আওয়ামী লীগের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০৫ এএম | আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০৫ এএম

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। এই শাসনামলসমূহ ছিল দুঃশাসনে ভরা। দলটি জনগণের প্রতি চরম জুলুম করেছে। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে রক্ষিবাহিনী গঠন করে সিরাজ শিকদারসহ জাসদের প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করে। প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনায় ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ হয়, যাতে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধান সংশোধন করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ৪টি ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে আওয়ামী শাসনের অবসান হয়। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে এবং ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত শাসনটা তুলনামূলক ভালো ছিল। কারণ, তখন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। আওয়ামী লীগ ভালো করেই জানে বিএনপি-জামায়াত একজোট হলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাই ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতা শেষে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আওয়ামী লীগ মানেনি। ফলে ২০০৭ সালে ১/১১ সৃষ্টি হয় এবং ১/১১ সরকারের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত ভোটে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতার মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে যাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে না হয়, সেজন্য আদালতকে ব্যবহার করে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের নামে পিলখানায় সেনাবাহিনীর ৫৭ জন কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। অনেক সেনা কর্মকর্তা ও বিডিআর সদস্য চাকরি হারায়। কয়েক হাজার বিডিআর সদস্যকে গেপ্তার করা হয়, যারা দীর্ঘ কারাভোগ করে। এভাবে সেনাবাহিনী-বিডিআরের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। অর্থনীতিতে লুটপাট এবং রাজনীতিতে দমন-নিপীড়ন চলেছে। ঋণের নামে ব্যাংক এবং শেয়ার বাজার থেকে কারসাজি করে লক্ষ কোটি টাকা লুট করে তা পাচার করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভও চুরি হয়। দৈনিক বণিক বার্তায় ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ করেছে এবং দেশ থেকে পাচার হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার। বিরোধী লোকদের মালিকাধীন ব্যাংক, বীমা এবং স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদ পরিবর্তন করে দখল করা হয়। বিরোধী লোকদের মালিকানাধীন মিডিয়া যেমন: দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান, সিএসবি চ্যানেল , দৈনিক আমার দেশ এবং দৈনিক দিনকাল বন্ধ করে দেয়া হয়। বিরোধী দলের অফিস বছরের পর বছর বন্ধ রাখা হয় এবং জনসভায় অনেকবার হামলা চালানো হয়। চাকরি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরোধী মতের লোকদেরকে বঞ্চিত করা হয়। ক্রীড়াঙ্গন, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং বিচার অঙ্গনকেও চরম দলীয়করণ করা হয়। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন করে এবং বলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কখনো সুষ্ঠু হয় না। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত হয়। অথচ, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থাই বাতিল করে দেয়। তার শাসনামলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন বিরোধী দল বয়কট করে এবং ২০১৮ সালে ভোটের আগের রাতে ভোট বাক্স পূরণ করা হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ও জনগণ ভোট দিতে পারেনি। ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল এবং বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। বিরোধী দলের বৈঠকে পুলিশ হানা দিয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে নাশকতার জন্য গোপন বৈঠকের অভিযোগ তুলে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করেছে। বিরোধী দলের নেতাদের একেক জনের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলাও হয়েছে। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে বলেন, বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে ৮১০৫টি মামলা রয়েছে এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষ আসামী। মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে, চলাফেরা করতে এবং নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারেনি। সর্বত্র ভয়ের সংস্কৃতি বিরাজ করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ছিল না। বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠনসমূহের কার্যক্রম ছিল নিষিদ্ধ। হলগুলিতে ছিল ছাত্রলীগের একক দখলদারিত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ। ছিট দখল, চাঁদাবাজি এবং বিরোধী মতের ছাত্রদের ওপর নির্যাতন ছিল নিত্য দিনের চিত্র। বিএনপি চেয়ারম্যান খালেদা জিয়াকে সাজানো মামলায় কারাদ- দিয়ে জেলে নেয়া হয়েছে, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দেয়া হয়নি। তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে নির্বাসিত এবং তাকেও বিভিন্ন মামলায় কারাদ- দেয়া হয়। বহু মানুষকে গুম করা হয় এবং বিরোধী মতের অনেক নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর জেলে আটকে রাখা হয়। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন ঢাকা থেকে অপহৃত হয়ে নয় বছর পর ভারত থেকে দেশে আসেন। ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে হেফাজতের কর্মসূচিতে আইনশৃংখলা বাহিনী হামলা চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে। অধিকারের তথ্য মতে, সেদিন ৬১ জন মানুষ মারা যায়। সংগঠনটির মতে, ২০০৯-২০২৩ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসন আমলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-ে মারা যায় ২৬৯৯ জন, গুম হয় ৬৭৭ জন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করে ১০৪৮ জন। বিরোধী দলের নেতাদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য এবং অবজ্ঞা করা ছিল নিত্যদিনের চিত্র। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতি ছিল লাগামহীন। উন্নয়নের নামে বড় প্রজেক্ট হাতে নিয়ে বড় দুর্নীতি করা হয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, তার অফিসের পিয়ন চারশত কোটি টাকার মালিক, হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। সিন্ডিকেটের কারণে জিনিসপত্রের দাম ছিল বরাবরই বেশি ও ঊর্ধ্বমুখী। পুলিশ, প্রশাসন, বিচারালয়সহ সবকিছুকে দলীয়করণ করা হয়। মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে অবজ্ঞা এবং আলেম সমাজকে বরাবরই নির্যাতন করা হয়েছে।
আগামীর রাজনীতিবিদ এবং শাসকদের আওয়ামী লীগের করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আওয়ামী লীগের করুণ পরিণতির কারণসমূহ পরিহার করতেই হবে। সুশাসন, ন্যায়বিচার, ভোটাধিকার এবং সংবাদত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মানুষকে নির্ভয়ে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে এবং ভয়ের সংস্কৃতি দূর করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থপাচার, গুম, খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারি এবং ফ্যাসিবাদী আচরণ পরিহার করতেই হবে। মানুষের প্রতি জুলুম, নির্যাতন এবং তাদের অধিকার হরণ করা যাবে না। শাসক নয়, সেবক হতে হবে। ভোটাধিকার হরণ করা এবং জোর করে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। ভিন্ন মতকে দমন নয় বরং সম্মান করতে হবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে যথাযথ শাস্তি দিতে হবে। দুষ্টকে দমন এবং শিষ্টকে লালন করতে হবে। মিথ্যা কথা এবং মিথ্যা প্রতিশ্রুতি পরিহার করতে হবে। মানুষকে সম্মান করতে হবে এবং কখনোই তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করা যাবে না। ধর্মীয় মূল্যবোধকে লালন করতে হবে এবং এর বিরোধী কোনো কাজ করা যাবে না। কোনো ধরনের অন্যায়, অনৈতিক, ধর্মবিরোধী এবং দেশবিরোধী কাজ করা যাবে না। মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন প্রকৌশলী
mar_ctg123@yahoo.como
বিভাগ : সম্পাদকীয়
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন

মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মৃত্যু

ড. ইউনূস-মোদির বৈঠকে ‘আশার আলো’ দেখছেন মির্জা ফখরুল

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক গ্রেফতার

তারেক রহমানের মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা

ড. ইউনূসকে ‘বস’ ডেকে যা বললেন উপদেষ্টা আসিফ

গণপিটুনিতে নিহত খুনে অভিযুক্ত, বাঁচাতে যেয়ে আহত ৬ পুলিশ

চিকেন’স নেক নিয়ে আতঙ্কে ভারত, নিরাপত্তা জোরদার

মরহুম আতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তঃব্যাচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা

ড. ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল : মির্জা আব্বাস

জকিগঞ্জে অটোরিকশা চালককে মারধর করে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

বিএনপি কারো উপর নির্যাতন করতে চায় না' : শামা ওবায়েদ

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

থাইল্যান্ড থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা