জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিবাদীদের নৃশংসতা

২৪০০ মামলা হলেও গ্রেফতারে নেই উদ্যোগ

Daily Inqilab সাখাওয়াত হোসেন

০১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০২ এএম | আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০২ এএম

গণআন্দোলনের মুখে পৃথিবীর নানা দেশে স্বৈরাচার পতনের ইতিহাস নতুন নয়। কিন্তু সরকারের পতনের পর সরকারপ্রধানসহ একসাথে ৩শ’ সংসদ সদস্য পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু বাংলাদেশ নয়, তাবৎ দুনিয়ায় বিরল। গত ১৫ বছর ধরে মানুষের ভোট দিতে না পারা, বিরোধী মত দমনে হত্যা, গুম, আর নির্বিচার মামলায় জেলে পুরে রাখার সব ক্ষোভ যেন উথলে ওঠে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। জুলাই-আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব-আনসার এবং যুবলীগ-ছাত্রলীগের হাতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ খুন-আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় হত্যা ও হত্যার চেষ্টায় সারাদেশে মামলা হয়েছে ২৪০০। তবে জড়িতদের অধিকাংশই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। গণঅভ্যুত্থান দমনে হত্যা, গণহত্যা, গ্রেফতার, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত পুলিশ এবং অন্য বাহিনীর সদস্যদের তালিকা তৈরি করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্ত সংস্থা।

১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে রংপুরে আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে ওয়াসিম, শান্ত, ফারুক এবং ঢাকায় সবুজ আলী ও শাহজাহান নিহত হন। ১৭ জুলাই আন্দোলন থামাতে ব্যর্থ হয়ে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় সরকার। ১৮ জুলাই পূর্বঘোষিত কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচিতে মুগ্ধ-ফাইয়াজসহ ৪৮ জন শহীদ হন। এরপর অগ্নিগর্ভে পরিণত হয় বাংলাদেশ। ১৯ জুলাই পুলিশ, আনসার ও বিজিবির নৃশংস গুলিতে মারা যান আরো ১১৯ জন। র‌্যাবের হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণে বাসায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায় ৬ বছরের রিয়া গোপ। এরপর দেশজুড়ে জারি করা হয় কারফিউ। কারফিউ ভেঙে ছাত্র-জনতার মিছিলে ২০ জুলাই শহীদ হন আরো ৭১ জন। দিন যত গড়াতে থাকে মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকে। একই সাথে চলে গণগ্রেফতার। ২৮ জুলাই ১০ দিন পর সচল হয় ইন্টারনেট। গণহত্যার বিচার চেয়ে ফেসবুক প্রোফাইল রক্তিম হয়ে ওঠে আন্দোলনকারীসহ সাধারণ মানুষের।
২ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ৯ দফা বাদ দিয়ে শেখ হাসিনার পতনের এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে ছাত্র সমন্বয়করা। এরপর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে থাকে। ৪ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিলে হামলা চালায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। এ দিনেও ১৩০ জন শাহাদাত বরণ করেন। ৬ আগস্টের বদলে ঢাকামুখী লং মার্চ একদিন এগিয়ে আনেন শিক্ষার্থীরা। ৫ আগস্টেও সকাল থেকে সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এবং সেনাবাহিনী। কিন্ত শেষ রক্ষা হয়নি শেখ হাসিনার। মানুষের সব ক্ষোভ উগড়ে পড়ে গণভবন আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয় বাংলাদেশ।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও পুলিশ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে জুলাই-আগস্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন পুলিশ পরিদর্শক, ১১ জন উপ-পরিদর্শক (এসআই), সাতজন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই), একজন এটিএসআই, একজন নায়েক ও ২১ জন কনস্টেবল রয়েছেন। সরকার পতনের পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। ছাত্র-জনতার রোষানলে ডিএমপিসহ পুলিশের অধিকাংশ সুবিধাবাদী ও আওয়ামীপন্থি পুলিশ কর্মকর্তারা আত্মগোপনে চলে যান। অনেককে গ্রেফতার, বাধ্যতামূলক অবসর ও বদলি করা হয়। ৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় কাজে ফিরলেও ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধসহ ‘মব’ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এখনো সেই ব্যর্থতার বৃত্তেই বন্দি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করতে চায় ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এরই মধ্যে পুলিশের ইউনিফর্ম ও লোগো পরিবর্তনের জন্য কমিটি করা হয়েছে। কমিটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন ও এর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনপ্রশাসন এবং স্বরাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব পালন করা সফররাজ হোসেনকে।

পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, বর্তমানে অনেকটাই স্বরূপে ফিরেছে পুলিশ। জনআস্থা ফেরানোর সব চেষ্টাই করা হচ্ছে। বিতর্কিত ও পতিত আওয়ামী লীগের হয়ে পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তাদের কাউকে সরানো হচ্ছে, মামলায় অভিযুক্তরা গ্রেফতার হচ্ছে। বিভিন্ন ইউনিটে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে।

আইজিপি বাহারুল আলম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, গত জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে এতগুলো মানুষ মারা গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কেন এশিয়ার ইতিহাসেও এমন নজির নেই। এমন একটা ঘটনা ও পরিবর্তনের পরও আমাদের সক্ষমতায় কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটেছে। সব জায়গায় সঠিক লোকটা দিয়ে আমরা শেষ করতে পারিনি। আমাদের পুনর্গঠনের কাজটা চলমান। বদলি হচ্ছে। তদন্ত করতে পারে সেরকম সক্ষম লোকদের বাছাই করে এ কাজে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া, সারাদেশে বিভাগ অনুযায়ী আলাদা মেন্টরিং ও মনিটরিং কমিটি করেছি।

 


বিভাগ : বিশেষ সংখ্যা


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

জাগ্রত ভয় মনের মাঝে
আর কেউ বেঁচে নেই
সময়
মার্চের পদাবলি
অপসৃয়মাণ রেলগাড়ি
আরও
X

আরও পড়ুন

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা

ট্রাম্পকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ডলার জরিমানা করলেন লন্ডনের হাইকোর্ট

ট্রাম্পকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ডলার জরিমানা করলেন লন্ডনের হাইকোর্ট

ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফেসবুক পোস্টে যা বললেন মোদি

ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফেসবুক পোস্টে যা বললেন মোদি

শেষ হচ্ছে ম্যান সিটিতে ডে ব্রইনে অধ্যায়

শেষ হচ্ছে ম্যান সিটিতে ডে ব্রইনে অধ্যায়

মাগুরায় মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে মানববন্ধন

মাগুরায় মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে মানববন্ধন

ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে থাইল্যান্ডকে আহ্বান ড. ইউনূসের

ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে থাইল্যান্ডকে আহ্বান ড. ইউনূসের

যারা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা আ.লীগের দোসর

যারা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা আ.লীগের দোসর

বিমসটেকের আগামী সম্মেলন নিয়ে যে প্রস্তাব দিলেন ড. ইউনূস

বিমসটেকের আগামী সম্মেলন নিয়ে যে প্রস্তাব দিলেন ড. ইউনূস

ইংল্যান্ড দলে আরেক ধাক্কা

ইংল্যান্ড দলে আরেক ধাক্কা

ট্রাম্পকে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসাবে চান না বেশিরভাগ আমেরিকান

ট্রাম্পকে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসাবে চান না বেশিরভাগ আমেরিকান

নাব্যতা হারিয়ে দখলদারদের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নদী

নাব্যতা হারিয়ে দখলদারদের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নদী

চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনতে শ্রীলঙ্কার সহায়তা চাইলো বাংলাদেশ

চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনতে শ্রীলঙ্কার সহায়তা চাইলো বাংলাদেশ

হাসিনাকে ফেরানো নিয়ে যা জানালো ভারত

হাসিনাকে ফেরানো নিয়ে যা জানালো ভারত

প্রথমে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরাতে রাজি মিয়ানমার

প্রথমে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরাতে রাজি মিয়ানমার