আয়বৈষম্য নিরসনে অগ্রাধিকার দিতে হবে

Daily Inqilab ড. মইনুল ইসলাম

০৩ জুন ২০২৩, ০৮:০৩ পিএম | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৩, ০১:০২ এএম

গত ১৩ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের প্রাথমিক ফলাফল পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ঐ জরিপে বাংলাদেশের জনগণের আয়বৈষম্য পরিমাপক জিনি সহগের মান নির্ধারিত হয়েছে শূন্য দশমিক ৪৯৯। অতএব, এখন নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাংলাদেশ একটি উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার ৫২ বছর পেরিয়ে এসে সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণকারী একটি দেশ উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে পরিণত হওয়ার মানে হলো, দেশটি হাইজ্যাক হয়ে শ্রমজীবী জনগণের মালিকানার দেশ থেকে সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের করায়ত্ত ‘শোষকের দেশে’ পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ‘মুক্তির সংগ্রামের’ মাধ্যমে জন্ম নেয়া বাংলাদেশে মুখ থুবড়ে পড়েছে শ্রমজীবী জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির অঙ্গীকার। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। ২০২০-২২ পর্বে করোনা ভাইরাস মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার কমে গেলেও তা ৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আবার ৬ শতাংশ অতিক্রম করবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। অতএব, এটা অনস্বীকার্য, বাংলাদেশের অর্থনীতি অনুন্নয়ন ও পরনির্ভরতার ফাঁদ থেকে মুক্ত হয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে যাত্রা করেছে।

কিন্তু, মাথাপিছু জিডিপি যেহেতু একটি গড় সূচক তাই মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে যদি দেশে আয়বণ্টনে বৈষম্যও বাড়তে থাকে তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠির কাছে পুঞ্জীভূত হওয়ার প্রবণতা শক্তিশালী হতে থাকে, যার ফলে নি¤œবিত্ত ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ প্রবৃদ্ধির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। অতএব, আয়বৈষম্য বাড়তে থাকার প্রবণতা দেশের জন্য মহাবিপদ সংকেত বলতে হবে। প্রবৃদ্ধির সুখবরের পাশাপাশি এই একটি মহাবিপদ এদেশের ১৯৭৫ পরবর্তী শাসকমহল তাদের ভ্রান্ত অর্থনৈতিক দর্শন ও উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে ডেকে এনেছে। দুঃখজনকভাবে আশির দশক থেকেই এদেশে আয় ও সম্পদ বৈষম্য ক্রমশ বাড়তে বাড়তে এখন বাংলাদেশ একটি ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হয়ে গেছে।

অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য বৃদ্ধি বা হ্রাস পরিমাপ করার জন্য নানা পরিমাপক ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে লরেঞ্জ কার্ভ এবং জিনি সহগ অন্যতম। কোন অর্থনীতির জিনি সহগ যখন দ্রুত বাড়তে থাকে এবং শূন্য দশমিক ৫-এর কাছাকাছি পৌঁছে যায় বা শূন্য দশমিক ৫ অতিক্রম করে তখন বুঝতে হবে যে, আয়বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত হাউজহোল্ড ইনকাম এন্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে মোতাবেক, বাংলাদেশের জিনি সহগ নির্ধারিত হয়েছিল শূন্য দশমিক ৪৮৩, যা ১৯৭৩ সালে ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬। ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে জিনি সহগ নির্ধারিত হয়েছে শূন্য দশমিক ৪৯৯ (মানে শূন্য দশমিক ৫-এর একদম কাছাকাছি)।

আরেকটি পরিমাপকের গতি-প্রকৃতির মাধ্যমে ২০১০ ও ২০১৬ সালের মধ্যে আয়বৈষম্য বিপজ্জনকভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠির বিপক্ষে এবং ৫ থেকে ১০ শতাংশ ধনাঢ্য গোষ্ঠিগুলোর পক্ষে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি ফুটে উঠেছে : ২০১০ সালে দরিদ্রতম ৫ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপি’র শূণ্য দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে মাত্র শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে গেছে। ২০১০ সালে দরিদ্রতম ১০ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপি’র ২ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা মাত্র ১ দশমিক শূণ্য ১ শতাংশে নেমে গেছে। সমস্যার আরেক পিঠে দেখা যাচ্ছে, দেশের ধনাঢ্য ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠির দখলে ২০১০ সালে ছিল মোট জিডিপি’র ৩৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছে গেছে। আরো দুঃখজনক হলো, জনগণের সবচেয়ে ধনাঢ্য ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠির দখলে ২০১৬ সালে চলে গেছে মোট জিডিপি’র ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। (২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তুলনীয় পরিসংখ্যানগুলো এখনো প্রকাশিত হয়নি)।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্সে’র প্রতিবেদন ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮ মোতাবেক ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ এই পাঁচ বছরে অতি ধনী বা ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির দিক দিয়ে বিশে^র বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলে সারাবিশে^ এক নম্বর স্থানটি দখল করেছে বাংলাদেশ। ঐ পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ধনকুবের ছিল ২৫৫ জন।। ঐ গবেষণা প্রতিবেদনে ত্রিশ মিলিয়ন বা তিন কোটি ডলারের (৩২৫ কোটি টাকা) বেশি নীট-সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিদেরকে ‘আল্ট্রা-হাই নেট-ওয়ার্থ’ (ইউ এইচ এন ডব্লিউ’) ইন্ডিভিজুয়াল হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। অতএব, শেখ হাসিনার বর্তমান মন্ত্রিসভায় ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের সংখ্যাধিক্য কিংবা সংসদ সদস্যদের ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবসায়ী হওয়াকে কাকতালীয় বলা যাবে না।

বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে সমাজতন্ত্রকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলেও ১৯৭৫ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মার্কিনপন্থী খোন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের সরকার পাকিস্তানী স্টাইলে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ (ক্রোনি ক্যাপিটালিজম) প্রতিষ্ঠাকে এই রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ফিরিয়ে এনেছিল। আশির দশকে বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের ‘কাঠামোগত বিন্যাস কর্মসূচী’ ‘নিউ লিবারেল’ নীতিমালা সংস্কারের ধারাবাহিকতাকে জোরদার করার জন্যই পরিচালিত হয়েছিল। আমদানি উদারীকরণ, বিরাষ্ট্রীয়করণ, ব্যক্তিখাতে সরকারী নিয়ন্ত্রণ হ্রাস ও অর্থনীতিতে সরকারি ভূমিকার সংকোচন তাদের প্রেসক্রিপশনগুলোর মূল ফোকাস ছিল। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সরকার পালাক্রমে এদেশে গত ৩২ বছরের মধ্যে ৩০ বছর সরকারে আসীন থাকলেও দেশে আয়বৈষম্য বৃদ্ধিতেই তারা ভূমিকা পালন করেছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ২০১০ সালের ঐতিহাসিক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে গৃহীত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সংবিধানে সমাজতন্ত্র ফেরত এসেছে। কিন্তু, নামকাওয়াস্তে সমাজতন্ত্রকে সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হলেও বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে কিছুই করছে না। এর দুটো কারণ আন্দাজ করা যায়: প্রথমত, আওয়ামী লীগ নব্বই দশকের শুরুতেই সমাজতন্ত্রের স্থলে ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠাকে তাদের রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয়ত, সমাজতন্ত্র এখন আর রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় নয়।

সাধারণ জনগণের কাছে বোধগম্য যেসব বিষয় আয়বৈষম্য বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছানোর জানান দিচ্ছে সেগুলো হলো: ১) দেশে প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে ১১ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেখানে মাতাপিতার বিত্তের নিক্তিতে সন্তানের স্কুলের এবং শিক্ষার মানে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে; ২) দেশে চার ধরনের মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে; ৩) দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুরোপুরি বাজারীকরণ হয়ে গেছে; ৪) ব্যাংকের ঋণ সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশের কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে ্এবং ঋণখেলাপি বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে; ৫) দেশের জায়গা-জমি, এপার্টমেন্ট, প্লট, ফ্ল্যাট, মানে রিয়াল এস্টেটের দাম প্রচন্ডভাবে বেড়েছে; ৬) বিদেশে পুঁজি পাচার মারাত্মক ভাবে বাড়ছে; ৭) ঢাকা নগরীতে জনসংখ্যা দুই কোটিতে পৌঁছে গেছে, যেখানে আবার ৪০ শতাংশ বা ৮০ লাখ মানুষ বস্তিবাসী; ৮) দেশে গাড়ি, বিশেষত বিলাসবহুল গাড়ী আমদানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে; ৯) বিদেশে বাড়িঘর, ব্যবসাপাতি কেনার হিড়িক পড়েছে; ১০) ধনাঢ্য পরিবারগুলোর বিদেশ ভ্রমণ বাড়ছে; ১১) উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রবাহ বাড়ছে; ১২) উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য ঘনঘন বিদেশে যাওয়ার খাসলত বাড়ছে; ১৩) প্রাইভেট হাসপাতাল ও বিলাসবহুল ক্লিনিক দ্রুত বাড়ছে; ১৪) প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়েছে; ১৫) দেশে ইংলিশ মিডিয়াম কিন্ডারগার্টেন, ক্যাডেট স্কুল, পাবলিক স্কুল এবং ও লেভেল/এ লেভেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার মোচ্ছব চলছে। আবার অন্যদিকে দরিদ্র জনগণের সন্তানদের জন্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার হিড়িক চলছে; ১৬) প্রধানত প্রাইভেট কারের কারণে সৃষ্ট ঢাকা ও চট্টগ্রামের ট্রাফিক জ্যাম নাগরিক জীবনকে বিপর্যস্ত করছে; এবং ১৭) দেশে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি বেড়ে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে পদে পদে। দুর্নীতিলব্ধ অর্থের সিংহভাগ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

২০২০-২২ পর্বের করোনা ভাইরাস মহামারি এবং ২০২২-২৩ পর্বের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সারাবিশে^ মারাত্মক মূল্যস্ফীতি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের জীবনকেও বিপর্যস্ত করে চলেছে। ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে যেখানে বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার নিচের জনসংখ্যার হার ২৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছিল। ২০২২ সালের আয়-ব্যয় জরিপে তা আরো কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই ক্রমহ্রাসমান দারিদ্র্যের হার প্রশংসনীয় হলেও ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য ‘অশনি সংকেত’ দিয়ে চলেছে। আয়বৈষম্য না বাড়লে হয়তো দারিদ্র্য হ্রাসের গতি আরো তরান্বিত হতো। কিন্তু, বর্তমান সরকার শুধু মাথাপিছু জিডিপি নিয়েই মাতামাতি করছে।

আয়বৈষম্য বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ফসল যে সমাজের উচ্চবিত্ত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্তদের দখলে চলে যায় সেটা জনগণের কাছ থেকে লুকোতে চাইছে তারা। সাধারণ শ্রমজীবী জনগণ এহেন প্রবৃদ্ধি থেকে তেমন সুফল পায় না। সরকার যেহেতু ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’র পথ অনুসরণ করে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’কে সোৎসাহে চালু রেখেছে তাতে আয়বৈষম্য নিরসনের কোন তাগিদ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে পরিদৃষ্ট না হওয়াই স্বাভাবিক। আয়বৈষম্যের ব্যাপারে বাংলাদেশের সরকারের এই দুঃখজনক অমনোযোগ অগ্রহণযোগ্য। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আয়বৈষম্য বেড়ে দেশটি একটি ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হয়েছে তা আমরা কিছুতেই মেনে নেবো না।

ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য সমস্যা মোকাবেলা করা দুরূহ, কিন্তু অসম্ভব নয়। রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছা এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন। কারণ আয় ও সম্পদ পুনর্বন্টন খুবই কঠিন রাজনৈতিক নীতি-পরিবর্তন ছাড়া অর্জন করা যায় না। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, গণচীন, ভিয়েতনাম, কিউবা, ইসরাইল এবং মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্র নানারকম কার্যকর আয় পুনর্বণ্টন কার্যক্রম গ্রহণ ও সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জিনি সহগ বৃদ্ধিকে শ্লথ করতে বা থামিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক বিশে^ জিনি সহগ কমানোর ব্যাপারে কিউবা ছাড়া অন্য কোন দেশকে তেমন সাফল্য অর্জন করতে দেখা যাচ্ছে না।

এই দেশগুলোর মধ্যে কিউবা, গণচীন ও ভিয়েতনাম এখনো নিজেদের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে দাবি করে। বাকি দেশগুলো পুঁজিবাদী অর্থনীতির অনুসারী হয়েও শক্তিশালী বৈষম্য-নিরসন নীতিমালা গ্রহণ করে চলেছে। উপরের বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশে সফল ভূমি সংস্কার এবং অথবা/ কৃষি সংস্কার নীতিমালা বাস্তবায়িত হয়েছে। বৈষম্য-সচেতন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যে কয়েকটি বিষয়ে মিল দেখা যাচ্ছে সেগুলো হলো:

১) রাষ্ট্রগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল লেভেলের শিক্ষায় একক মানসম্পন্ন, সর্বজনীন, আধুনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার ব্যাপারে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছে।
২) রাষ্ট্রগুলোতে অত্যন্ত সফলভাবে জনগণের সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু রয়েছে।
৩) রাষ্ট্রগুলোতে প্রবীণদের পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

৪) রাষ্ট্রগুলোতে সর্বজনীন বেকার ভাতা চালু রয়েছে।
৫) এসব দেশে নি¤œবিত্ত জনগণের জন্যে ভর্তুকি মূল্যে রেশন বা বিনামূল্যে খাদ্য-নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে।
৬) প্রবীণ জনগণের আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্যে অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা উন্নত-উন্নয়নশীল নির্বিশেষে এসব দেশে চালু রয়েছে।
৭) এসব দেশে গণপরিবহন সুলভ ও ব্যয়সাশ্রয়ী, এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয় ।

৮) এসব দেশে রাষ্ট্র ‘জিরো টলারেন্স অগ্রাধিকার’ দিয়ে দুর্নীতি দমনে কঠোর শাস্তিবিধানের ব্যবস্থা চালু করেছে।
৯) এসব দেশ ‘মেগা-সিটি’ উন্নয়নকে সফলভাবে নিরুৎসাহিত করে চলেছে এবং গ্রাম-শহরের বৈষম্য নিরসন ও আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে খুবই মনোযোগী।
১০) দেশগুলোতে ‘ন্যূনতম মজুরীর হার’ নির্ধারণ করে কঠোরভাবে প্রতিপালনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
১১) নি¤œবিত্তদের আবাসনকে সব দেশেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
১২) এসব দেশে কৃষকরা যাতে তাঁদের উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্য দাম পায় তার জন্যে কার্যকর সরকারী নীতি বাস্তবায়িত হয়েছে।
১৩) ব্যক্তিখাতের বিক্রেতারা যেন জনগণকে মুনাফাবাজির শিকার করতে না পারে সেজন্যে এসব দেশে রাষ্ট্র কঠোর নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে।

উপরে উল্লিখিত সবগুলো বিষয়ই বাংলাদেশে অগ্রাধিকারের দাবিদার। বৈষম্য নিরসনের জন্যে করণীয়: প্রথমত, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে অবশ্যই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখতে হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও জালিয়াতি-মুক্ত নির্বাচনে জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধিরা যাতে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সকল নির্বাচনে নির্বাচিত হতে পারেন সে ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই হবে। জনগণের কাছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সার্বক্ষণিক জবাবদিহি যাতে নিশ্চিত করা যায় তার জন্য ‘রিকল’ ব্যবস্থাকেও প্রাতিষ্ঠানিকতা দিতে হবে। পরবর্তী কর্তব্য হলো, ‘বাজার ব্যর্থতা’ কেন হয় তা ভালভাবে বুঝে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে।

বাজার ব্যর্থ হয় গরীবের মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, ব্যর্থ হয় পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে, ব্যর্থ হয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তোলায়, ব্যর্থ হয় নানারকম মনোপলী ও অলিগোপলীর কারণে, ব্যর্থ হয় গণদ্রব্য বা ‘পাবলিক গুড’ যোগান দিতে। মূল কথা হলো, রাষ্ট্রকে বৈষম্য নিরসনকারীর ভূমিকা নিতেই হবে, যে রকম করা হয়েছে ভিয়েতনামে, গণচীনে কিংবা কিউবায়। তৃতীয়ত, সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে প্রধানত সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের আয়কর ও সম্পত্তি কর থেকে। সরকারী ব্যয়ের প্রধান অগ্রাধিকার দিতে হবে বৈষম্যহীন ও মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষায়, গরিবের জন্য ভালমানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলায়, মানসম্পন্ন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে, গরীবের খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে। চতুর্থত, যেখানে সুযোগ থাকে সেখানেই কৃষক সমবায় সমিতি গড়ে তুলে কৃষককে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যদাম পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে এবং শ্রমজীবী জনগণকে ন্যায্য মজুরী পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে রাষ্ট্র কঠোর অভিভাবকের ভূমিকা নেবে। যেখানে সম্ভব সেখানে গণচীন ও ভিয়েতনামের মত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা শ্রমিক সমবায় সমিতিগুলোর হাতে প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। গণচীনের ঞড়হিংযরঢ় ধহফ ঠরষষধমব ঊহঃবৎঢ়ৎরংব (ঞঠঊ) মডেল এক্ষেত্রে অনুকরণীয় হতে পারে। পঞ্চমত, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন, ইত্যাদি পাবলিক ইউটিলিটিজ সরবরাহ ক্রমশ ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দিয়ে সরবরাহ প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে জনগণকে মুনাফাবাজির শিকার করতে না পারে সেজন্যে সরকারকে কঠোর দাম-নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যান্য ব্যক্তিখাতের বিক্রেতারাও যাতে জনগণকে মুনাফাবাজির শিকার করতে না পারে সেজন্য রাষ্ট্রকে কঠোর নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে হবে।

আমি বিশ্বাস করি, ২০১১ সালে সংবিধানে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে পুনর্বহাল হলেও একুশ শতকের বাস্তবতায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ‘রাষ্ট্রতন্ত্র’ (স্টেটিজম) এবং একদলীয় পুলিশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে মডেলগুলো বিংশ শতাব্দীর আশির ও নব্বইয়ের দশকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেছে সেগুলোকে আর ফেরত আনা যাবেনা। বিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবের ঘটনাগুলো থেকে যে বিষয়টা সামনে চলে এসেছে তাহলো, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি খাত ও বাজারকে প্রতিপক্ষ অবস্থানে ঠেলে দেওয়া যৌক্তিক নয়। বাজার এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা হওয়া উচিত পরিপূরকের। কিছু কাজ বাজার ও ব্যক্তিখাত ভালো করবে, আর কিছু কাজ রাষ্ট্র ভালো করবে। কতগুলো বিষয়ে বাজার ব্যর্থ হবে, আবার ব্যক্তি খাতের অক্ষমতা ও বাজার ব্যর্থতা (মার্কেট ফেইল্যুর) থেকে মুক্তির আশায় রাষ্ট্রের হাতে ঐ বিষয়গুলো অর্পণ করা হলে রাষ্ট্রব্যর্থতা (স্টেট ফেইল্যুর) ও দুর্নীতি এড়ানো কঠিন হবে। রাষ্ট্র ও বাজারের পরিপূরক ভূমিকাকে মেনে নিয়ে এই দুটো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণের সঠিক ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

বাজার ও রাষ্ট্রের যৌক্তিক ভূমিকা নির্ধারণের যে নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট গণচীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইসরাইল, নিকারাগুয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, বলিভিয়া, এল সালভাদর, ইকুয়েডর ও কিউবায় প্রযুক্ত হয়ে চলেছে তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মানে, জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তামূলক ও বৈষম্য-নিরোধক কার্যক্রম, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণÑ এ ধরনের গণমুখী খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অপরদিকে, প্রগতিশীল আয়কর ও সম্পত্তি করের মাধ্যমে সরকারী রাজস্বের সিংহভাগ আহরণ করে ঐ পুনর্বন্টনমূলক সরকারি ব্যয়ের অর্থায়ন করতে হবে। ফলে, শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং বিকাশমান ব্যক্তিখাত ও সুশাসিত বাজারের (মড়াবৎহবফ সধৎশবঃ) সমন্বয়ে ক্রমেই উন্নয়নের সফল মডেল হয়ে উঠবে দেশ।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, রাষ্ট্র যদি প্রতিরক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সিভিল প্রশাসনের মত অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারি ব্যয় ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সমর্থ হয় তাহলে যে ব্যয় সাশ্রয় হবে তা দিয়ে উপরে উল্লিখিত সামাজিকভাবে কাম্য কার্যক্রমগুলোতে রাষ্ট্র অর্থবহ সাফল্য অর্জন করতে সমর্থ হবে।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়।


বিভাগ : বিশেষ সংখ্যা

বিষয় : year


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

আরও পড়ুন

বেঙ্গালুরুতে রাতভর উদ্দাম পার্টি, মাদকের নেশায় উল্লাস বিধায়ক-নায়িকাদের!

বেঙ্গালুরুতে রাতভর উদ্দাম পার্টি, মাদকের নেশায় উল্লাস বিধায়ক-নায়িকাদের!

বাগেরহাটে আওয়ামী লীগ নেতাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড

বাগেরহাটে আওয়ামী লীগ নেতাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড

ভোটকেন্দ্রের মাঠে কুকুর, ৩ ঘণ্টায় ভোট পড়েছে মাত্র ১৯টি

ভোটকেন্দ্রের মাঠে কুকুর, ৩ ঘণ্টায় ভোট পড়েছে মাত্র ১৯টি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে চিঠি লিখেছেন পুতিন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে চিঠি লিখেছেন পুতিন

ইরানি জনগণের মাঝে রাইসি কেন জনপ্রিয় ছিলেন?

ইরানি জনগণের মাঝে রাইসি কেন জনপ্রিয় ছিলেন?

১১ সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর খুললো হাইতির বিমানবন্দর

১১ সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর খুললো হাইতির বিমানবন্দর

শিল্পীদের ভোটকে অসম্মান করবেন না, ডিপজলের উদ্দেশে রত্না

শিল্পীদের ভোটকে অসম্মান করবেন না, ডিপজলের উদ্দেশে রত্না

ঢাকায় পৌঁছেছেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ঢাকায় পৌঁছেছেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রাইসির মৃত্যুর পর এখন ইরানের ভবিষ্যৎ কী?

রাইসির মৃত্যুর পর এখন ইরানের ভবিষ্যৎ কী?

শত্রুরাই আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে: পরীমণি

শত্রুরাই আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে: পরীমণি

ভারতে সাজাভোগ শেষে দেশে ফিরলেন ৮ বাংলাদেশি নারী

ভারতে সাজাভোগ শেষে দেশে ফিরলেন ৮ বাংলাদেশি নারী

কান থেকে ফিরেই হাসপাতালে ঐশ্বরিয়া

কান থেকে ফিরেই হাসপাতালে ঐশ্বরিয়া

অপু বিশ্বাসের জিডি, তিনজনকে সতর্ক করলো পুলিশ

অপু বিশ্বাসের জিডি, তিনজনকে সতর্ক করলো পুলিশ

গণসংহতির বিক্ষোভ ঘিরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে নিরাপত্তা জোরদার

গণসংহতির বিক্ষোভ ঘিরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে নিরাপত্তা জোরদার

নাইজেরিয়ার মৃৎশিল্পে চিরায়ত ঐতিহ্য

নাইজেরিয়ার মৃৎশিল্পে চিরায়ত ঐতিহ্য

নাগরিকত্ব ফিরে পেয়ে প্রথমবার ভোট দিলেন অক্ষয়

নাগরিকত্ব ফিরে পেয়ে প্রথমবার ভোট দিলেন অক্ষয়

চাটখিলে দুই ঘণ্টায় এক বুথে পড়ল ১ ভোট

চাটখিলে দুই ঘণ্টায় এক বুথে পড়ল ১ ভোট

সকাল থেকেই ফাঁকা বাউফলের ভোটকেন্দ্র

সকাল থেকেই ফাঁকা বাউফলের ভোটকেন্দ্র

রাজশাহীর তিন উপজেলায় ভোটার উপস্থিতি কম

রাজশাহীর তিন উপজেলায় ভোটার উপস্থিতি কম

বোদায় দুই ঘন্টায় ভোট পড়েছে সাড়ে পাঁচ শতাংশ

বোদায় দুই ঘন্টায় ভোট পড়েছে সাড়ে পাঁচ শতাংশ