শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই
০৫ মার্চ ২০২৫, ১২:০৫ এএম | আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৫, ১২:০৫ এএম

সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ-জামানের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য নিয়ে সর্বমহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া কিংবা অতি প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখা গেছে। সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী হলেও সেনাপ্রধান সরকারের কোনো অংশ নয়। সাংবিধানিক আইনের আওতায় সরকার চাইলে সেনাবাহিনী কখনো কখনো বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় কাজ করে থাকে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতনের পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, গত দেড় দশকে পুলিশ বাহিনীসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনীসমুহকে ভারতীয় এজেন্ডায় আওয়ামী লীগের দলীয়করণ করা হয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে পুরো জাতি শেখ হাসিনার দু:শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেও কার্যত জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার স্বৈরাচারি শাসন টিকিয়ে রাখতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুরু থেকে শেষ সময় পর্যন্ত জনগণের উপর গুলি চালাতে কুণ্ঠিত হয়নি। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেও শেখ হাসিনা নাকি তাঁর চলে যাওয়ার পর পুলিশকে বিদ্রোহীর ভূমিকায় ঠেলে দিতে অনুগত পুলিশ প্রধানকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ৩ আগস্ট সেনা সদরে অনুষ্ঠিত বিশেষ দরবার ডেকে রাজপথের আন্দোলনে সেনাবাহিনীর করণীয় সম্পর্কে একটি পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিমিত্তে দেশের সব সেনা ইউনিটের প্রধানসহ সব গুরুত্বপূর্ণ সেনা কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করতে দেখা গিয়েছিল। সেখানে অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা এবং নি¤œ ও মধ্য সারির প্রায় সব সেনা কর্মকর্তা জনগণের বুকে গুলি না চালিয়ে তাদের আন্দোলনে সমর্থন দেয়ার পক্ষে মত দেন। মূলত সেদিনই শেখ হাসিনার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ-জামান সেদিন সেনাপ্রধান হিসেবে তার বাহিনীর উপর কোনো কর্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চাইলে কি ঘটত তা নিয়ে মতান্তর থাকলেও কোনো পক্ষের জন্যই তা মোটেও সুখকর হতো না। আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার নির্দেশে কয়েকদিন সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যকে অনেকটা দলবাজ র্যাব-পুলিশের ভূমিকায় দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত জাতির সেই মাহেন্দ্রক্ষণে সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকা ছাত্র-জনতার রক্তক্ষরণ কিছুটা কমিয়ে বিজয় নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে পুলিশের সাথে ছাত্র-জনতার সংর্ঘষে শত শত মানুষের প্রাণহানি, হাজার হাজার মানুষ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও ছাত্র-জনতাকে একচুলও হটানো যায়নি। ছাত্র-পুলিশের সংঘাত ও সম্মুখ সমর শেষ পর্যন্ত পুলিশের পতন ও থানায় হামলা, অগ্নি সংযোগ, গণপিটুনিতে বেশকিছু পুলিশ সদস্যের মত্যু ও বাকিদের পলায়ণের মধ্য দিয়ে ৩৬ জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পরিসমাপ্তি ঘটে। তার পর ৭ মাসেও দেশের পুলিশ বাহিনী স্বাভাবিক শৃঙ্খলাসহ পূর্ণ কর্মক্ষমতায় ফিরে আসেনি। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অর্ন্তবর্তী সরকারের হাতে অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভার অর্পণ করার পর থেকেই শেখ হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বি রাজনৈতিক জোটের দুই প্রধান শরিকদল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বার্থদ্বন্দ্ব ও নানা বিষয়ে মতপার্থক্য ও স্পষ্ট হয়ে দেখা দিতে শুরু করে। এসব দলের নেতাকর্মীদের বিগত ১৬ বছরের চরম তীক্ত অভিজ্ঞতা, নিপীড়ন-বঞ্চনা এবং দেশকে একটি ভয়ঙ্কর শূণ্যতা ও ভঙ্গুরতার গহ্বরে ফেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হয়েও তাদের এহেন আচরণ গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তি ছাত্র-জনতা তথা নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক ধরণের হতাশা ও বিক্ষোভের জন্ম দেয়া অস্বাভাবিক নয়। জরুরি প্রয়োজনীয় সংস্কার, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের টাইমলাইন, গুম-খুন- গণহত্যার বিচার, শেখ হাসিনা মনোনীত রাষ্ট্রপতির অপসারণ, শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার এবং অপরাধী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিএনপি-জামায়াতের মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু তার মধ্যে যদি ভারতীয় এজেন্ডার প্রতিফলন দেখা যায়, পতিত স্বৈরাচারের ন্যারেটিভ ব্যবহার করে তাদের পুর্নবাসনের ভাব-লক্ষণ প্রতিফলিত হয়, তা শুধুমাত্র ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আমলাতন্ত্র এখনো শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী ট্রমা থেকে বের হতে না পারায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের লক্ষ্য পূরণে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না। অন্যদিকে, এক সময়ের জোটসঙ্গী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার অন্তর্কলহ কখনো কখনো রক্তাক্ত সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাতের ঘটনাটি সারাদেশে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের কঠোর নির্দেশনার কারণে তা আর বাড়েনি। একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী ন্যারেটিভ ও জাতিকে বিভক্ত করে ফায়দা হাসিলের রাজনীতি নতুন প্রজন্ম প্রত্যাখ্যান করেছে। নতুন বাংলাদেশ ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রত্যাখ্যান করেছে। সে সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের চোখে চোখ রেখে অমিমাংসিত সব ইস্যুর সমাধান করতে চায়। দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ড. ইউনূস প্রতিবেশি দেশের সরকারকে এই বার্তা দিয়েছেন। এরপর অনবরত হুমকি, নানামুখী ষড়যন্ত্র, শেখ হাসিনাকে দিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ধারাবাহিক তৎপরতায় সরকারের অবস্থান কখনো কখনো টালমাটাল অবস্থার মধ্যেও সরকার ভারতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। তবে বিএনপি-জামায়াতের স্বার্থদ্বন্দ্ব, বাগযুদ্ধ ও শীতল যুদ্ধ নেতাকর্মীদের মধ্যে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও ভারতবিরোধী ঐক্যে ফাঁটল ও আভ্যন্তরীণ হানাহানির সুযোগে পতিত স্বৈরাচারের দোসর ও ভারতীয় লেসপেন্সাররা বাড়তি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে নতুন করে আঘাত হানার সাহস যোগাতে পারে। তারা এক মুহূর্তের জন্যও বসে নেই। সারাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের কয়েক হাজার নেতাকর্মী বিদেশে পালিয়ে গেছে। কেউ কেউ দেশেই আত্মগোপনে থাকলেও আওয়ামী লীগের লাখ লাখ নেতাকর্মী যারা গত ১৬ বছর জনগণের উপর অবৈধ কর্তৃত, আধিপত্য, নিপীড়ন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও জুলুমবাজি করেছিল, দুএকটি বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম বাদ দিলে তাদের কাউকেই গত ৭ মাসে আত্মসমালোচনা, অতীতের কর্মকা- নিয়ে অনুশোচনা কিংবা অনুতপ্ত হতে দেখা যায়নি। উপরন্তু তারা এখন বাস্তবের দেশ-দুনিয়া ছেড়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও ভার্চুয়াল জগতে অতি মাত্রায় সক্রিয় হয়ে ডিজইনফর্মেশন ক্যাম্পেইন চালিয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও অর্ন্তবর্তী সরকার বিরোধী জনমত গঠনে তৎপর রয়েছে। এহেন বাস্তবতায় স্বৈরাচারের পতনের সহযোগী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অনৈক্য, বিভেদ ও কাঁদা ছোঁড়াছুড়ির বাস্তবতা পতিত স্বৈরাচারের এজেন্ডাকেই শক্তিশালী করবে। রাওয়া ক্লাবে জেনারেল ওয়াকার উজ-জামানের বক্তব্যে ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে যে কর্তৃত্ববাদী ভাব-লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে, তাও দুই প্রধান রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র-জনতার সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যকার বিভেদ-তিক্ততার কারণেই সম্ভব হয়েছে। ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি দেশে যেকোনো ভাবে নতুন কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার জন্ম দিতে পারে। সেনা প্রধান সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছেন। এটা তার ইতিবাচক মনোভাবের বহি:প্রকাশ হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পূর্ণ ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে রেখে, এমনকি ‘অপারেশন ডেভিলহান্ট’র মত অভিযান পরিচালনা অব্যাহত থাকার পরও জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিকে সচেতন মহল স্বাভাবিকভাবে গ্রহন করতে পারছে না। একদিকে আওয়ামী লীগের পলাতক অপরাধিদের অধিকাংশই অধরা, অন্যদিকে বিএনপি’র মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের স্বার্থদ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও আধিপত্যের লড়াই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জনসম্পৃক্ত দলটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে অজনপ্রিয় করে তুলছে। এসব ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও সদিচ্ছা জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পেছনে কোনো দল, গোষ্ঠি বা ব্যক্তির একক নেতৃত্ব ছিল না। শুরুতে তারা কোটা, মেধাভিত্তিক ভর্তি-নিয়োগ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা ভিত্তিক আন্দোলনের ডাক দিলেও অভ্যুত্থানের চুড়ান্ত মুহূর্তে তারা রাষ্ট্র মেরামাতের দাবি জানিয়ে নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ঘোষণা করেছিল। তারা সম্ভবত আশা করেছিল, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মত একজন বিশ্বজনীন ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে গঠিত অর্ন্তবর্তী সরকারের পাশে ফ্যাসিবাদের ভুক্তভোগী বিএনপি-জামায়াতের মত রাজনৈতিক শক্তিগুলো যথাযথ ভূমিকা নিয়ে পাশে থাকবে। আরো আগেই বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের ৩১দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজসাধ্য নয়। জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ, প্রত্যাশিত সংস্কার কর্মসূচি দলীয় কর্তৃত্ববাদের বিলুপ্তি ঘটাবে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর দলের নেতাদের কর্তৃত্ব খর্ব করে এমন আইন পাশের ঘটনা বিরল। এ কারণেই অর্ন্তবর্তী সরকারের কাঁধে বন্দুক রেখে জনগণের প্রত্যাশিত রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সংস্কার এবং পতিত স্বৈরাচারের গুম-খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে চলমান প্রক্রিয়ায় একটা গ্রহণযোগ্য মাত্রায় উপনীত করার মধ্য দিয়ে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের পথচলাকে আরো সহজ করা সম্ভব। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার শুরু থেকেই ভারত সরকারের বক্তব্য, শেখ হাসিনা ও পতিত দোসরদের বক্তব্য এবং বিএনপি’র কতিপয় শীর্ষ নেতার বক্তব্যে অভিন্ন সুর ও স্বর শোনা যাচ্ছে। এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে, পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করা এবং কথিত ডেভিল হান্ট অভিযান সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর সদিচ্ছা ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ এবং সেনাপ্রধানের সর্তকতামূলক চরম বার্তা জনমনে নতুন আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। সামগ্রিক বাস্তবতা সামনে রেখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের ব্যানারে ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি(এনসিপি)র আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। দেশের রাজনীতির মাঠে এ নতুন দল কি প্রভাব বা পরিবর্তন ঘটায় দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও তা দেখার কৌতুহল দেখা যাচ্ছে। তবে প্রভাবশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট পতিত স্বৈরাচার এখনো দেশে-বিদেশে সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে স্বৈরাচারের চরম নিপীড়ন-নির্যাতন, গুম-খুনের ঝুঁকি নিয়েও যখন স্বৈরাচারবিরোধী রাজনৈতিক জোট ভাঙ্গা সম্ভব হয়নি, নির্দলীয় অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে এসে তাদের মধ্যে বিভেদ-বিসম্বাদ, কাঁদা ছোড়াছুড়ি, অনাস্থা ও পতিত স্বৈরাচারের ন্যারেটিভ ব্যবহারের যে চর্চা দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে, কোনো একক দলের পক্ষে আর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাতে ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই, সংস্কার ও নির্বাচনসহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের পথে ছাত্রদের নতুন দল একটি নিয়ামক শক্তি হিসেবে আবির্ভুত হতে পারে। শেখ হাসিনার পতনের অনেক আগেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামীতে জাতীয় নির্বাচনের পর একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ হিসেবে শেখ হাসিনার স্বৈরাচার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এতটা প্রবল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। তবে কেউ কেউ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ভারতের সাথে গোপণ সমঝোতা বা আঁতাতের অভিযোগ তুলেছেন। দ্রুত নির্বাচনের টাইমলাইন, বিচার ও সংস্কার প্রশ্নে প্রায় অভিন্ন বক্তব্য সে সন্দেহ আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় উপমহাদেশের ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন একটি এপিসেন্টারে পরিনত হয়েছে। একদিকে ভারতের প্রবল বিরোধিতা ও ডিস্ট্যাবিলাইজেশন এজেন্ডা, অন্যদিকে ড. ইউনূসের মত বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বের হাত ধরে জাতিসংঘ, ইউরোপ-আমেরিকা, পশ্চিমা বিশ্ব এবং চীন-জাপানসহ প্রায় সব উন্নয়ন সহযোগী দেশ বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তী সরকারের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়ে এসেছে। পরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার কোটি ডলার পাঁচার করে ভঙ্গুর ও দেউলিয়া অবস্থা থেকে দেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সম্ভাবনার দিকে টেনে তোলার কঠিন চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্য অর্জনের কথা ভুৃলে গিয়ে পরিক্ষিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার বাস্তবতা নতুন প্রজন্ম মেনে নিতে পারছে না। সাম্প্রতিক ইতিহাসে অনুরূপ পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল তিউনিসিয়ায়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতাসীন জাইন আল আবেদিন বেন আলীর কর্তৃত্ববাদী শাসনে দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছিল। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থা ছিল অনেকটা শেখ হাসিনার আমলেল মতই। শহরের রাস্তায় বাওজিজি নামের এক তরুণ হকার পুলিশের দুর্নীতি ও স্থানীয় মেয়রের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে প্রকাশ্য রাস্তায় নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তিনদিন পর হাসপাতালে বাওজিজির মৃত্যু হয়। অনেকটা রংপুরের আবু সাঈদের মত। এর মধ্যে পুরো তিউনিসিয়ায় প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল কর্তৃত্ববাদী শাসক বেন আলী দেশ ছেড়ে পালিয়ে সউদী আরবে আশ্রয় নেন। তিউনিসিয়ার সেই জুঁই বিপ্লবের ঢেউ পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আরব বষন্তের সূচনা করে। বেন আলীর পতনের পর তিউনিসিয়ায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের পথে যে রাজনৈতিক সংকট ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা অনেকটা সে রকম। তবে তিউনিসিয়ায় সংকট নিরসনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসহ নাগরিক অংশীজনদের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার পথ সৃষ্টিতে সে দেশের শ্রমিকদের সংগঠন, আইনজীবীদের সংগঠন, শিল্প বাণিজ্য বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা এবং মানবাধিকার বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এগিয়ে এসে দেশকে একটি সম্ভাব্য সংঘাত-সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। তিউনিসিয়ান ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্ট্রেট বা চতুর্পাক্ষিক জাতীয় আলোচনা পরিষদ নামে পরিচিত সংলাপের সাংগঠনিক ভিত্তিকে ২০১৫ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করে, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘসহ আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পর পর তিনটি ভুয়া নির্বাচন করেছিল শেখ হাসিনা। এসব নির্বাচন করতে এবং জনগণের প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে গুম-খুন, গণহারে মিথ্যা মামলা ও বিচারহীন হত্যা-নির্যাতনের পথ বেছে নেয়া হয়েছিল। সেই দু:শাসনের প্রতিক্রিয়ায় সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অনুঘটক বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৭ মাস ধরে রাজপথে প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে এসেছে। শেষতক তারা একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের অবস্থান যাই হোক, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে দেশকে ঐক্য, সমৃদ্ধি ও গণতান্ত্রিক ধারায় স্থিতিশীলতার পথে তুলে দিতে পারলে বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস আবারো নোবেল শান্তি পুরষ্কারের দাবিদার হতে পারেন। এমনটি হলে, তা হবে বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত। তিউনিসিয়ান কোয়ার্ট্রেটের মত বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী রাজনৈতিক জোট, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও সে অর্জনের অন্যতম অংশীদার হতে পারে।
bari_zamal@yahoo.com
বিভাগ : সম্পাদকীয়
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন

মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মৃত্যু

ড. ইউনূস-মোদির বৈঠকে ‘আশার আলো’ দেখছেন মির্জা ফখরুল

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক গ্রেফতার

তারেক রহমানের মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা

ড. ইউনূসকে ‘বস’ ডেকে যা বললেন উপদেষ্টা আসিফ

গণপিটুনিতে নিহত খুনে অভিযুক্ত, বাঁচাতে যেয়ে আহত ৬ পুলিশ

চিকেন’স নেক নিয়ে আতঙ্কে ভারত, নিরাপত্তা জোরদার

মরহুম আতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তঃব্যাচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা

ড. ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল : মির্জা আব্বাস

জকিগঞ্জে অটোরিকশা চালককে মারধর করে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

বিএনপি কারো উপর নির্যাতন করতে চায় না' : শামা ওবায়েদ

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

থাইল্যান্ড থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা