কৃষি-শিল্পে উৎপাদন বাড়াতে হবে
০৯ মার্চ ২০২৫, ১২:১৪ এএম | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৫, ১২:১৪ এএম

বাংলাদেশ মূলত আমদানিনির্ভর দেশ। সেলাই মেশিনের সুচ থেকে শুরু করে সেভিং ব্লেড পর্যন্ত আমদানি করতে হয়। আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। উন্নতি ব্যাহত হয়। দেশে যেটুকু পণ্য উৎপাদন হয়, তার উৎপাদন হার খুব কম। মোট উৎপাদনের পরিমাণ কম। তাই উৎপাদন ব্যয় বেশি, মূল্যও অধিক। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হচ্ছে। কৃষিপণ্যের বিষয়ে আলোচনা করা হলেই বিষয়টি প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। জমি খুবই উর্বর। অধিকাংশ জমিতে বছরে ৩/৪টি করে ফসল হয়। মিঠা পানি প্রচুর। দেশের বেশিরভাগ মানুষ কৃষির সাথে জড়িত। কৃষকরা খুবই কর্মঠ। প্রকৃতি অনুকূল। কৃষির এমন অনুকূল পরিবেশ বিশ্বে বিরল। তবুও বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংভর নয়। দেশে মোট কৃষিপণ্যের বাজারের আকার ১৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। তন্মধ্যে দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজারের আকার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। অবশিষ্ট চাহিদা মেটাতে আমদানি করা হয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য। যেমন: চালের ঘাটতি রয়েছে। গমের ঘাটতি প্রয়োজনের ৮৫%। পাট, শাক-সবজীর উৎপাদন ভালো। কিছু রফতানিও হয়। মাছ-মাংসের উৎপাদন ভালো, প্রায় চাহিদা মাফিক। এছাড়া, মসল্লা জাতীয় সব পণ্যের বেশিরভাগই আমদানি করতে হয়। তাই মূল্য বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে কৃষিপণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের। তবে ভোজ্যতেলের হিসাব যোগ করলে আরো ২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ খাদ্যনিরাপত্তা হীনতার মধ্যে রয়েছে। কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড ও ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফের যৌথভাবে প্রণীত বিশ্ব ক্ষুধা সূচক-২০২৪ মতে, ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৮৪তম। রিপোর্টে বাংলাদেশকে মাঝারি মাত্রার ক্ষুধাপীড়িত দেশ বলে বলা হয়েছে। জার্মানভিত্তিক স্ট্যাটিস্টারের সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য মতে, এ বছর তথা ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৫.২ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে। উপরন্তু বছরে প্রায় শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ হারে কৃষি পণ্য আমদানি বাড়ছে। এই আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে ভারতীয় পণ্য বেশি। ভারতের পণ্য আমদানির মাধ্যমে আসা ছাড়াও চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে আসে।
দেশে ক্রমান্বয়ে জনসংখ্যা বাড়ছে, কৃষিজমি কমছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপক ফসল হানির বিষয়টি প্রায় নিয়মিত। উপরন্তু কৃষিপণ্যের বিরাট অংশ পচে যায় ও নষ্ট হয়। এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব তো রয়েছেই। জার্মান ওয়াচ-এর ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার ১০টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে সাত নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ। এই অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি! অপরদিকে, অতিরিক্ত ফসল ফলানো ও অধিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউটের গবেষণা রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ শতাংশ হারে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পাবে। ফাও বলেছে, বাংলাদেশে ২০৫০ সালের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন ২৫-৩০ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। এসব নানা কারণে আগামীতে খাদ্য আমদানি বাড়বে অনেক। তাতে কাক্সিক্ষত সার্বিক উন্নতি ব্যাহত হবে। তাই দেশের সার্বিক উন্নতি অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে কৃষির সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। তবেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। অবশ্য, উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানো দরকার। কিন্তু সেটা এখনই সম্ভব নয়। তাই দেশে কৃষিপণ্যের মোট উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উৎপাদনের হার বাড়াতে হবে, অপচয়-নষ্ট ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে, প্রয়োজণীয় পণ্য সংরক্ষণ করতে হবে। এসবের কোন বিকল্প নেই। উৎপাদন হার বাড়ানোর জন্য সর্বদা সর্বত্রই লেটেস্ট আবিষ্কৃত তথা সর্বাধুনিক হাইবিড বীজ ব্যবহার করতে হবে। উপরন্তু সমগ্র কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তিকীকরণ করতে হবে। উপরন্তু তা পরিচালনা ও মেরামত করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ লোক তৈরি করতে হবে। সর্বোপরি প্রয়োজন মোতাবেক কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বল্পমূল্যে সব কৃষি উপকরণ কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কৃষিঋণের ব্যবস্থা করতে হবে স্বল্প সুদে ও বিনা ঝামেলায়। সব ফসলের ভরা মওসুমে তথা ফুল সিজনে কৃষিপণ্য ন্যায্য মূল্যে সরাসরি কৃষকের নিকট থেকে ক্রয় করতে হবে। তবেই কৃষক লাভবান হবে। নতুবা কৃষক মূল্য কমজনিত লোকসান থেকে রক্ষা পাবে না। মনে রাখতে হবে যে, কৃষকের আর্থিক উন্নতি না হলে কৃষিখাতের টেকসই উন্নতি হবে না। কৃষক নিরুৎসাহী হয়ে পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে যাবে। উল্লেখ্য যে, সমলয় ও সমবায় ভিত্তিক চাষ এবং চাহিদামাফিক ফসল ফলানো কৃষি ও কৃষকের জন্য মঙ্গলজনক। পানিতে ভাসমান ফসল ফলানো ও সর্বত্রই শস্য বহুমুখীকরণ করা মঙ্গলজনক।
বাংলাদেশের শিল্পের অবস্থাও ভালো নয়। ভারী শিল্পের বেশিরভাগ বন্ধ হয়ে গেছে লোকসানের কারণে। যেগুলো টিকে আছে, তারও বেশিরভাগের অবস্থা নিভু নিভু। উপরন্তু দেশে পরিবেশবান্ধব শিল্পের সংখ্যা খুব কম। অধিকাংশ শিল্প কারখানা আবাসিক এলাকায়। নির্যাতন, চাকরি স্থায়ীকরণ না করা, মজুরি কম, যখন তখন ছাঁটাই, অধিকার প্রতিষ্ঠা না করা, বেতন-ভাতা অনিয়মিত ইত্যাদি কারণে শ্রমিক অসন্তোষ সার্বক্ষণিক বিরাজ করে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানে। অক্সফামের ‘দ্য কমিটমেন্ট টু রিডিউসিং ইনইক্যুয়ালিটি (সিআরআই) ইনডেক্স-২০২৪ মতে, ১৬৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শ্রমনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১৬১তম ও শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় ১৫৫তম। অপরদিকে, দেশের অধিকাংশ শিল্পের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা কম। ফলে দেশ বিদেশি পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। দেশের শিল্পের এই করুণ অবস্থার জন্য নানা কারণ রয়েছে, যার অন্যতম হচ্ছে- পরিচালনায় অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতা, দুর্নীতি, অপচয়, দক্ষ লোকের ঘাটতি, সেকেলে মেশিনপত্র, ওয়ার্ক প্রোডাকটিভিটি কম, রাজনীতি-দলবাজি ইত্যাদি। এসব অবস্থা সরকারি প্রতিষ্ঠানেই বেশি। বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের অবস্থা সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে একটু ভালো। কিন্তু বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো যথেষ্ট নয়। তাই দেশে শিল্প হিসাবে কোনমতে টিকে আছে মূলত এসএমই তথা কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। সেখানের কর্মসংস্থানের সংখ্যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ। উপরন্তু জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ (শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান ৫০ শতাংশের বেশি)। দেশের শিল্পের দ্বিতীয় অন্যতম হচ্ছে- গার্মেন্ট। তারও সব কাঁচামাল আমদানিকৃত। এখানের কাজ শুধুমাত্র কাটা ও সেলাই করা তথা দর্জিগিরি। তাই গার্মেন্টকে শিল্প বললে অত্যুক্তি হবে। তবুও গার্মেন্ট দেশের প্রধান শ্রমঘন খাত। এই খাতে ৪০ লাখের অধিক শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। যার অধিকাংশই প্রান্তিক নারী। গার্মেন্ট বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও প্রধান খাত। এই খাতে হাইকোয়ালিটির কাজ করতে পারলে আয়-উন্নতি আরো অনেক বেশি হতো। অবশ্য বাংলাদেশ গরিব দেশ হিসাবে পশ্চিমা দেশের জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু দেশ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হলে সে সুবিধা থাকবে না। তখন দেশের গার্মেন্টখাত গভীর সংকটে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে প-িতদের অভিমত। দ্বিতীয়ত পশ্চিমারা এখন আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে শ্রমিকবান্ধব হিসাবে দেখছে। তাই এই বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
যা’হোক, দেশকে স্বল্পদিনের মধ্যেই কাক্সিক্ষত সার্বিক উন্নতি করতে হবে। সে জন্য শিল্পোন্নয়ন এবং সব পণ্যকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করা আবশ্যক। কিন্তু দেশের শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য পণ্যের মান ও মূল্য বিশ্বমানের করতে হবে। সে জন্য সব শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক করতে হবে। উপরন্তু সব প্রতিষ্ঠানে সাধ্য মতো অটোমেশন ও প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। সব প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতি ও অপচয় মুক্ত এবং পরিবেশ ও শ্রমিকবান্ধব করতে হবে। এটা হলে শ্রমিক অসন্তোষ দূর হবে। শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। উপরন্তু উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য সব শ্রমিকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দরকার। দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা এবং লাভজনক করার ক্ষেত্রে শ্রমিকদেরও গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত: প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য পরিচালনা পর্ষদের একটি পদে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখতে পারলে প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ হবে। দেশের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে দেশে উৎপাদিত কাঁচামালভিত্তিক পণ্যের শিল্পকে প্রাধান্য দিতে হবে।যেমন: পাট, চামড়া, চা ইত্যাদি। কারণ, এটা করা হলে উভয় ক্ষেত্রে লাভ হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
sardarsiraj1955@gmail.com
বিভাগ : সম্পাদকীয়
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন

মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মৃত্যু

ড. ইউনূস-মোদির বৈঠকে ‘আশার আলো’ দেখছেন মির্জা ফখরুল

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক গ্রেফতার

তারেক রহমানের মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা

ড. ইউনূসকে ‘বস’ ডেকে যা বললেন উপদেষ্টা আসিফ

গণপিটুনিতে নিহত খুনে অভিযুক্ত, বাঁচাতে যেয়ে আহত ৬ পুলিশ

চিকেন’স নেক নিয়ে আতঙ্কে ভারত, নিরাপত্তা জোরদার

মরহুম আতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তঃব্যাচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা

ড. ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল : মির্জা আব্বাস

জকিগঞ্জে অটোরিকশা চালককে মারধর করে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

বিএনপি কারো উপর নির্যাতন করতে চায় না' : শামা ওবায়েদ

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

থাইল্যান্ড থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা