রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা

Daily Inqilab ব্রি. জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০১ এএম | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০১ এএম

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো জনগণের ক্ষমতা, যা গণতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং তাদের করের অর্থ দিয়েই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়। এ কারণে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ ও নীতিনির্ধারকগণ জনগণের প্রতি সরাসরি দায়বদ্ধ। তবে বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

আজকের বিশ্বে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতির স্বচ্ছতার অভাব এবং মিডিয়া ও তথ্যপ্রবাহের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ। এসব কারণে জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

জবাবদিহি হলো রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান নীতি, যা নিশ্চিত করে, প্রশাসনিক ক্ষমতা যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়। গণতান্ত্রিক দেশে এই জবাবদিহি নি¤œলিখিত স্তরগুলোতে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি:

(ক) প্রশাসনিক জবাবদিহি

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের দায়িত্ব হলো জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রের সেবা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্য এবং স্বচ্ছতার অভাবের কারণে সাধারণ জনগণ নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হয়।

একটি কার্যকর প্রশাসন নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য ও জবাবদিহিমূলক হওয়া উচিত। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, সরকারি সংস্থাগুলোতে সেবা পেতে গেলে দীর্ঘসূত্রিতা, অপ্রয়োজনীয় নিয়মকানুন এবং কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়। সাধারণ নাগরিকদের জন্য একটি ন্যায্য অধিকার পাওয়া অনেক সময় কেবল ক্ষমতাশালী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে সহজ হয়ে দাঁড়ায়, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছতার অভাব। নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গোপনীয়ভাবে নেওয়া হয়, যেখানে সাধারণ জনগণের কোনো অংশগ্রহণ থাকে না। এমনকি, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রকল্প বা চুক্তির বিষয়ে পর্যন্ত অনেক সময় স্বচ্ছতা থাকে না, যা রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা দুর্বল করে দেয়। নীতিনির্ধারকদের মধ্যে স্বজনপ্রীতি, দলীয় স্বার্থ সংরক্ষণ বা বিশেষ মহলের জন্য সুবিধা নিশ্চিত করার প্রবণতা থাকলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা হারিয়ে যায়।

এছাড়াও, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অভিযোগ জানানো বা প্রতিকারের সুযোগ সীমিত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ জানালেও তা আমলে নেওয়া হয় না বা প্রতিকার পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। প্রশাসনিক জবাবদিহির অভাবের কারণে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা শুধু জনগণের দুর্ভোগ বাড়ায় না, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেও দুর্বল করে দেয়।

প্রশাসনিক অনিয়ম ও জটিলতা কমাতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা দূর করা এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহ এবং জবাবদিহির শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকলে প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়বে এবং জনগণ সহজেই তাদের ন্যায্য সেবা পাবে। যদি এই সমস্যাগুলো সমাধান করা না হয়, তবে সাধারণ জনগণের প্রতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা কমতে থাকবে, যা গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে হুমকিস্বরূপ।

(খ) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা

রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের নিরাপত্তা, শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য গঠিত হয়। তাদের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন করা এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। কিন্তু যদি এই বাহিনী নিরপেক্ষতার পরিবর্তে বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তাহলে জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয় এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয়।

যখন কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন তারা জনগণের রক্ষক থেকে দমনযন্ত্রে পরিণত হয়। এতে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ জনগণ ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় নিরাশ হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যদি অপরাধীদের রক্ষা করা হয় এবং নিরীহ মানুষকে দমন করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়। এর ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। প্রতিপক্ষকে দমন করতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করা হলে বিরোধী পক্ষ নিজেদের রক্ষা করার জন্য পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এতে সংঘাত, বিক্ষোভ, দমন-পীড়ন এবং অনিয়মিত গ্রেফতারের মতো ঘটনা বেড়ে যায়, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও বাড়তে থাকে। যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ থাকে না, তখন তারা নিরপরাধ নাগরিকদের গ্রেফতার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্যাতনের মতো কর্মকা-ে লিপ্ত হতে পারে। এই ধরনের কার্যক্রম জনগণের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে এবং রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করে। ক্ষমতার অপব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। কোনো বাহিনী যখন বিশেষ কোনো দলের আদেশ অনুযায়ী কাজ করে, তখন তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নষ্ট হয় এবং তারা দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের কারও ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থের বাহন না হয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। বাহিনীগুলোর স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা ফিরে আসবে এবং আইনের শাসন সুসংহত হবে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তাহলে দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে, যা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

(গ) বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যখন বিচারব্যবস্থা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকে, তখন সাধারণ নাগরিকেরা ন্যায়বিচার পেতে সক্ষম হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা বজায় থাকে। তবে বিচারব্যবস্থা যদি রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয় বা ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে পরিচালিত হয়, তাহলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের আইনের শাসন দুর্বল হয়ে যায়। যদি বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে তা নিরপেক্ষতা হারায় এবং বিচারপ্রার্থী জনগণ সঠিক রায় পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়। বিশেষত, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী যদি বিচারব্যবস্থাকে তাদের প্রতিপক্ষকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে বিচারালয় জনগণের আস্থার জায়গা হয়ে ওঠার পরিবর্তে নির্যাতন ও প্রতিহিংসার অস্ত্রে পরিণত হয়। বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি বা সরকারবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হলে সাধারণ জনগণের মধ্যে ভয় ও অনিরাপত্তার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এর ফলে বিচারিক কাঠামোর প্রতি জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়। যখন আদালত রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন দেখা যায় একই ধরনের অপরাধের জন্য কিছু ব্যক্তিকে কঠোর সাজা দেওয়া হয়, আর অন্যদিকে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের ক্ষেত্রে শাস্তি লঘু করা হয় বা মামলা ধামাচাপা দেওয়া হয়। এই দ্বৈত নীতি বিচারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে এবং সাধারণ নাগরিকদের মনে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দেয়।

বিচারব্যবস্থা যখন স্বাধীন থাকে না, তখন সেখানে দুর্নীতি বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ফলে আদালতের রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ, অবৈধ লেনদেন ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়, আর সাধারণ মানুষ সুবিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এতে সমাজে অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং ন্যায়বিচারের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়াও, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা খর্ব হলে জনগণের মৌলিক অধিকারও সংকুচিত হয়ে পড়ে। যখন আদালত রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত হয়, তখন ব্যক্তির বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ন্যায়সঙ্গত আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকারও সংকটে পড়ে। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা তখন হয় দমনমূলক, এবং সাধারণ নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণœ হতে থাকে।

এই পরিস্থিতি রোধ করতে হলে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। আদালতকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা, বিচারকদের নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং মামলার রায় কেবল আইনের ভিত্তিতে দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। বিচারিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্মুক্ত বিচার প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা চালু করলে বিচারব্যবস্থা আরও কার্যকর ও নিরপেক্ষ হতে পারে।

যদি বিচারব্যবস্থা স্বাধীন না থাকে, তাহলে সাধারণ জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘিত হয় এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি দীর্ঘমেয়াদে সমাজে অবিশ্বাস, অস্থিরতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতার জন্ম দেয়, যা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই, বিচারব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা এবং এর পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য একান্ত অপরিহার্য।

(ঘ) নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহি

রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন তাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি তারা জনগণের চাহিদা, মতামত এবং স্বার্থকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে নীতি নির্ধারণ করেন, তাহলে তা কেবল সাময়িক সুবিধা আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে।

নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকলে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যায়। জনগণের মতামত উপেক্ষিত হলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো একপাক্ষিক হয়ে পড়ে এবং জনগণের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সেগুলোর সংযোগ থাকে না। এর ফলে নীতি বাস্তবায়নের সময় নানা ধরনের অসন্তোষ, বিরোধিতা এবং সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে, যদি নীতিগুলো গোপনীয়ভাবে প্রণয়ন করা হয় এবং সেগুলো নিয়ে জনগণের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা পরামর্শ করা না হয়, তাহলে তা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থী।

নীতিগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তবধর্মী ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি হওয়ার ওপর। যদি কোনো নীতি বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হয়, তাহলে তা প্রয়োগের সময় নানা জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং কাক্সিক্ষত ফল অর্জন সম্ভব হয় না। উদাহরণস্বরূপ, যদি অর্থনৈতিক নীতিগুলো বৃহৎ শিল্প ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় তৈরি করা হয়, কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। একইভাবে, যদি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নীতি প্রণয়ন করা হয় কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট, অবকাঠামো বা দক্ষ জনবল না থাকে, তাহলে সেই নীতি কাগজে-কলমে থেকে যাবে এবং জনগণের কোনো উপকারে আসবে না।

নীতির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় আমরা দেখি, নীতিমালা ঘোষণা করা হলেও তা বাস্তবায়নে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। যদি প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে নীতিগুলো ঠিকভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে হতাশা জন্ম নেয় এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। অনেক নীতিই সাধারণ জনগণের জন্য উপকারী হতে পারে, কিন্তু যদি সেই নীতির সুযোগ-সুবিধা কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা ন্যায়বিচার ও সাম্যতার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।

এই সমস্যাগুলোর সমাধানে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। নীতিনির্ধারণের প্রতিটি ধাপে জনগণের মতামত, নাগরিক সমাজের সুপারিশ এবং গণমাধ্যমের সমালোচনা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। নীতি প্রণয়নের আগে গণশুনানি, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং নাগরিক মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা অধিকতর কার্যকর হয় এবং জনগণের আস্থা অর্জন করে। একাধারে, নীতির কার্যকারিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী ভূমিকা থাকা প্রয়োজন, যাতে নীতিগুলোর প্রয়োগ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা যায়।

একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা তখনই নিশ্চিত হয়, যখন নীতিনির্ধারকরা জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন এবং নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা বজায় রাখেন। অন্যথায়, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা কমে যায়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের অগ্রগতি ব্যাহত হয়।

একটি মুক্ত ও স্বাধীন মিডিয়া গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। এটি প্রশাসন, সরকার ও জনগণের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে এবং রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা বলে মিডিয়ার ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, যা সংবাদ প্রচারের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে।

কিছু মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে না; বরং বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা শক্তির স্বার্থে কাজ করে। এতে করে প্রকৃত তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছায় না এবং তারা বিভ্রান্তিতে পড়ে। অনেক সময় সরকার বা প্রভাবশালী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, যাতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ না হয়। এর ফলে সমাজে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং জনগণ প্রকৃত সত্য জানতে পারে না। আজকের যুগে ডিজিটাল মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে অনেক দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে, যেখানে সরকার বা প্রশাসন জনগণের কণ্ঠরোধ করতে বিভিন্ন আইন প্রয়োগ করছে। এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনি সংকেত।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর ভবিষ্যৎ গঠনে প্রশাসন, মিডিয়া, বাহিনী ও জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা থাকতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় রাজনীতি ও বাহ্যিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে যদি দেশ পরিচালিত হয়, তবেই একটি উন্নত, আত্মনির্ভরশীল ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে। জনগণের অধিকার রক্ষা করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা নিরীক্ষা করাও জনগণের অধিকার।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক


বিভাগ : সম্পাদকীয়


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

টিসিবির পণ্য পেতে মানুষের ভোগান্তি
ইসলামী আর্থিক ব্যবস্থার আইনি কাঠামো প্রয়োজন
বিএনপি এখন কি করবে
ট্রাম্পের শুল্ক নীতি : বাংলাদেশকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে
মোবাইল হতে শিশুদের দূরে রাখুন
আরও
X

আরও পড়ুন

মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মৃত্যু

মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মৃত্যু

ড. ইউনূস-মোদির বৈঠকে ‘আশার আলো’ দেখছেন মির্জা ফখরুল

ড. ইউনূস-মোদির বৈঠকে ‘আশার আলো’ দেখছেন মির্জা ফখরুল

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক গ্রেফতার

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক গ্রেফতার

তারেক রহমানের মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা

তারেক রহমানের মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা

ড. ইউনূসকে ‘বস’ ডেকে যা বললেন উপদেষ্টা আসিফ

ড. ইউনূসকে ‘বস’ ডেকে যা বললেন উপদেষ্টা আসিফ

গণপিটুনিতে নিহত খুনে অভিযুক্ত, বাঁচাতে যেয়ে আহত ৬ পুলিশ

গণপিটুনিতে নিহত খুনে অভিযুক্ত, বাঁচাতে যেয়ে আহত ৬ পুলিশ

চিকেন’স নেক নিয়ে আতঙ্কে ভারত, নিরাপত্তা জোরদার

চিকেন’স নেক নিয়ে আতঙ্কে ভারত, নিরাপত্তা জোরদার

মরহুম আতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তঃব্যাচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা

মরহুম আতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তঃব্যাচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা

ড. ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল : মির্জা আব্বাস

ড. ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল : মির্জা আব্বাস

জকিগঞ্জে অটোরিকশা চালককে মারধর করে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

জকিগঞ্জে অটোরিকশা চালককে মারধর করে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

বিএনপি কারো উপর নির্যাতন করতে চায় না' : শামা ওবায়েদ

বিএনপি কারো উপর নির্যাতন করতে চায় না' : শামা ওবায়েদ

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

থাইল্যান্ড থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

থাইল্যান্ড থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা