্তা প্রধানের সফর

মিয়ানমারে ভূমিকম্পের পরপরই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জান্তা প্রধানের সফর

মাদারীপুরে ভোররাতে আগুনে পুড়লো ১৯ দোকান, ক্ষতি কয়েক কোটি টাকা

মাদারীপুরে ভোররাতে আগুনে পুড়লো ১৯ দোকান, ক্ষতি কয়েক কোটি টাকা

চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার উদ্ভাবন, চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার উদ্ভাবন, চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

কিভাবে বাংলাদেশকে বদলে দিলেন ড. ইউনূস? তার সাফল্য কি!

কিভাবে বাংলাদেশকে বদলে দিলেন ড. ইউনূস? তার সাফল্য কি!

বকশীগঞ্জে ৬ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে ছাই

বকশীগঞ্জে ৬ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে ছাই

কুয়াকাটা সৈকত দখল করে নির্মাণ হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট, পাশেই থাকে হাজারো পর্যটকের অবস্থান

কুয়াকাটা সৈকত দখল করে নির্মাণ হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট, পাশেই থাকে হাজারো পর্যটকের অবস্থান

ফোর্বসের ধনী তালিকায় রেকর্ডসংখ্যক সউদী বিলিয়নিয়ার

ফোর্বসের ধনী তালিকায় রেকর্ডসংখ্যক সউদী বিলিয়নিয়ার

ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ময়মনসিংহের ইয়াসিন

ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ময়মনসিংহের ইয়াসিন

গাজায় ইসরায়েলি অপরাধের তদন্তের দাবি ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্টের

গাজায় ইসরায়েলি অপরাধের তদন্তের দাবি ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্টের