স্বৈরাচার হাসিনার উৎখাতে

দ্রোহের প্রতীক যারা

Daily Inqilab নূরুল ইসলাম

০১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০২ এএম | আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০২ এএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে স্বৈরাচারি হাসিনাকে উৎখাত করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে বহু তরুণ-তরুণী। স্বৈরাচারের নির্দেশে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বৈরাচারের দলীয় ক্যাডারদের নৃশংসতায় গা শিউরে ওঠার মতো বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

আবু সাঈদ

২০২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন সাঈদ। তিনি এই আন্দোলনের রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমন্বয়ক ছিলেন। ১৬ জুলাই আন্দোলন চলাকালে পুলিশ সদস্যের গুলিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কোটা আন্দোলনকারীরা তাকে আন্দোলনের প্রথম শহীদ বলে আখ্যায়িত করে।
১৬ জুলাই বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। ছাত্রদের সবাই সরে গেলেও আবু সাঈদ হাতে একটি লাঠি নিয়ে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান। এই অবস্থায় পুলিশ খুব কাছ থেকে তার ওপর ছররা গুলি ছোড়ে। তারপরও অবস্থান থেকে সরেননি আবু সাঈদ, দাঁড়িয়েই ছিলেন। একপর্যায়ে কয়েকটি গুলি খেয়ে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। অন্য শিক্ষার্থীরা তাকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মীর মুগ্ধ

ছাত্র-জনতার বিদ্রোহের সময় মুগ্ধর মৃত্যু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মৃত্যুগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত এই তরুণের মৃত্যু সামাজিক ও রাজনৈতিক বৃত্তে অনেক আলোচনার সৃষ্টি করে। মুগ্ধর মৃত্যুকে বিদ্রোহের একটি প্রতীকী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়েছিল, যা আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তার মৃত্যুর পরপরই, তার যমজ ভাই দ্বারা পোস্ট করা পানি এবং বিস্কুট বিতরণের ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় ঘাতকের বুলেট কেড়ে নেয় উদীয়মান তরুণ মুগ্ধর প্রাণ। বাংলাদেশ ইউভার্সির্টি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র ছিলেন মুগ্ধ। মৃত্যুর আগমুহূর্তেও তিনি আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি বিতরণ করছিলেন। সেই ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয় ইন্টারনেটে। মুগ্ধর কণ্ঠের ‘পানি লাগবে, পানি?’ এই বাক্য কানে বেজেছে দেশের কোটি মানুষের।

ফারহান ফাইয়াজ

‘একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। এমন জীবন গড়ো, যাতে মৃত্যুর পর মানুষ তোমাকে মনে রাখে।’ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ইন্ট্রোতে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ ইংরেজিতে এ কথা লিখেছিলেন। ফারহান কোটা সংস্কার আন্দোলনে রাজপথে নেমে আর ফেরেনি। রাজধানীর ধানমন্ডিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে ফারহান ফাইয়াজ নিহত হন।

ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকায় ১৮ জুলাই বিকেল সাড়ে ৩টার পর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছিল। সে সময় আহত হন ফারহান ফাইয়াজ। সেখান থেকে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে মোহাম্মদপুর সিটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। বুলেটে তার শরীর ঝাঁঝড়া হয়ে গিয়েছিল।

ইমাম হাসান

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রাজধানীর সবচেয়ে আলোচিত স্পট ছিল যাত্রাবাড়ীর কাজলা ও শনিরআখড়া। এখানকার আন্দোলনকারীদের বেশিরভাগই ছিল বয়সে কিশোর ও তরুণ। তাদেরই একজন ইমাম হাসান। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফুটওভার ব্রিজের কাছে মারা যান ইমাম হাসান।

সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলোÑ ইমাম হাসান পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে। সেই পরিচয় পাওয়ার পরও যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি (অপরেশন) জাকির হোসেন হাসান ইমামকে প্রথমে দৌড় দিতে বলে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করে। ১৯ বছর বয়সী ইমাম হাসানের মৃত্যুর পর তার মা বলেন, ‘পুলিশের ছেলে পুলিশেরই গুলিতে মরল, আমার স্বামী এই প্রতিদান পাইল? আমার ছেলেরে কতগুলা গুলি দিছে, ছেলে তো চোর-সন্ত্রাসী ছিল না। যে মারল, তার একটুও মায়া লাগে নাই? মারতে কয়টা গুলি লাগে?...আমি সঠিক বিচারটা চাই’। পুলিশের গুলিতে ইমাম হাসানের মৃত্যুর পর তার মায়ের বুকফাটা গগনবিদারী আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠছিল চারপাশ। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের এসআই মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে ইমাম হাসান।


বিভাগ : বিশেষ সংখ্যা


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

জাগ্রত ভয় মনের মাঝে
আর কেউ বেঁচে নেই
সময়
মার্চের পদাবলি
অপসৃয়মাণ রেলগাড়ি
আরও
X

আরও পড়ুন

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা

ট্রাম্পকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ডলার জরিমানা করলেন লন্ডনের হাইকোর্ট

ট্রাম্পকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ডলার জরিমানা করলেন লন্ডনের হাইকোর্ট

ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফেসবুক পোস্টে যা বললেন মোদি

ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফেসবুক পোস্টে যা বললেন মোদি

শেষ হচ্ছে ম্যান সিটিতে ডে ব্রইনে অধ্যায়

শেষ হচ্ছে ম্যান সিটিতে ডে ব্রইনে অধ্যায়

মাগুরায় মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে মানববন্ধন

মাগুরায় মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে মানববন্ধন

ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে থাইল্যান্ডকে আহ্বান ড. ইউনূসের

ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে থাইল্যান্ডকে আহ্বান ড. ইউনূসের

যারা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা আ.লীগের দোসর

যারা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা আ.লীগের দোসর

বিমসটেকের আগামী সম্মেলন নিয়ে যে প্রস্তাব দিলেন ড. ইউনূস

বিমসটেকের আগামী সম্মেলন নিয়ে যে প্রস্তাব দিলেন ড. ইউনূস

ইংল্যান্ড দলে আরেক ধাক্কা

ইংল্যান্ড দলে আরেক ধাক্কা

ট্রাম্পকে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসাবে চান না বেশিরভাগ আমেরিকান

ট্রাম্পকে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসাবে চান না বেশিরভাগ আমেরিকান

নাব্যতা হারিয়ে দখলদারদের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নদী

নাব্যতা হারিয়ে দখলদারদের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নদী

চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনতে শ্রীলঙ্কার সহায়তা চাইলো বাংলাদেশ

চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনতে শ্রীলঙ্কার সহায়তা চাইলো বাংলাদেশ

হাসিনাকে ফেরানো নিয়ে যা জানালো ভারত

হাসিনাকে ফেরানো নিয়ে যা জানালো ভারত

প্রথমে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরাতে রাজি মিয়ানমার

প্রথমে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরাতে রাজি মিয়ানমার