ডিজইনফরমেশন ও মিডিয়া হাইপ মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে

Daily Inqilab জামালউদ্দিন বারী

১৯ মার্চ ২০২৫, ১২:০৪ এএম | আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৫, ১২:১৭ এএম

তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাধ প্রবাহের সুযোগে সংঘবদ্ধ সাইবারক্রাইম ও ডিজইনফরমেশন বা অপতথ্য ছড়িয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করা একটি সাধারণ ঘটনায় পরিনত হয়েছে। জুলাই-অগাস্ট বিপ্লবের পর বাংলাদেশে পতিত স্বৈরাচারের দোসর এবং ভারতীয় নেক্সাস বা সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ কোনো অপতথ্য ছড়িয়ে সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সে ধারা এখনো বন্ধ হয়নি। নিত্য নতুন ইস্যু ও ফর্মুলায় তাদের সাইবার ক্যাম্পেইন চলছেই। শেখ হাসিনার মাফিয়াতন্ত্রের লেসপেন্সার, অলিগার্কসহ হাজার হাজার নেতাকর্মী পালিয়ে গেলেও তাদের লাখ লাখ দোসর, কর্মী-সমর্থক ও সুবিধাভোগী এখনো বহালতবিয়তে আছে। শেখ হাসিনা মাঝে মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্কিত, উস্কানিমূলক বক্তব্য ও নির্দেশনা দিয়ে এসব পলাতক নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করছেন। এর ফলে এসব গোবর-গণেশ নেতাকর্মীরা অতীতের সব অপকর্মের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে তাদের নেত্রির ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণের দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। যদিও শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা আর কখনো বাংলাদেশে ফিরে আসা কিংবা রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারছেননা। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরের দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় বলেছিলেন, তার মা বা তার পরিবার আর কখনো বাংলাদেশে ফিরবে না, বাংলাদেশের রাজনীতি সেখানকার মানুষ বুঝবে। পরে অবশ্য তিনি তার বক্তব্য ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তার মা পদত্যাগ করেননি, তিনি এখনো বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। বলাবাহুল্য, সজিব ওয়াজেদ কিংবা শেখ হাসিনা এখন যে সব কথা বলছেন তা তাদের ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় মত বা সিদ্ধান্তের কোনো বহি:প্রকাশ নয়। এগুলো ভারতের বাংলাদেশ বিরোধী ডিস্ট্যাবিলাইজেশন (অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে অর্ন্তবর্তী সরকারকে সরিয়ে দেয়া) প্রোগ্রামের অংশ। আর তাদের ডিস্ট্যাবিলাইজেশন প্রোগ্রামের মূল অস্ত্রই হচ্ছে ডিজইনফরমেশন, ফেইক নিউজ ও ভ্রান্ত ন্যারেটিভ ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও বিভক্তি সৃষ্টি করা। জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর ভারতের হিন্দুত্ববাদী মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলোর পাশাপাশি বেশকিছু সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম একের পর এক এমন সব ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক বিষয় নিয়ে মাঠ গরম করতে চেয়েছে যা, বাংলাদেশের কোনো পক্ষেই ন্যুনতম সমর্থন পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের উস্কানিতে ভারতের ভিসা বন্ধ হয়েছে, বাংলাদেশে দূতাবাসে হামলা হয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয়দের লংমার্চ হয়েছে, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও ফেনি দখল করে নেয়ার হুমকির জবাবে প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তারা কলকাতা দখল করে নেয়ার হুমকিও দিয়েছে। অর্থাৎ লড়াইটা এখন আর একপাক্ষিক নয়। পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। বাংলাদেশকে শায়েস্তা করতে ভারত ডাম্বুর বাঁধ খুলে দিয়ে নোয়াখালি, ফেনী, কুমিল্লা বন্যায় তলিয়ে দিয়েছে, চিকিৎসা ভিসা বন্ধ করেছে, পেঁয়াজ-আলু, চাল-ডাল রফতানি বন্ধ করে এখানে দুর্ভীক্ষ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। তবে ভারতের এসব পদক্ষেপ তাদের জন্য বুমেরাং এবং বাংলাদেশের জন্য শাপে বর হয়েছে। গত এক দশকের মধ্যে রমজান মাসে বাংলাদেশের বাজারে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইছে। পেঁয়াজ ও আলুর দাম গত বছরের তুলনায় তিনভাগের একভাগ। হাসিনা রেজিমের অর্থপাচারে ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ডলারের উচ্চমূল্যের প্রেক্ষাপটে চাল-ডাল, তেল-চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠতে পারত। অর্ন্তবর্তী সরকারের সতর্ক অবস্থান সিন্ডিকেটেড কারসাজির লাগাম টেনে ধরায় বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। বাংলাদেশে পণ্য পাঠানো এবং অঘোষিতভাবে যখন তখন শুল্কবৃদ্ধি ও রফতানি স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে একেকটি পণ্যের কৃত্রিম সংকট কিংবা প্যানিক সৃষ্টি করে রাতারাতি হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার মূল অংশীদার ছিল ভারতীয় মধ্যস্বত্বভোগিরা।

ডিজইনফরমেশন ক্যাম্পেইন বা মিথ্যা ও ফেইক নিউজ প্রচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক জরিপে ভারত বিশ্বে প্রথম স্থান লাভ করেছে। রিউমার স্ক্যানার টিমের একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, গত বছরের ১২ আগস্ট থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতের প্রপাগান্ডা মিডিয়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি মিথ্যা-বানোয়াট সংবাদ প্রচার করেছে। রিপাবলিক বাংলা নামের একটি টিভি চ্যানেল এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এ গ্রুপে ৪৯টি মিডিয়া আউটলেটের নাম এসেছে। হিন্দুস্তান টাইমস, জি নিউজ, ইন্ডিয়া টুডে, এপিবি আনন্দ, আজতক প্রভৃতি গণমাধ্যমে প্রচারিত ভুয়া সংবাদ বাংলাদেশে হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে এবং ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতি বাংলাদেশিদের আস্থা ও বিশ্বাস শুণ্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বিদের উপর কথিত নির্যাতন, বাড়িঘর ও মন্দির ধ্বংসের ভুয়া সংবাদের এক শতাংশও সঠিক নয়। তবে হাসিনার সহযোগী ও অলিগার্কদের মধ্যে কিছু হিন্দুও ছিল। গণভবন থেকে শুরু করে হাসিনার দোসরদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে, একইভাবে হাসিনার দোসর হিন্দুরাও আক্রমনের টার্গেট হয়েছে এবং তারা পালিয়েছে। একে সাম্প্রদায়িক রং লাগিয়ে প্রচার করে বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তী সরকারের উপর ভারতের চাপ সৃষ্টির কৌশল কোনো কাজে আসেনি। উপরন্তু বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার ভারত বিরোধী ঐক্য আরো সংহত ও মজবুত হয়েছে। গত দেড় যুগে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা রেজিম আব্রাহাম লিঙ্কনের দেয়ার গণতন্ত্রের আধুনিক সংজ্ঞা পাল্টে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ামক হয়ে উঠেছিল ভারত দ্বারা নির্ধারিত, ভারতের জন্য ও ভারতীয় স্বার্থে পরিচালিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডা। শেখ হাসিনার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে দেড়যুগে পিলখানা ম্যাসাকার থেকে শুরু করে শাপলা চত্ত্বর গণহত্যা, হাজার হাজার মানুষকে গুম-খুন, লাখ লাখ মানুষকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি, আন্দোলন দমাতে ও শেখ হাসিনার পতন ঠেকাতে হাজার হাজার মানুষকে রাজপথে গুলি করে হত্যার মাস্টারমাইন্ড ও পরিচালক হিসেবে ভারতীয় এজেন্ট ও অপারেটিভরাই সন্দেহের শীর্ষে। ক্যাঙ্গারু কোর্টে বিচারের প্রহসন সাজিয়ে ঢাকার আদালত পাড়া থেকে তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষি দিতে আসা সুখরঞ্জন বালিকে অপহরণ করে ভারতের জেলে অন্তরীণ রাখার দৃষ্টান্ত থেকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশ স্পষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশে গুম হওয়ার প্রায় এক দশক পর বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারত থেকে দেশে ফিরে এসেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের পরে। শেখ হাসিনার রিজিম দেশটাকে ভারতীয় হেজিমনির লীলাভূমিতে পরিনত করেছিল। সেই হেজিমনির মূল অস্ত্র ছিল জাতিকে বিভক্ত ও বৈরীতায় ঠেলে দিতে মুজিবীয় কাল্টের ভুয়া ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করা। প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যসূচি থেকে ইসলামের শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পৃক্ত বিষয়গুলো ছেঁটে দিয়ে সেক্যুলারিজম ও মুজিবীয় কাল্টের ন্যারেটিভ প্রচারিত হয়েছিল জাতির নতুন প্রজন্মের মগজ ধোলাইয়ের কৌশল হিসেবে। যে প্রজন্মকে জাতির প্রকৃত ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলিয়ে দিয়ে শেখ পরিবারের বন্দনায় মাতিয়ে রাখতে চেয়েছিল, সেই জেন-জি প্রজন্মই নিজেদের জীবন বাজি রেখে, রাজপথে আত্মাহুতি দিয়ে, শেখ হাসিনা রেজিমের পতন ঘটিয়ে দেশকে ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্ত করে নতুন স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। তাদের মগজধোলাই প্রকল্প পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সমাজ বাস্তবতার বাইরে গিয়ে হাসিনার ন্যারেটিভ যেমন কাজ করেনি, একইভাবে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ভারতীয় মিডিয়া এবং আওয়ামী দোসরদের ডিজইনফরমেশন ক্যাম্পেইনও তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সমৃদ্ধি-নিরাপত্তা ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রধান প্রতিপক্ষ ভারত। অনৈক্য ও প্রতিহিংসা পরায়ণ রাজনৈতিক বিভক্তিকে জিইয়ে রাখতে ভারতীয় মিডিয়া ও সফ্ট পাওয়ার ফ্যাসিবাদী ন্যারেটিভ প্রচারে বিনিয়োগ করেছে। সত্তুরের দশক থেকে ভারতীয় হেজিমনিক প্রপাগান্ডা এজেন্ডা ক্রমাগত ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে সে সব ভুল ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাস্তবানুগ পথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নিতে পারেনি। বরং ভুলের পথে অবিচল থেকে আরো বেপরোয়া হয়ে বাংলাদেশকে ডিরেইল ও ডিস্ট্যাবিলাইজ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর তাদের বাংলাদেশ বিরোধী ডিজইনফরমেশন ক্যাম্পেইন বিশ্বের কাছে উলঙ্গভাবে ধরা পড়েছে। তাদের মিথ্যা সংবাদের হেডিং ট্রাম্পের বিজয়ের পর ড. ইউনূসের প্যারিসে পালিয়ে যাওয়া, ড. ইউনূস আইসিইউতে ভর্তি, পাকিস্তানি জাহাজে অস্ত্র খালাস করা, চট্টগ্রাম আদালত পাড়ায় ইসকনকর্মীদের হাতে নিহত সাইফুল ইসলামকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী হিসেবে দেখিয়ে ভারতীয় মিডিয়ায় সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে এসব মিডিয়া বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে হাসির পাত্রে পরিনত হয়েছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ-জামানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার একটা সংবাদ ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যেখানে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর কিউএমজি (কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল) লে. জেনারেল ফজলুর রহমানকে সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টার দায়ে তার সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদেরকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অন্তরীণ রাখা হয়েছে, শীঘ্রই তাদের বিরুদ্ধে সামরিক আইনে বিচার করা হবে। ইউরেশিয়া রিভিউ অনলাইনে এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের লেখক আলেয়া শেখ ফ্যাক্ট চেকিং ফলাফল তুলে ধরে বলেন, তিনি এনএসআইসহ বিশ্বস্ত সূত্রে তথ্যাবলী চেক করে জেনেছেন, কথিত লে. জেনারেল (কিউএমজি) ফজলুর রহমান স্বাভাবিক স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছেন, এনএসআই অফিসারের তথ্য অনুসারে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে লে. জেনারেল ফজলুর রহমান ইফতারির জন্য তার শশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন। এ থেকে প্রমানীত হয় ফজলুর রহমানের বন্দি হওয়াসহ পুরো খবরটিই মিথ্যা। তার সাথে সেনাপ্রধানের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ট ও চমৎকার বলে অভিহিত করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা পরিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। আরেক সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনী এবং রাজনীতির বাইরের সব পক্ষের সাথে একটা ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন আর্মি চীফ ওয়াকার উজ-জামান। এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিশ্বাস না থাকলে তিনি সম্প্রতি বেশ কয়েকদিনের জন্য আফ্রিকা সফরে যেতে পারতেন না। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভারতীয় মিডিয়ার এসব অতিরঞ্জিত খবরের গল্পের পেছনে সে সেদেশের কোনো গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নেই। সম্প্রতি ভারতীয় সেনা প্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদী বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে বলে যে বক্তব্য গণমাধ্যমে দিয়েছেন, তা একটি দায়িত্বহীন রাজনৈতিক বক্তব্য। তারা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে হুমকি দিচ্ছে, চোখ রাঙাচ্ছে। তাদের বক্তব্যের সাথে বাস্তবের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এ কারণে তাদের সরকার, সেনাবাহিনী এবং গণমাধ্যমের ন্যারেটিভের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস খুবই ভঙ্গুর। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বরাবরই ভারতের স্বার্থ রক্ষার এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে। আর ভারতীয় কূটনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা, গণমাধ্যমসহ সফ্ট পাওয়ারের সোর্সগুলো সব সময়ই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করার মধ্য দিয়ে মূলত নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাসিলে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা ক্যাম্পেইন ও ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠায় লিপ্ত রয়েছে। এই ক্যামেইন একেক সময় একেক চেহারা, প্রবণতা ও বিস্তৃতি নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাংলাদেশের মিডিয়া গত ৫৪ বছরেও নিজেদের লক্ষ্য স্থির করতে পারেনি। জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার আত্মপরিচয় ও জাতিগত পরিসীমা নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতার নেপথ্যে রয়েছে ভারতীয় হেজিমনি এজেন্ডা।

জাতিকে স্পষ্টত বিভক্ত করে একটি পক্ষের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে তাদেরকে ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক লুন্ঠন এবং রাজনৈতিক-সাংষ্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই বিভক্তি- বৈরীতা বাড়িয়ে তোলার মূল কারণ। গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমের অবশিষ্ট সবটুকু বিলীন করা হয়েছে। ভারতীয় বশংবদ শেখ হাসিনা তার প্রভুদের গাইডেন্সে একটি ফ্যাসিবাদী মিডিয়া এস্টাবলিশমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেছে। ভারতীয় কালচারাল হেজিমনিক এজেন্ডায় সাড়ে ৫ দশকে ধীরে এ অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জিয়া-এরশাদ বিএনপি জোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও কালচারাল হেজিমনি মোকাবেলায় কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার কিংবা হাসিনার মত মাফিয়া ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো সম্ভব হলেও আধিপত্যবাদের হেজিমনি এজেন্ডায় গড়ে ওঠা মিডিয়া এস্টাবলিশমেন্ট ও তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ন্যারেটিভ ও প্রপাগান্ডা মোকাবেলা করা সহজ নয়। বর্তমানে বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব এক ধরণের ভারসাম্য তৈরী করলেও বিভক্ত সমাজের একটি অংশের সাথে দেশিÑবিদেশি চক্রের ডিজইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের প্রভাব আপাতদৃষ্টে কিছুটা এগিয়ে থাকার সম্ভাব্যতা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। দু’একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরো পরিষ্কার হতে পারে; সম্প্রতি মাগুরার এক ৮ বছরের মেয়ে তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বোনের শশুর ও দুলাভাইয়ের দ্বারা বলাৎকারের শিকার হলে তা ব্যাপক মিডিয়া কভারেজসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বেশ কয়েকদিন ধরে এটি গণমাধ্যমে শীর্ষ সংবাদে পরিনত হয়। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা হয় মেয়েটির। সরকারের উপদেষ্টা মন্ডলি , বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গণের লোকজনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আছিয়ার ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা। অথচ প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, শেখ হাসিনার ১৬ বছরের রেজিমের শেষ ৬ বছরে দেশে ৪৩ হাজারের বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর মধ্যে ৭ হাজারের বেশি শিশু। হাসিনা আমলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতার ধর্ষণের সেঞ্চুরিকে সেলিব্রেট করা হয়েছিল। রাতের ভোটের নির্বাচন হিসেবে খ্যাত ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে নোয়াখালির সুবর্ণচরে ধানের শীষে ভোট দেয়ার অপরাধে ৪ সন্তানের জননীকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ১০-১২ জন মিলে গ্যাং-রেইপ করার খবরটি শুধুমাত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল, ব্যস এটুকুই। এরপর গত ৬ বছরে ৭ হাজারের বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হলেও তা নিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের মিডিয়া এস্টাবলিশমেন্টের কোনো গরজ দেখা যায়নি।

অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে মাগুরার আছিয়া ধর্ষিত হওয়ার ঘটনাকে পুঁজি করে যে মিডিয়া হাইপ সৃষ্টি করা হয়েছিল তা ছিল একটি অর্কেস্ট্রেড প্রপাগান্ডা। বিষয়টা এমন স্পর্শকাতর ছিল যে, পুরো জাতিতে আবেগে ভাসিয়ে দিয়ে ড.ইউনূস সরকারের গোষ্ঠি উদ্ধারের ধারাবাহিক প্রচারনায় দেশের নেটিজেনরা বুঝে-নাবুঝে যোগ দিয়েছে। ধর্ষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নামে শাহবাগে সরকারি বিরোধী মঞ্চ তৈরীর চেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন অভিমুখে প্রতিবাদ -বিক্ষোভের নামে পুলিশের উপর আক্রমণ করে একটা মোমেন্টাম সৃষ্টির অপচেষ্টা দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকলে এমন ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে ১৯৯৫ সালের দুটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়, একটি হচ্ছে মার্চ মাসে চাপাই নবাবগঞ্জে সারের জন্য কৃষকদের বিক্ষোভ দমাতে পুলিশের গুলিবর্ষণে ১২ কৃষক হত্যা এবং অন্যটি হচ্ছে , আগস্ট মাসে দিনাজপুরে ইয়াসমিন নামের এক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা। তিন পুলিশ সদস্যের দ্বারা ইয়াসমিন ধর্ষিত ও হত্যার শিকার হওয়ার পর এ ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে বিএনপি সরকারের মসনদ কাঁপিয়ে দেয়া হয়েছিল। পুলিশ কার্ফিউ জারি করলেও বিক্ষুব্ধ জনতা (মূলত আওয়ামী লীগ)থানায় আক্রমণ করে তা-ব সৃষ্টি করেছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিক্ষুব্ধ জনতার উপর বিডিআর গুলি চালিয়েছিল। গত ১৬ বছরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে গুম-খুন, হেলমেট বাহিনী, ছাত্রলীগের দ্বারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাঙ্গণে অসংখ্য শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ ধর্ষণ-নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের শিকার হলেও এসব ঘটনা শেখ হাসিনার আসনে এতটুকু কাঁপণ ধরাতে পারেনি। কারণ দেশের মানুষ রাজপথে দাঁড়াতেই পারতো না। গণমাধ্যমের উপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং নিবর্তনমূলক আইসিটি আইনের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব নিয়ে পোষ্ট দিলেই পুলিশি নির্যাতনের শিকার হওয়ার ব্যবস্থা। আছিয়ার মৃত্যুর ঘটনা যেন শেখ হাসিনার আমলের হাজার হাজার শিশু ধর্ষণের চেয়ে বড় অপরাধ। সংঘবদ্ধ মিডিয়া ক্যাম্পেইন এবং ঘাপটি মেরে থাকা স্বৈরাচারের দোসররা অনাকাঙ্খিত যে কোনো ঘটনা নিয়ে পরিকল্পিত উপায়ে মিডিয়া হাইপ তৈরী করে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে মওকা খুঁজবে, এটাই স্বাভাবিক। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’য়ের নেপথ্য পরিচালনায় শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ ছিল বিচারিক হত্যাকান্ড ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের উত্থানের অনুঘটক। শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও অবস্থা এখনো বদলায়নি। গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে এমন বল্গাহীন অবস্থায় রেখে দেশে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব।

bari_zamal@yahoo.com


বিভাগ : সম্পাদকীয়


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

টিসিবির পণ্য পেতে মানুষের ভোগান্তি
ইসলামী আর্থিক ব্যবস্থার আইনি কাঠামো প্রয়োজন
বিএনপি এখন কি করবে
ট্রাম্পের শুল্ক নীতি : বাংলাদেশকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে
মোবাইল হতে শিশুদের দূরে রাখুন
আরও
X

আরও পড়ুন

মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মৃত্যু

মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মৃত্যু

ড. ইউনূস-মোদির বৈঠকে ‘আশার আলো’ দেখছেন মির্জা ফখরুল

ড. ইউনূস-মোদির বৈঠকে ‘আশার আলো’ দেখছেন মির্জা ফখরুল

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক গ্রেফতার

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক গ্রেফতার

তারেক রহমানের মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা

তারেক রহমানের মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা

ড. ইউনূসকে ‘বস’ ডেকে যা বললেন উপদেষ্টা আসিফ

ড. ইউনূসকে ‘বস’ ডেকে যা বললেন উপদেষ্টা আসিফ

গণপিটুনিতে নিহত খুনে অভিযুক্ত, বাঁচাতে যেয়ে আহত ৬ পুলিশ

গণপিটুনিতে নিহত খুনে অভিযুক্ত, বাঁচাতে যেয়ে আহত ৬ পুলিশ

চিকেন’স নেক নিয়ে আতঙ্কে ভারত, নিরাপত্তা জোরদার

চিকেন’স নেক নিয়ে আতঙ্কে ভারত, নিরাপত্তা জোরদার

মরহুম আতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তঃব্যাচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা

মরহুম আতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তঃব্যাচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা

ড. ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল : মির্জা আব্বাস

ড. ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল : মির্জা আব্বাস

জকিগঞ্জে অটোরিকশা চালককে মারধর করে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

জকিগঞ্জে অটোরিকশা চালককে মারধর করে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

বিএনপি কারো উপর নির্যাতন করতে চায় না' : শামা ওবায়েদ

বিএনপি কারো উপর নির্যাতন করতে চায় না' : শামা ওবায়েদ

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

ইশার নামাজের সাথে সাথে বিতির নামাজ না পড়া প্রসঙ্গে?

থাইল্যান্ড থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

থাইল্যান্ড থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মানুষ ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করেছে: আবদুল হালিম

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

মুসল্লিদের বাধায় নাটক মঞ্চায়ন বাতিলের সংবাদ বিভ্রান্তিকর

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

কারো চোখ রাঙানী আর মেনে নেয়া হবে না-সারজিস আলম

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কানাডার অধিনায়ক

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

অবিলম্বে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিতে হবে -আমান উল্লাহ আমান

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা

ফটিকছড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, লাইফ সাপোর্টে মা