কম্প্রোমাইজড রিপাবলিক থেকে সেকেন্ড রিপাবলিকের অনিবার্য বাস্তবতা
১২ মার্চ ২০২৫, ১২:৩২ এএম | আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৫, ১২:৩২ এএম

বাংলাদেশ আজ এক গভীর খাদের ভেতর থেকে উত্থানের ক্লেশ ও যন্ত্রণার দ্বারা আক্রান্ত। লাখো প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের কেউ কেউ ‘এক্সিডেন্টাল’ বা ঘটনাক্রমে সংঘটিত গৃহযুদ্ধের ফল হিসেবে দেখেছেন। অপ্রতুল হলেও সে ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যে কিছু গবেষণা এবং সিদ্ধান্ত উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সে সব বিষয়ে বিশদ আলোচনা, গবেষণা ও প্রচারের সুযোগ এতদিন ছিল না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে একজন অখ্যাত মেজরের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে ৯ মাসে যে মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ের পরিনতি লাভ করেছিল ১৬ ডিসেম্বর দুইপক্ষের সমঝোতার মধ্য দিয়ে তা কম্প্রোমাইজড হয়ে গিয়েছিল কিনা সে প্রশ্ন শুরু থেকেই ছিল। বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থা এবং জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক ও বঞ্চনার নতুন ইতিহাস পুরো জাতিকে একটি সামাজিক-রাজনৈতিক ট্রমার মধ্যে নিক্ষেপ করেছিল। শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল তা দেশের ৯০ ভাগ মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছিল। তবে এর জন্যও তেমন কোনো প্রস্তুতি না থাকা, জিয়াউর রহমানের হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে সেই নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনাকেও সামরিক স্বৈরাচারের শেকলে বন্দি করা হয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, শেখ পরিবারের হাত ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মূলত ভারতীয় স্বার্থ রক্ষার এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে। এটাও প্রমাণিত হয়েছে, ভারতীয়দের বিদেশ নীতি খুব দুর্বল ও সময়ের সাথে তাল মিলাতে অক্ষম ও অকার্যকর। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের আগের অবস্থা এবং এর সম্ভাব্য পরিনতি সম্পর্কে ভারতের পক্ষ থেকে কী ভূমিকা ছিল, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক মৃত্যু এবং বয়োলজিক্যাল মৃত্যুর জন্য তাদের কোনো দায় ছিল কিনা এ প্রশ্ন কি শেখ পরিবার বা আওয়ামী লীগের তরফ থেকে কখনো করা হয়েছিল? বশংবদ শেখ মুজিবের মৃত্যুর ধকল কাটিয়ে বাংলাদেশে আরেকটি ভারত অনুগত স্থিতিশীল রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে তাদের ২১ বছর সময় লেগেছিল। মাঝখানে ১৯৭৫-৮১ সাল ভারতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ওরিয়েন্টেশন, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, জিয়া হত্যাকা-, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ সমর্থনে আট বছরের এরশাদীয় সামরিক স্বৈরশাসন, তিন জোটের রূপরেখা লঙ্ঘন করে গণতান্ত্রিক অবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি, লগি-বৈঠার তা-বের মধ্য দিয়ে সেনা সমর্থিত এক-এগারো সরকারের কারসাজি এবং ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়ে তাকে চিরস্থায়ী ফ্যাসিবাদী শাসকে পরিনত করার যাবতীয় কর্মকা-ের নেপথ্যের শক্তি হিসেবে ভারতের সাউথ ব্লককে মূল পরিচালকের ভূমিকায় দেখা গেছে। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাকে কেউ সরাতে পারবেনা। অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে তিনি তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। নবম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল ভারতের পরিচালনায় মেকি গণতন্ত্রের লোক দেখানো মহড়া মাত্র। পরিকল্পনা এমনভাবে এগিয়েছিল, গুম-খুন, গণগ্রেফতার, পিলখানা-শাপলা চত্ত্বরের মত সামরিক-রাজনৈতিক ম্যাসাকার, মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের তকমা লাগিয়ে ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশের সব আভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ শক্তিকে ধ্বংস করে দিয়ে এখানে নিরঙ্কুশ ভারতীয় কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার শেষ ধাপে পৌঁছেছিল।
তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহর জানবাজ সংগ্রাম ও শতবর্ষে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের হাজারো শহীদের অনুপ্রেরণা উদ্দীপ্ত এই জনপদের মানুষের ইমানী চেতনা সম্পর্কে ওদের সঠিক ধারণা থাকলে তারা কখনো কনস্পিরেসি করে এ জনপদের মানুষকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করতো না। ইংরেজরা এক সময় পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ইতিবাচক নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হলেও ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরা কখনো আমাদের স্বাধীনতা কিংবা সমৃদ্ধির সম্ভাবনাকে মেনে নেয়নি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, সাতচল্লিশের বাংলাভাগ একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে ভারতীয়দের আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সম্পর্কে এ দেশের মানুষের মধ্যে যে বঞ্চনাবোধের জন্ম হয়েছিল, তা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে একটি বিস্ফোরক-বিপ্লবী জনমতে পরিনত হয়েছিল। সে বিস্ফোরক জনমতকে দাবিয়ে কিংবা নি:শেষ করে দিতে ভারত শেখ হাসিনাকে শিখ-ী হিসেবে ব্যবহার করেছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের সিমলা চুক্তির দ্বারা কম্প্রোমাইজড হয়েছিল। অর্থাৎ এক সমুদ্র রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একাত্তুরের মহান স্বাধীনতা বা বাংলাদেশের প্রথম বিপ্লব কিংবা রিপাবলিক বেহাত অথবা ব্যর্থ হয়েছিল। শেখ মুজিবের বাকশাল ছিল সেই পতনের কফিনের শেষ পেরেক। জিয়াউর রহমানের মত মহান দেশপ্রেমিক সাহসী যোদ্ধা আবারো জাতির নেতৃত্বে আসীন হওয়ার পরও সে রিপাবলিকের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়নি। জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ কিংবা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ওঠার সব দরজা রুদ্ধ করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা শুধুমাত্র একটি গণঅভ্যুত্থানকেই অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিলেন। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিক্রমায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি অনিবার্য বাস্তবতা। এর মধ্য দিয়ে আবারো প্রমাণিত হয়েছে, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের অশুভ নেক্সাসের চেয়ে জনগণের ঐক্য অনেক বেশি শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ। অতএব আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি, পতিত স্বৈরাচার ও তাদের পলাতক দোসরদের এখন মূল এজেন্ডা হচ্ছে, বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্ন্তবর্তী সরকারের সংস্কারের এজেন্ডাকে ব্যর্থ করে দিতে যাবতীয় মাল-মসলার আঞ্জাম দেয়া এবং জুলাই বিপ্লবের শরীক রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক অংশীদারদের ঐক্যে ফাঁটল ও বিরোধ-বৈরিতা উস্কে দেয়া। কেউ কেউ বলছেন, জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে। প্রোক্লেমেশন বা বিপ্লবী সরকার গঠিত না হওয়ায় পুরনো বন্দোবস্তের সাথে এক ধরণের আপসরফা হয়ে গেছে। তবে বিপ্লবী ছাত্র-জনতা তার অবস্থান ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। এখনো তারা রাজপথে গ্রাফিতি এঁেক, ফ্যাসিবাদের আইকনিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে কিং বা রাজপথ কাঁপানো লাখো জনতার শ্লোগান তুলে জানান দিচ্ছে, আবু সাঈদ-মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ।
জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত অর্ন্তবর্তী সরকার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরে ব্যাপক আর্ন্তজাতিক সমর্থন লাভ করলেও প্রতিবেশী ভারত, পতিত স্বৈরাচারের পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত-অভাবনীয়ভাবে ১৬ বছরের আওয়ামী স্বৈরশাসনের সবচেয়ে প্রবল ভুক্তভোগী, গণঅভ্যুত্থানের অংশীদার রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। ছাত্র-জনতা শুরুতেই একটি প্রোক্লেমেশনের আওতায় ব্যাপক রাজনৈতিক সংস্কার, গুম-খুন, গণহত্যার বিচার এবং রাষ্ট্র মেরামতের এজেন্ডা ঘোষণা করতে চেয়েছিল। বিএনপি-জামায়াতের মত রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য না থাকায় ওরা হোঁচট খেয়েছে। তারা জাতীয় ঐক্যের প্রতি বেশি গুরুত্ব ও যতœশীল ছিল এখনো আছে, এটা খুবই ইতিবাচক বিষয়। বিকল্প রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে, সংস্কারের আগে, পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের অপতৎপরতা বন্ধ ও বিচারের আগে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার আগেই যেনতেন প্রকারে একটি জাতীয় নির্বাচন হলে তা সুষ্ঠুৃভাবে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা যেমন এখনো প্রশ্নবিদ্ধ, একইভাবে সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা অনুসারে রাষ্ট্র মেরামত ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন নিয়ে যথেষ্ট সংশয় দেখা দিয়েছে। বলা বাহুল্য, বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও দ্বিদলীয় রাজনৈতিক বৃত্ত মানুষের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অধিকার ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে বা রক্ষা করতে পারেনি। যেসব প্রত্যাশাকে সামনে রেখে একাত্তরে মানুষ অস্ত্র ধারণ করে জীবন দিয়েছিল, নূর হোসেন, ডাক্তার মিলনসহ আরো অনেকের জীবনের বিনিময়ে নব্বইয়ের জাতীয় ঐক্য ও গণআন্দোলনে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর সবকিছু ব্যর্থ করে দিয়ে দেশে আবারো ভারত সমর্থিত ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটেছিল, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতীয় আধিপত্যবাদের কণ্ঠস্বর অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রকট, বেশি সক্রিয় এবং বেপরোয়া ও সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর আঘাত করে চলেছে। এহেন বাস্তবতায় ভারতীয় আধিপত্য এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে ইস্পাত কঠিন ঐক্য নিয়ে অর্ন্তবর্তী সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে যৌক্তিক সময় সীমায় রোডম্যাপ অনুসারে নির্বাচন পর্যন্ত সংস্কার, বিচার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়ে দেশকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এগিয়ে নিতে কাজ করার বদলে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের পতিত স্বৈরাচারের রাজনৈতিক পুর্নবাসনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের বাস্তবতায় ছাত্র-জনতা নিজেদের একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায়নি। দেশ যখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সম্ভাবনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপি নতুন প্রজন্মের রক্তদানের এই ফসলকে ঘরে তুলতে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়ে অভিযোজনের চেষ্টা ও অর্ন্তবর্তী সরকারের পাশে ভ্যানগার্ডের দায়িত্ব পালন করলে তাই হতো তাদের জন্য মঙ্গলজনক। তা না করে সবাইকে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী গণ্য করে পতিত স্বৈরাচারের রেখে যাওয়ার ব্যবস্থার সাথে আপসমূলক অবস্থান ও দ্রুততম সময়ে নির্বাচনের দাবি তুলে যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় যাওয়ার উচ্চাকাক্সক্ষা নতুন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সম্ভাবনাকে আবারো বেহাত হওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এমনই আশঙ্কা সামনে রেখেই অভ্যুত্থানের ছাত্র-জনতা সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন রাজনৈদিক দল এনসিপি’র আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।
ছাত্র-জনতা ঘোষিত সেকেন্ড রিপাবলিক নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ একাত্তরের স্বাধীনতাকে অস্বীকার বলে আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছে। যে কোনো যুগান্তকারি নতুন ব্যবস্থা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসচেতনতা ও বিভ্রান্তি থাকা স্বাভাবিক হলেও দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা কিংবা দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ন্যূনতম মতৈক্য থাকা জরুরি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান যদি দ্বিতীয় রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রিপাবলিক ব্যর্থ হওয়ার কারণ ও প্রেক্ষাপটকেও সামনে রাখতে হবে। একাত্তরের স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। তৎকালীন মার্কিন সেক্রেটারি অফ স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার খুব তাচ্ছিল্যের সাথে বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বা তলাবিহীন ঝুড়ি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করতেই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। এর আগে পররাষ্ট্র নীতি, প্রতিরক্ষাসহ সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হতো দিল্লি থেকে। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত পার্লামেন্ট ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের যে দায়িত্ব পালন করেছিল তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। মূলত ৭২ সালের ত্রুটিপূর্ণ সংবিধান এবং পরবর্তীকালে শেখ মুজিবের হাতে সেই সংবিধানের স্বৈরতান্ত্রিক পোস্টমর্টেমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম রিপাবলিক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক চৌধুরী ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকীর লেখা একটি বইয়ের নাম ‘দ্যা কম্প্রোমাইজড রিপাবলিক’। ২০০৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থের প্রথম চ্যাপ্টারের শিরোনাম কনফ্রন্টিং দ্য এইলিং লেভিয়াথান (আহত দৈত্যের মুখোমুখি)। এইলিং লেভিয়াথান বলতে তিনি ভারতকে বুঝিয়েছেন। বাংলাদেশে ভারতের হেজিমনি বা আধিপত্যবাদী এজেন্ডা নিয়ে এখন যেসব আলাপ হচ্ছে, তার সবই বইয়ে বিশদভাবে উঠে এসেছে। সেখানে একজন মার্কিন ডিপ্লোম্যাটের দেয়া একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ওয়াজ ক্রিয়েটেড অলমোস্ট বাই এক্সিডেন্ট অ্যান্ড দেয়ারফোর উইদাউট অ্যানি এসেনশিয়াল রিকুইজিট অফ ইকোনমিক ভায়াবিলিটি অ্যান্ড দেয়ারফোর ফেইসেস অ্যা ফিউচার অফ ইনক্রিজিং মারজিনালাইজেশন লিডিং টু ইভেনচুয়াল ইক্সটিংশন...রেস্ট্রিক্টেট সভরেন্টি..। কি সাংঘাতিক চিত্র! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি একাডেমিতে দেয়া এই বক্তার নাম মি. জন পি. ডর্শনার, তিনি ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময়টা ছিল নাইন-ইলেভেন পরবর্তী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত ‘ওয়ার অন টেররিজম’র। যখন নতুন বিশ্ববাস্তবতার আলোকে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও বোঝাপাড়ার অধীনে ওয়াশিংটন বাংলাদেশকে দিল্লীর চোখে দেখতো। বাহাত্তর সাল থেকেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারতীয় হেজিমনির শিকার হলেও পশ্চিমাদের ইসলামোফোবিক যুদ্ধের কৌশলগত অংশীদার দিল্লী সরাসরি বাংলাদেশের উপর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দানবের মত চেপে বসেছিল।
এক-এগারোর দখলদারিত্ব এবং পরিকল্পিত উপায়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়ে মুজিব কাল্ট ও ডায়নেস্টি সৃষ্টি করে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আইডেন্টিটি গ্রাস করে এর সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নেয়ার ষোলকলা পূর্ণ এনেছিল। অনেক আগেই বেহাত হয়ে যাওয়া প্রথম রিপাবলিক নিয়ে মরহুম আহমদ ছফার মূল্যায়নকে উপজীব্য করে রাষ্ট্রচিন্তক সলিমুল্লাহ খানের লেখা গ্রন্থ বেহাত বিপ্লব ১৯৭১ এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এক চরম সন্ধিক্ষণে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ভারতীয় হেজিমনিক ব্যবস্থা লন্ডভ- করে বাংলাদেশকে অনিবার্যভাবে দ্বিতীয় রিপাবলিকের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা কেন্দ্রিক সংকীণর্তা ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রের সব বাংলাদেশপন্থি রাজনৈতিক পক্ষকে এক কাতারে এসে সত্যিকার অর্থে হেজিমনিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। ১৯৭১ এবং ২০২৪ এর শহীদদের স্বপ্ন ও রাষ্ট্রকাঠামো অভিন্ন। এ নিয়ে অহেতুক বিতর্কের সুযোগ নেই। আমাদের সন্তানরা রক্ত দিয়ে জাতির সামনে যে সুযোগ এনে দিয়েছে তা সংরক্ষিত করার অধিকার ও দায়িত্ব তাদের একার নয়। গুম-খুন, লুটপাট, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা পাচার ও রাষ্ট্র ধ্বংসের সীমাহীন ঔদ্ধত্বের বিচার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি হেজিমনিক এজেন্ডা নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার না হলে ভারতের ক্রীড়নক কোনো রাজনৈতিক দলকে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়া যাবে না। আমাদের দেশ থেকে বিচারহীনতা, ধর্মহীনতা, গণতন্ত্রহীনতা ও দু:শাসন-রক্তপাতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চির অবসান করতেই ছাত্র-জনতার রক্ত¯œাত নতুন বাংলাদেশে সেকেন্ড রিপাবলিকের বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশকে অস্থিতিশীল করে পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে ফিরে যাওয়ার যেকোনো প্রয়াস রুখে দেয়াই এবারের অভ্যুত্থানের সংকল্প। এই দেশে আগামী প্রজন্মকে যেন আরো কোনো ব্যর্থ অভ্যুত্থানের গল্প শুনিয়ে আবারো রক্ত ঝরাতে না হয়।
bari_zamal@yahoo.com
বিভাগ : সম্পাদকীয়
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন

মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মৃত্যু

ড. ইউনূস-মোদির বৈঠকে ‘আশার আলো’ দেখছেন মির্জা ফখরুল

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক গ্রেফতার

তারেক রহমানের মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা

ড. ইউনূসকে ‘বস’ ডেকে যা বললেন উপদেষ্টা আসিফ

গণপিটুনিতে নিহত খুনে অভিযুক্ত, বাঁচাতে যেয়ে আহত ৬ পুলিশ

চিকেন’স নেক নিয়ে আতঙ্কে ভারত, নিরাপত্তা জোরদার

মরহুম আতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তঃব্যাচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা

ড. ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল : মির্জা আব্বাস

জকিগঞ্জে অটোরিকশা চালককে মারধর করে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

বিএনপি কারো উপর নির্যাতন করতে চায় না' : শামা ওবায়েদ

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

থাইল্যান্ড থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা