আঞ্চলিক সহযোগিতায় লাভবান হবে বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্ভাবনার দুয়ার আটকে রেখেছে ভারত

Daily Inqilab শফিউল আলম

০১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০২ এএম | আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০২ এএম

 

অযুত সোনালি সম্ভাবনাকে ধারণ করে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’-এর ঐতিহাসিক পথচলার ৩৯তম বছর অতিক্রম করেছে বিদায়ী ২০২৪ ইং সালে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক বাণিজ্য তাদের মোট বাণিজ্যের আকার-আয়তনের তুলনায় খুবই নগণ্য। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ হয় নিজেদের মধ্যে। এর মধ্যে সিংহভাগই পণ্যসামগ্রী আমদানি করা হয়ে থাকে ভারত থেকেই। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ভারতের অনুকূলে, বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিকূলে বিরাট অসম বাণিজ্য। পরিতাপের বিষয় হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, বিগত প্রায় চার দশকে সার্ক তার প্রভূত সম্ভাবনা বিশেষ করে বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্য আদৌ হাসিল করতে পারেনি। সার্কভূক্ত দেশগুলোর পরস্পর যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির যে আবশ্যকতা সেটি পরিপূরণ হয়নি।

সার্ককে ঘিরে হয়নি আঞ্চলিক সহযোগিতার দ্বার উদ্ঘাটন। এর ফলে স্বভাবতই অপার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা মুখ থুবড়ে পড়েছে। কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্যদিয়ে অপার ও প্রভূত বাণিজ্য সম্ভাবনার দুয়ার আটকে রেখেছে ভারত। ভারত আঞ্চলিক সহযোগিতায় কখনোই আগ্রহী নয়; বরং ভারত চায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চালিয়ে যেতে। এর মূলে রয়েছে ভারতের ‘দাদাগিরি’ তথা ‘বিগ ব্রাদারসুলভ’ মানসিকতা আচরণ। অথচ আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সার্ককে এগিয়ে নেয়া হয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশসহ সবক’টি দেশ বহুমুখী লাভবান হওয়ার স্বর্ণদুয়ার খুলে যেতো।

এ প্রসঙ্গে একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম ইনকিলাব প্রতিনিধিকে বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত হোক ভারত বাস্তবে সেটা চাইছে না। এটা তাদের আধিপত্যবাদী নীতি। ভারতের অনীহার কারণেই ‘সার্ক’ মৃতবৎ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রসঙ্গত প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘সার্ক’কে পুনরায় সচল করার প্রত্যয়ের কথা একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই লক্ষ্যে বলিষ্ঠ একটি উদ্যোগ গ্রহণ করলে সার্ক পুনরায় কার্যকর হয়ে উঠবেÑ এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অনেকেই।

নিকট প্রতিবেশী নেপাল ও ভুটান ভৌগোলিকভাবে বন্দর-সুবিধা বঞ্চিত এবং ভূমি বেষ্টিত (ল্যান্ড লক্ড) দুই দেশ। উভয় দেশের সাথে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের ব্যাপক সুযোগ রয়ে গেছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত উৎকৃষ্টমানের অনেকগুলো পণ্যসামগ্রী বাজার পেতে পারে নেপাল ও ভুটানে। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের আমদানি ও রফতানি পণ্য পরিবহনের জন্য ভারতের ছোট্ট ভূখ-, বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটানের মাঝামাঝি ভারতের শিলিগুড়ির (পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্তর্গত) কাছে মাত্র ২২ কি.মি. সড়কপথ করিডোর পাড়ি দিতে হয়। যা ভৌগোলিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ‘চিকেন নেক’ হিসেবে পরিচিত। সেই ২২ কি.মি. দূরত্বের ফুলবাড়ী-শিলিগুড়ি করিডোরের প্রস্থ ২১ থেকে স্থানভেদে ৪০ কি.মি.। কিন্তু সেই ‘চিকেন নেক’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারত সবসময়ই বাধাদান ও অসহযোগিতা করে আসছে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় বৃহত্তর বাংলা দুই ভাগ হলে শিলিগুড়ি ‘চিকেন নেক’ করিডোর সৃষ্টি হয়। এটি সহজে ব্যবহারের লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ-ভারত ফুলবাড়ী চুক্তি সম্পাদিত হয়। কিন্তু ভারতের অসহযোগিতা ও হরেক বাধা-বিপত্তি, হয়রানি, জটিলতার মারপ্যাঁচে এই করিডোর দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে আমদানিতে নেপাল প্রায় ৬০ শতাংশ ভারত-নির্ভর। ২০ ভাগ পণ্য আসে চীন থেকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সৃষ্টির সুযোগ ব্যাপক। কেননা নেপাল ভারত-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রস্তুত। বিশ^ায়নের দিকে ঝুঁকেছে নেপাল।

ভারতের সেই ছোট্ট ভূখ- ‘চিকেন নেক’ যদি অনায়াসে পণ্যসামগ্রী পরিবহনের জন্য খুলে দেয়া হয়, তাহলে নেপাল ও ভুটান চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের আমদানি ও রফতানি প্রসারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারতো। এর ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিনিময়ে বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানের অর্থনীতি সুমৃদ্ধ হয়ে উঠতো। বর্তমানে দীর্ঘ ঘুরপথে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল হয়ে নেপাল ও ভুটানে পণ্যসামগ্রী আমদানি করতে হয়। এর জন্য ব্যাপক ব্যয়ের বোঝা টানতে হচ্ছে নেপাল ও ভুটানকে।

নিকট প্রতিবেশী দুই দেশ নেপাল ও ভুটানের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যোগাযোগ, সহযোগিতামূলক আদান-প্রদান বৃদ্ধির জন্য ভারতের সহযোগিতা অপরিহার্য। তাহলেই চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর দিয়ে ৪শ’ থেকে ৫শ’ কিলোমিটার সড়কপথে সহজে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।

নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের অনেক উৎকৃষ্টমানের পণ্যসামগ্রীর বাজার চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ সিমেন্ট, স্টিল ও আয়রন, ঢেউটিনসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী, তৈরি পোশাক, ভোজ্যতেল, ওষুধ ও পেটেন্ট সামগ্রী, ভেষজ দ্রব্য, শাড়ি, ইলেক্ট্রনিক্স ও ইলেক্ট্রট্রিক পণ্যসামগ্রী, মেলামাইন ও সিরামিক্স পণ্যসামগ্রী, প্লাস্টিকজাত দ্রব্যাদি, আসবাবপত্র, ইমিটেশনের অলংকার-গহনা, তথ্য-প্রযুক্তি পণ্য, হালকা যন্ত্রপাতি, কেবল্স, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও বেকার্স খাদ্যদ্রব্য, খেলনা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সেবাজাত পণ্য রফতানির বিরাট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়ে গেছে।

অন্যদিকে নেপাল ও ভুটান থেকে স্বল্প মূল্যে বিভিন্ন ধরনের ডাল, খাদ্যদ্রব্য, তাজা ফল ও ফলের রস, মসলাজাত দ্রব্য ইত্যাদি আমদানির সুযোগ রয়েছে। নেপাল ও ভুটান চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্র বন্দর সুবিধা ব্যবহার করে উভয় দেশের বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী পুনঃরফতানি করতে পারে। এর ফলে প্রতিবেশী উভয় দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে। বন্দর ব্যবহার বাবদ বাংলাদেশের সার্ভিস চার্জ, ফি, ট্যারিফ, মাসুল ইত্যাদি আয় আসবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে ট্রানজিট সুবিধা ব্যবহারের জন্য নেপাল ও ভুটান অনেকবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ বন্দর পরিদর্শনও করেছেন। কিন্তু চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের মাধ্যমে আনীত পণ্য ভারতের ‘চিকেন নেক’ দিয়ে পরিবহনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা না পাওয়ায় নেপাল ও ভুটান পিছিয়ে আছে।

শুধ্ইু নেপাল ও ভুটান নয়; বাংলাদেশের সংলগ্ন ভারতের বিশাল এলাকায় বাংলাদেশে উৎপাদিত উৎকৃষ্টমানের অনেক ধরনের পণ্যসামগ্রীর ব্যাপক বাজার চাহিদা রয়েছে। অথচ ভারতের নানামুখী বাধা-বিপত্তি ও অসহযোগিতার কারণে বিশাল অঞ্চলে বাংলাদেশের পণ্যসামগ্রীর বাজার সম্ভাবনা আটকে আছে। ভারতের মূল অংশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রায় বিচ্ছিন্ন ভূমি বেষ্টিত (ল্যান্ড লক্ড) দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চল। যেটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড ও মনিপুর নিয়ে ‘দি সেভেন সিস্টার্স’ বা ‘সাত বোন-রাজ্য’ নামে পরিচিত।

বিশাল অঞ্চলটি ভূমিবেষ্টিত হলেও বাংলাদেশের সন্নিকটে। সেখানকার অর্থনীতি ভারতের মূল অংশের তুলনায় অনেক দুর্বল। জনগণের জীবনযাত্রার মান অনেক পেছনে রয়ে গেছে। এর সুবাদে ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চলে বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনা উজ্জ্বল এবং তা ব্যাপক। ভারতের উত্তর-পূর্বের জনগণ সুলভে হরেক বাংলাদেশি পণ্য কিনতে পারেন। এর ফলে শুধু বাংলাদেশের লাভ হবে না; বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের জনগণ কম দামে উৎকৃষ্টমানের পণ্যসামগ্রী কিনতে এবং জীবনমান উন্নত করতে সক্ষম হবে।

প্রায় আট কোটি জনগণের বিরাট বাজার ‘দি সেভেন সিস্টার্স’। বাংলাদেশের জন্য অপার বাণিজ্য সম্ভাবনায় ‘দি সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চল। তাছাড়া এর পাশর্^বর্তী রাজ্য সিকিম, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড ছাড়িয়ে এমনকি দক্ষিণে তামিলনাডু-উড়িষ্যাসহ ভারতের অনেক অঞ্চলে বাংলাদেশের পণ্যসামগ্রীর বড়সড় বাজার চাহিদা রয়েছে। ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রধান দুই সমুদ্র বন্দর (চট্টগ্রাম ও মোংলা) দিয়ে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর পুনঃরফতানির (রি-এক্সপোর্ট) সুযোগ রয়েছে।

‘সেভেন সিস্টার্স’ খ্যাত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের উৎপাদিত সিমেন্ট, স্টিল ও আয়রন, ঢেউটিন, তৈরি পোশাক, মাছ ও শুঁটকি, ভোজ্যতেল, ওষুধ ও পেটেন্ট সামগ্রী, ভেষজ দ্রব্য, শাড়ি, ইলেক্ট্রনিক্স ও ইলেক্ট্রট্রিক পণ্যসামগ্রী, সিরামিকস পণ্যসামগ্রী, প্লাস্টিকজাত দ্রব্যাদি, আসবাবপত্র, ইমিটেশনের অলংকার-গহনা, তথ্য-প্রযুক্তি পণ্য, হালকা যন্ত্রপাতি, কেবল্স, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও বেকার্স খাদ্যদ্রব্য, খেলনা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সেবাজাত পণ্যের ব্যাপক রফতানি বাজার চাহিদা রয়েছে।

এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাজার পুরোটা প্রায় দখলে নিচ্ছিল বাংলাদেশের রহিম আফরোজ কোম্পানির ব্যাটারি, আইপিএস ও অন্যান্য সামগ্রী। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্টিল ও আয়রন শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত এমএস রড, সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রী, ঢাকার এরোমেটিক সাবান, কেয়া কসমেটিক্স, তিব্বত-এর প্রসাধনী সামগ্রী, চট্টগ্রামের ১৯৪৭ গোল্লা সাবান এবং সবশেষে প্রাণ-আরএফএল কোম্পানির হরেক পণ্যসামগ্রী ভারতের ওই অঞ্চলের পুরো বাজার ধরার পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

তখনই শুরু হয় নয়াদিল্লির মাথাব্যাথা। সুকৌশলে থামানো হয় বাংলাদেশের উৎপাদিত উৎকৃষ্ট পণ্যসামগ্রীর ভারতে রফতানি বাজারের দুর্দমনীয় অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশের রফতানি থামাতে ভারতের ‘কৌশল’ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক (ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) বাধা-প্রতিবন্ধকতার পাহাড়। নয়াদিল্লির সরকারি নীতি-নির্ধারকরা জানেন, বাংলাদেশের গুণগত মানসম্পন্ন পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতে। কেননা ওই বিশাল অঞ্চলটি ভারতের মূল ভূখ- থেকে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন, দুর্গম, তুলনামূলক অনুন্নত, সুবিধা-বঞ্চিত এবং দীর্ঘ ঘুরপথে যেতে হয়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের উৎপাদিত শতাধিক ধরনের উৎকৃষ্টমানের পণ্যসামগ্রী, শিল্পপণ্য, নির্মাণ খাতের পণ্য, আইটি ও সেবাখাতের সামগ্রীর উচ্চ চাহিদা তথা ব্যাপক রফতানি বাজার সম্ভাবনা রয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতে। অথচ ট্যারিফ নন-ট্যারিফ (শুল্ক ও অশুল্ক) বাধা-প্রতিবন্ধকতার বেড়াজালে বাংলাদেশের উন্নতমানের পণ্যসামগ্রীর ভারতে প্রবেশ ঠেকিয়ে রাখা হচ্ছে।

এদিকে ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ট্রানজিট-করিডোর চুক্তিটির মাধ্যমে একতরফা সুবিধা দেয়া হয়েছিলÑ ‘ভারত থেকে ভারতের পণ্য- ভারতের জন্য’। একমুখী ট্রানজিট ও করিডোর সুবিধাদানের ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি এবং তাতে উভয় দেশ লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা চিরতরে উবে যায়।

বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘দি সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চলে বাংলাদেশের গুণগত মানসম্পন্ন অনেক পণ্যসামগ্রীর রফতানি বাজার সম্ভাবনা খুলে যাবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অপর দুই নিকট প্রতিবেশী ভূমিবেষ্টিত দেশ নেপাল-ভুটানের সাথেও সহজে আমদানি-রফতানি বাজার প্রসারের সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘দি সেভেন সিস্টার্স’ খ্যাত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের গুণগত মানসম্পন্ন উন্নত পণ্যসামগ্রী রফতানির যে প্রভুত সম্ভাবনা, তা আজও ‘সম্ভাবনা’র মাঝেই রয়ে গেছে। মাছ, শুঁটকি, এমএস রড, সিমেন্ট এ ধরনের সীমিত এবং সামান্য কিছু পণ্য ছাড়া সেই অঞ্চলে তেমন বেশি পণ্য যায় না। ভারতের মূল অংশের তুলনায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি অনুন্নত। সেখানকার জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানও অনেক পিছিয়ে। অথচ স্বল্প দূরত্বে ‘দি সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চলে বাংলাদেশের পণ্যসামগ্রী সহজে যদি রফতানি করা যেতো তাহলে ওই অঞ্চলের জনগণের জীবনমানও উন্নত হতো। ভারতের সাথে আমাদের কানেকটিভিটি দুর্বল। তার ওপর বর্তমানে দু’দেশের সম্পর্কও শীতল।

তিনি আরো বলেন, ভারতে বাংলাদেশের পণ্যসামগ্রী রফতানির ক্ষেত্রে ভারতের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অনেক বেশি। সেটাও বড় সমস্যা। ভারত শুল্ক-অশুল্ক বাধা সরাতে চাইছে না। কেননা ভারতে চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশের পণ্যসামগ্রী সেখানে যাক সেটা ভারত চাইছে না। অথচ বাংলাদেশের মানসম্পন্ন গার্মেন্টস পণ্যসামগ্রীর ভালো চাহিদা রয়েছে ‘সেভেন সিস্টার্স’ বা উত্তর-পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলে। অন্যদিকে ফুলবাড়ী-শিলিগুড়ি ‘চিকেন নেক’ ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে ভারত। এতে করে বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল ও ভুটানের বাণিজ্যের ব্যাপক সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।

ড. মইনুল ইসলাম বলেন, নেপাল তার আমদানি-রফতানির জন্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু এতে কলকাতা, হলদিয়া বন্দরের গুরুত্ব, ব্যস্ততা ও ব্যবসা-বাণিজ্য কমে যাবেÑ এ কারণে ভারত তার ওপর নেপাল, ভুটানকে নির্ভরশীল রাখছে। প্রকারান্তরে, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ আটকে রেখেছে। এজন্যই ‘চিকেন নেক’ ব্যবহার করতে দিতে চাইছে না ভারত।


বিভাগ : বিশেষ সংখ্যা


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

জাগ্রত ভয় মনের মাঝে
আর কেউ বেঁচে নেই
সময়
মার্চের পদাবলি
অপসৃয়মাণ রেলগাড়ি
আরও
X

আরও পড়ুন

খালেস নিয়তে আমল করলে প্রতিদান সুনিশ্চিত

খালেস নিয়তে আমল করলে প্রতিদান সুনিশ্চিত

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা

ট্রাম্পকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ডলার জরিমানা করলেন লন্ডনের হাইকোর্ট

ট্রাম্পকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ডলার জরিমানা করলেন লন্ডনের হাইকোর্ট

ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফেসবুক পোস্টে যা বললেন মোদি

ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফেসবুক পোস্টে যা বললেন মোদি

শেষ হচ্ছে ম্যান সিটিতে ডে ব্রইনে অধ্যায়

শেষ হচ্ছে ম্যান সিটিতে ডে ব্রইনে অধ্যায়

মাগুরায় মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে মানববন্ধন

মাগুরায় মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে মানববন্ধন

ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে থাইল্যান্ডকে আহ্বান ড. ইউনূসের

ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে থাইল্যান্ডকে আহ্বান ড. ইউনূসের

যারা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা আ.লীগের দোসর

যারা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা আ.লীগের দোসর

বিমসটেকের আগামী সম্মেলন নিয়ে যে প্রস্তাব দিলেন ড. ইউনূস

বিমসটেকের আগামী সম্মেলন নিয়ে যে প্রস্তাব দিলেন ড. ইউনূস

ইংল্যান্ড দলে আরেক ধাক্কা

ইংল্যান্ড দলে আরেক ধাক্কা

ট্রাম্পকে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসাবে চান না বেশিরভাগ আমেরিকান

ট্রাম্পকে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসাবে চান না বেশিরভাগ আমেরিকান

নাব্যতা হারিয়ে দখলদারদের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নদী

নাব্যতা হারিয়ে দখলদারদের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নদী

চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনতে শ্রীলঙ্কার সহায়তা চাইলো বাংলাদেশ

চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনতে শ্রীলঙ্কার সহায়তা চাইলো বাংলাদেশ