সভ্যতার সংঘাত, গাজা গণহত্যা ও আল কুদসের মুক্তি

Daily Inqilab জামালউদ্দিন বারী

২৭ মার্চ ২০২৫, ১২:০২ এএম | আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২৫, ১২:০২ এএম

যুদ্ধবিরতীর শর্ত ভেঙ্গে গাজায় ইসরাইলী গণহত্যা নতুন মাত্রায় উপনীত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা অর্ধলক্ষ অতিক্রম করেছে। নির্বিচার বোমা হামলায় একরাতে শত শত ফিলিস্তিনি শিশু ও নারীদের হত্যার পর ইয়েমেনের হুতি, গাজার আল কাসসাম ব্রিগেড ও লেবাননের হিজবুল্লাহ ও সরকারি বাহিনী সমান্তরালভাবে ইসরাইলে প্রত্যাঘাত শুরু করেছে। দখলদার জায়নবাদী ইসরাইলের ১৫ মাসব্যাপী বোমা হামলার ধ্বংসযজ্ঞ ও মৃত্যুর বিভীষিকা জয় করে হামাস ও গাজার নিপীড়িত জনগণ শত্রæর মুখে বিদ্রæপের ছাই দিয়ে অজেয় স্ফীংস পাখির মত টিকে থাকা গাজানদের প্রতি জায়নবাদী ইসরাইলীদের পৈশাচিক আক্রোশ এখন বিশ্বের সামনে উলঙ্গভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। সাড়ে ৭ দশক ধরে ইসরাইলের ক্রমাগত নিপীড়নকে ওরা সহ্য করে গেলেও আল আকসায় নামাজরত মুসল্লিদের উপর হামলা, পবিত্র মসজিদ প্রাঙ্গণে হানাদার বাহিনীর অনধিকার প্রবেশ এবং অবমাননা, ২০২৩ সালের রমজান মাসে আল আকসায় জায়ানবাদী দখলদারদের সীমাহীন বাড়াবাড়ি, অত:পর সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তৃতার ডায়াসে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মানচিত্র দেখিয়ে তিনি জর্ডান নদীর তীর থেকে পুরো ফিলিস্তিনসহ সিরিয়া ও মিশরের বিশাল এলাকা নিয়ে নতুন ইসরাইলের মিথলজিক্যাল প্রমিজ ল্যান্ডের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে নেতানিয়াহু প্রকাশ্য ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলার এজেন্ডা হাজির করেছিলেন। জায়নবাদিরা ইরানের সামরিক-বেসামরিক একাডেমিসিয়ান, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, সমরবিদদের টার্গেট কিলিং দীর্ঘদিন ধরেই চালিয়ে যাচ্ছে। বাগদাদ বিমান বন্দরে ড্রোন হামলা চালিয়ে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম তুখোড় সমরবিদ, ইরানের প্রতিরোধ যুদ্ধের অভাবনীয় অগ্রগতির অন্যতম কুশীলব-অনুঘটক জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার মধ্য ২০২০ সালেই ইসরাইল-আমেরিকা ইরানের রেডলাইন অতিক্রম করেছিল। বাগদাদে ও সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি বোমা হামলায় উড়িয়ে দিয়ে ইরান তাৎক্ষনিক জবাব দিলেও যথাসময়ে সুলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের প্রত্যয় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার তরফ থেকেই ঘোষিত হয়েছিল। গাজার উপর দেড় যুগের অবরোধ এবং আল আকসা নিয়ে জায়নবাদিদের নতুন ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগ্রামীদের একটি চুড়ান্ত আঘাতের দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য করেছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের অপারেশন আল আকসা ফ্লাড ছিল সেই চুড়ান্ত আঘাতের বহি:প্রকাশ। এরপর ১৫ মাস ধরে গাজার ঐতিহাসিক জনপদের উপর যা ঘটল তা নতুন ও বা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। গত ৭৭ বছর ধরে ওরা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভ’মির উপর দখলদারিত্ব সম্প্রসারিত করে চলেছে। ইঙ্গ-মার্কিন জায়নবাদি ষড়যন্ত্রের জুলুম-অন্যায়ের ধারাবাহিক তৎপরতায় মধ্যপ্রাচ্যের পেট্টোডলারে ধনী দেশগুলো যখন পশ্চিমা বশংবদ টোপ গিলে আল আকসার মুক্তি ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ইস্যুটিকে আরব সাগরে জলাঞ্জলি দিতে বসেছিল, তখনই অপারেশন আল আকসা ফ্লাড বিশ্বের নজর আবারো ইঙ্গ-মার্কিন ষড়যন্ত্রের পুরনো ইস্যুর দিকে নিবদ্ধ হলো। আশি হাজার টনের বেশি বোমা ফেলে পুরো গাজা উপত্যকাকে ধ্বংসস্তুপে পরিনত করার পরও ওরা একজন জিম্মিকেও মুক্ত করতে পারেনি। নজিরবিহিন স্থল অভিযান চালিয়েও হামাসের টানেল নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে পারেনি। অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে হত্যা লক্ষাধিক মানুষকে আহত করার পরও হামাসের প্রতিরোধ শক্তি এবং গাজার বেসামরিক নাগরিকদের মনোবলে চিড় ধরাতে পারেনি। অন্যদিকে লাখ লাখ ইহুদি ইসরাইল ছেড়ে ইউরোপ আমেরিকায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। মৃত্যুর বিভীষিকা মাথায় নিয়ে একটি ফিলিস্তিনি পরিবারও ভয়ে গাজা ত্যাগ করেনি। বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণ্য সন্ত্রাসি গণহত্যাকারী বাহিনীর নির্বিচার বোমা হামলায় মৃত্যুর ভয় উপেক্ষা করে নিজ দেশের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার নজির পুরো বিশ্বকে বিষ্ময়ে হতবাক করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদের অন্যতম এজেন্ডা হয়ে ওঠে সদ্য পতিত উসমানীয় খেলাফত ও আরব বিশ্বের যে কোনো ঐক্য ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্ভাবনাকে সমূলে নস্যাৎ করা। ফিলিস্তিনি আরবদের জমি দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল এটি। জেরুজালেম ও আল আকসার মত স্পর্শকাতর বিষয়ের সাথে স্থান-কাল নির্বিশেষ মুসলমানদের মধ্যে গভীর বিশ্বাসের সম্পর্ক থাকায় পশ্চিমা বশংবদ আরবরাও প্রকাশ্য ইসরাইল বিরোধী অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। সাতষট্টি সালের ৬ দিনের যুদ্ধে পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর, গোলান মালভূমি, সিনাই উপত্যকাসহ সিরিয়া, জর্ডান ও মিশরের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি এলাকা দখল করে নেয়ার পর পশ্চিমাদের মধ্যস্থতায় তা নিয়ে দুই দশক ধরে দর কষাকষি করে শান্তিচুক্তিতে উপনীত করা হলেও পূর্ব জেরুজালেম ও গোলান মালভূমিসহ দখলকৃত এলাকা ছেড়ে দিতে ইসরাইলকে বাধ্য করেনি পশ্চিমারা। এভাবেই বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর একটি ভূখন্ড জায়নবাদি ইসরাইলের দখলদারিত্বের অধীনে রেখে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব মুসলমানদের আবেগ-অনুভুতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদীরা জুয়া খেলছে। পশ্চিমাদের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বশংবদ দেশগুলো অসম মেকি বন্ধুত্ব টিকিয়ে রেখে তাদের ভূরাজনৈতিক কৌশলগত শর্তহীন বন্ধু ইসরাইলের আগ্রাসনের সাথে লড়াই করে জয়লাভ করা যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের সাথে পশ্চিমা সামরিক চুক্তি কিংবা সহায়তা এমন স্তরে কখনো পৌছবে না, যা ইসরাইলের নিরাপত্তা ও আগ্রাসি আধিপত্যের জন্য ন্যুনতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এবারের হামাসের প্রতিরোধ যুদ্ধের বিপরীতে আগের অন্তত চারটি আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পরিনতি তার সাক্ষ্য বহন করছে। সাতষট্টি সালের জুনমাসে ৬দিনের যুদ্ধে মিশর, সিরিয়া, জর্ডান, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সেনাবাহিনী, যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্কসহ সামরিক সক্ষমতা ইসরাইলের চেয়ে কয়েকগুন বেশি হওয়া সত্বেও সমন্বিত যুদ্ধ কৌশলের অভাবে আরব বাহিনী পরাজিত হয়। প্রতিটি যুদ্ধের শুরুতে এবং ইসরাইলের সুবিধাজনক সময়ে জাতিসংঘ ও পশ্চিমাদের যুদ্ধবিরতির নাটক ইসরাইলকে বিজয়ী হতে সহায়তা করেছে। হামাসের আল কাসসাম ব্রিগেডের অপারেশন আল আকসা ফ্ল্যাড এতটা গোপনীয় সামরিক কৌশলে শুরু হয়েছিল যে, যুদ্ধের প্রথম দুই ঘন্টায়ই হামাসের কাছে আইডিএফ’র শোচনীয় পরাজয় নিশ্চিত হয়েছিল। সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ এবং ইসরাইল থেকে ধরে নিয়ে আসা জিম্মিদের মুক্ত করতে গাজার উপর যে পরিমান বোমা বর্ষণ করা হয়েছে বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে তা নজির বিহিন। প্রচলিত বিমান বাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা বিহিন গাজায় ১৫ মাসে যে পরিমান বোমা হামলা করা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের ১০টি দেশেও এ পরিমান বোমা হামলা হয়নি। প্রথম দুইমাসে গাজায় ফেলা ইসরাইলী বোমার ধ্বংস শক্তি অন্তত চারটি পারমানবিক বোমার সমান বা তার চেয়ে বেশি ছিল বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গিয়েছিল। মার্কিন পারমানবিক বোমা হামলার পর জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকি শহরের কেন্দ্রস্থলে যে অবস্থা হয়েছিল, ১৫ মাস যুদ্ধের পর গাজায় তার চাইতে বেশি ধ্বংসস্তুপের সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করে শুধু ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়ে ইসরাইলের যুদ্ধ জয়ের স্বপ্ন এবার দু:স্বপ্নে পরিনত হয়েছে। একজন জিম্মিকেও হামাসের কবল থেকে মুক্ত করতে না পারা এবং প্রতিদিনই ইরান সমর্থিত হামাস-হিজবুল্লাহ ও হুতিদের রকেট ও ড্রোন হামলায় ইসরাইলের প্রতিটি জনপদে মৃত্যুর বিভীষিকা যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুকে হামাসের শর্ত মেনে যুদ্ধ বিরতি চুক্তিতে উপনীত হতে বাধ্য করেছে। চুক্তির পর নেতানিয়াহু সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রি, সেনাপ্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পদত্যাগই বলে দেয়, এ যুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক-রাজনৈতিক পরাজয় ঘটেছে। এর মধ্য দিয়ে এটিও প্রমানীত হয়েছে, পশ্চিমা সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল সম্মিলিত আরব বাহিনীর চেয়ে পশ্চিমা অবরোধের সম্মুখীন গাজা ও ইরানের আত্মনির্ভর সমরশক্তি ও ইমানি দৃঢ়তা ইসরাইলের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সক্ষম ও শক্তিশালী।

প্রথম মহাযুদ্ধে উসমানীয় খেলাফতের পতনের আগেই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যত নিয়ে পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও ভাগাভাগির মূল লক্ষ্যই ছিল জেরুজালেমের উপর দখলদারিত্ব কায়েম করা। দ্বাদশ শতকে দ্বিতীয় ক্রসেডে হিত্তিনের যুদ্ধে সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি খৃষ্টান ক্রুসেডারদের কাছ থেকে জেরুজালেম পুর্নদখল করেছিলেন। তার আগে সপ্তম শতকে মুসলমানরা খৃষ্টানদের কাছ থেকে জেরুজালেমের অধিকার বুঝে নিয়েছিলেন। মাঝখানে মাত্র আট দশক জেরুজালেম ক্রুসেডারদের দখলে থাকলেও সপ্তম শতক থেকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পর্যন্ত মুসলমানদের অধীনে থাকা ফিলিস্তিন ও জেরুজালেমে ইহুদি, খৃষ্টান ও মুসলমানরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রেখে চলেছিল। ক্রুসেড মানে সম্মিলিত ইউরোপীয় খৃষ্টান বাহিনীর সাথে স্পেনীয়-তুর্কি ও আরব সুলতানদের ধর্মযুদ্ধ। মুসলমানদের কাছ থেকে জেরুজালেম পুনর্দখলের লক্ষ্যেই ইউরোপীয়রা ঐক্যবদ্ধ হয়ে একাদশ শতকের শুরুতে ক্রুসেড শুরু করে শেষ পর্যন্ত শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয়েছিল। পশ্চিমারা ক্রুসেডের পরাজয় কখনো ভুলতে পারেনি। জেরুজালেমের মুক্তি ও ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান এ কারণেই সহজসাধ্য বিষয় নয়। জায়নবাদিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রশাসন, অর্থনীতি ও ইঙ্গ-মার্কিন ডিপস্টেট প্রতিকী অর্থে জেরুজালেমের উপর ইসরাইলী দখলদারিত্বকে সম্ভবত ক্রুসেডের পরাজয়ের পর একটি বিজয় হিসেবেই দেখে থাকে। কদাচিৎ মুখ ফসকে তাদের কন্ঠে ক্রুসেড শব্দটি বেরিয়ে আসতে শোনা যায়। ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে আততায়ী বিমান হামলার পর ঘটনার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে আল কায়েদাকে দায়ী করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ কার্যত মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘ক্রুসেড’ বা অন্তহীন যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। দুই দশক যুদ্ধ করে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল অর্থনীতির দেশ আফগানিস্তানে ন্যাটো ও মার্কিন বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রথম দফায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে শত শত কোটি ডলারের সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম তালেবানদের দখলে ছেড়ে দিয়ে রাতের অন্ধকারে চুপিসারে বিশেষ নিরাপত্তায় মার্কিনীরা আফগানিস্তান ত্যাগ করে। তিনি সম্ভবত রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের শুরু করা ক্রুসেডকে আবারো ফিলিস্তিন ও জেরুজালেমে নিবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। সেখানে ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সামর্থ্য পশ্চিমাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। ইসরাইলকে দিয়ে ইরানের প্রভাব-প্রতিপত্তি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এবার আমেরিকা সরাসরি সে চ্যালেঞ্জে অবতীর্ণ হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা দখল করে সেখানে প্রমোদ নগরী প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় প্রকাশের ঔদ্ধত্য আরবরা সমস্বরে প্রত্যাখ্যান করারর পর এখন মিশরের সিসি এবং বশংবদ কারো কারো কণ্ঠে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। তবে হামাস-হিজবুল্লাহসহ প্রতিরোধ যোদ্ধারা ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর স্বপ্নকে দু:স্বপ্নে পরিনত করতে সম্ভাব্য সবকিছু করতে প্রস্তুত রয়েছে।

ফিলিস্তিন ও জেরুজালেমের অধিকার নিয়ে পূর্ব-পশ্চিমের বিরোধ হাজার বছরের পুরনো। অটোমান সা¤্রাজ্যের পতনের পর এ নিয়ে মুসলমানরা কোনো ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। বিংশ শতকের রাজনৈতিক ইতিহাসে ইরানের ইসলামি বিপ্লব নি:সন্দেহে একটি বিপ্লবাত্মক সংযোজনা। ইসলামি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আল কুদস নিয়ে চিন্তার উন্মেষ ঘটে। ইসলামি বিপ্লবের নেতা, ইমাম খোমেনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও আল আকসার মুক্তির ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করেই এর প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনিই প্রথম রমজান মাসের শেষ শুক্রবার বিশ্বব্যাপী আল কুদস দিবস হিসেবে পালনের ডাক দেন। বিশ্বসম্প্রদায় তার সেই আহŸানকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করেছে। যুদ্ধে জায়নবাদিদের পরাজয়, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় নতুন করে গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয়কে সামনে রেখে এবার ভিন্ন এক মেজাজ ও তাৎপর্য ধারণ করে সারাবিশ্বে আল কুদস দিবস পালিত হবে। গাজা যুদ্ধে প্রমানিত হয়েছে, কথিত সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তির আস্ফালনই শেষ কথা নয়। পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক জায়নবাদি ইসরাইল অজেয় শক্তি নয়। ইঙ্গ-মার্কিন-জায়নবাদী ষড়যন্ত্র তাদের জন্য বুমেরাং হতে পারে। সেই ক্রসেডের যুগ থেকে অদ্যাবধি সভ্যতার সংঘাতের রূপরেখায় তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকে স্যামুয়েল হান্টিংটন যে সভ্যতার সংঘাতের ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন, ওয়ার অন টেররিজমের ছদ্মাবরণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছেন। সেই যুদ্ধের নীলনকশা মূলত মধ্যপ্রাচ্য, ইসরাইলের নিরাপত্তা ও সিরিয়া-ইরানের বিরুদ্ধে একটি পশ্চিমা নেক্সাস। ২০০৮ সালে প্রকাশিত বৃটিশ লেখক ও ফ্রি-ল্যান্সার সাংবাদিক জোনাথন কুকের (‘ইসরাইল অ্যান্ড দ্য ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন: ইরাক, ইরান অ্যান্ড দি প্ল্যান টু রিমেইক মিডল ইস্ট’) বইয়ে যে চিত্র প্রকাশিত হয়েছে তারই ধারাবাহিক তৎপরতার পরিনতি এখন গাজায় দেখা যাচ্ছে। ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইসলামি প্রতিরোধ শক্তির ইমানি দৃঢ়তা, মনোবল ও শহিদি তামান্না যে কোনো পরাশক্তিকে মোকাবেলা করতে সক্ষম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন থেকে যুদ্ধের খড়গ গুটিয়ে এনে ফিলিস্তিন ও ইরানে নিবদ্ধ করতে চাইছেন। বিশ্ব পরিস্থিতি ও শক্তির ভারসাম্য বদলে গেলেও তারা মানচিত্র বদলের পুরনো বøু প্রিন্ট থেকে সরে যায়নি। বলতে গেলে ফিলিস্তিন সংকটকে জটিল আবর্তে নিক্ষেপ করা ও গাজা যুদ্ধের পটভূমির মূল উদগাতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফিলিস্তিন ইসরাইল ইস্যুতে দ্বিরাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাধানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রæতি ও মধ্যস্থতাকারির ভূমিকা থেকে সরে গিয়ে তিনিই প্রথম জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সেখানে মার্কিন দূতাবাস স্থাপন করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তুলেছিলেন। তাঁর সেই অবস্থানকে পশ্চিমা মিত্ররাও সমর্থন করেনি। একইভাবে যুদ্ধ পরবর্তী গাজার পুর্নগঠন প্রশ্নে ট্রাম্পের দখলদারিত্ব ও মার্কিন মালিকানা প্রতিষ্ঠার খায়েশ সর্বমহলে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরপরও ট্রাম্পের পরিকল্পনায় পরিবর্তনের কোনো ঘোষণা আসেনি। একে তাদের কোনো তাৎক্ষণিক হঠকারি সিদ্ধান্ত বলে মনে করার কারণ নেই। ক্রুসেড, জেরুজালেম, আল আকসার প্রশ্নে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদীরা এখনো স্মৃতিকাতর। তবে ইহুদি ধর্মবিশ্বাসে তাদের রাষ্ট্রের আট দশকের স্টিগমা বা অভিশাপ বলে একটি প্রবল মত রয়েছে। সে হিসেবে আগামি ৩ বছরের মধ্যেই ইসরাইল রাষ্ট্রের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। মুসলমান বা ফিলিস্তিনিরা নয়, ইসরাইলীরাই আত্মঘাতি বর্বর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে এবং সে পথে অবিচল থাকার মধ্য দিয়ে নিজেদের সর্বাত্মক পরাজয় ডেকে এনেছে। তাদের নৈতিক পরাজয় ঘটে গেছে। বিশ্ব সম্প্রদায় জায়নবাদিদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। হাজার হাজার বছর আগে সভ্যতার সংঘাতে ইহুদিরা ফিলিস্তিন ও মিশর ত্যাগ করেছিল। এবারের যুদ্ধে দশলক্ষাধিক ইহুদি ইসরাইল ত্যাগ করেছে। মার্কিনীদের প্রেসক্রিপশনে তারা ইরানকে হুমকি দিচ্ছে। ইসরাইলের আগ্রাসন, দখলবাজি ও গণহত্যার বিরুদ্ধে ইরান সমর্থিত প্রতিরোধকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মোকাবেলা করতে চাইছে। আপাত দৃশ্যে এটি ইরানের সাথে যুদ্ধ বলে শিয়া-সুন্নি বিরোধ উস্কে দিতে চাইলেও আদতে এটি ক্রুসেডের ধারাবাহিকতা এবং জেরুজালেমের উপর দখলদারিত্ব চিরস্থায়ী করার মহাপরিকল্পনার অংশ। জায়নবাদীদের আরোপিত শিয়া-সুন্নি বিরোধ ভুলে এই যুদ্ধে মুসলমানদের ঐক্য না হলেও ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিজয় হবে। গাজা যুদ্ধে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে। এবার ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিনী পরিচালিত ইসরাইলী যুদ্ধ শুরু হলে ইসরাইলের পতনের মধ্য দিয়ে এবার ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও আল আকসার মুক্তি ঘটতে পারে। সেখানে আরবদের ঐক্য ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। এবার যারা পশ্চিমা এজেন্ডায় অনৈক্য, মোনাফেকি ও নিস্ক্রিয় ভূমিকায় থাকবে, তারাই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে।

bari_zamal@yahoo.com


বিভাগ : সম্পাদকীয়


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

মোবাইল হতে শিশুদের দূরে রাখুন
বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ
বৈশ্বিক বিভিন্ন সূচকে দেশচিত্র
নিউইয়র্ক টাইমসের বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন
নারীর নিরাপত্তা সংকট
আরও
X

আরও পড়ুন

হাসপাতাল বেডেই কেটেছে যাদের ঈদ!

হাসপাতাল বেডেই কেটেছে যাদের ঈদ!

পাবনায় ছুরিকাঘাতে যুবক খুন

পাবনায় ছুরিকাঘাতে যুবক খুন

আমেরিকান প্রবাসী দেশে এসে ডাকাতের কবলে

আমেরিকান প্রবাসী দেশে এসে ডাকাতের কবলে

সামাজিক বিরোধে প্রাণ গেল যুবকের

সামাজিক বিরোধে প্রাণ গেল যুবকের

ধূ-ধূ বালুচরে পরিণত তিস্তাঃ চরম হুমকির মুখে নদী তীরবর্তী জীববৈচিত্র

ধূ-ধূ বালুচরে পরিণত তিস্তাঃ চরম হুমকির মুখে নদী তীরবর্তী জীববৈচিত্র

কালীগঞ্জে বেদে পল্লীতে প্রতিপক্ষের হাতে যুবক খুন, আটক ১

কালীগঞ্জে বেদে পল্লীতে প্রতিপক্ষের হাতে যুবক খুন, আটক ১

মসজিদ গুলো শিরক ও বিদয়াত মুক্ত রাখা মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব -নাসির উদ্দিন মজুমদার

মসজিদ গুলো শিরক ও বিদয়াত মুক্ত রাখা মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব -নাসির উদ্দিন মজুমদার

দুর্নীতিবাজ টিউলিপের সাফাই দেয়ার চেষ্টা, কি বলছেন?

দুর্নীতিবাজ টিউলিপের সাফাই দেয়ার চেষ্টা, কি বলছেন?

থাইল্যান্ড পৌঁছেছেন প্রধান উপদেষ্টা, বিকালে ভাষণ

থাইল্যান্ড পৌঁছেছেন প্রধান উপদেষ্টা, বিকালে ভাষণ

এবারও বিশ্বের ধনীদের তালিকার শীর্ষে ইলন মাস্ক

এবারও বিশ্বের ধনীদের তালিকার শীর্ষে ইলন মাস্ক

বিমসটেক সমুদ্র পরিবহন চুক্তি সই, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক

বিমসটেক সমুদ্র পরিবহন চুক্তি সই, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় যা বলছেন বিশ্ব নেতারা

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় যা বলছেন বিশ্ব নেতারা

সিলেটে  নিষিদ্ধ  সংগঠন ছাত্রলীগের ৭ নেতা  গ্রেফতার

সিলেটে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ৭ নেতা গ্রেফতার

গাজীপুরে ট্রেনে আগুন, ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ

গাজীপুরে ট্রেনে আগুন, ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ

আবারও বিয়ের পিঁড়িতে শবনম ফারিয়া?

আবারও বিয়ের পিঁড়িতে শবনম ফারিয়া?

ঈদ আনন্দ মিছিলে মূর্তি প্রদর্শন, জামায়াত সেক্রেটারির নিন্দা

ঈদ আনন্দ মিছিলে মূর্তি প্রদর্শন, জামায়াত সেক্রেটারির নিন্দা

মিয়ানমারে ফের ভূমিকম্প, নিহত ছাড়াল ৩০০০

মিয়ানমারে ফের ভূমিকম্প, নিহত ছাড়াল ৩০০০

ভারতে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত, এক পাইলট নিহত

ভারতে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত, এক পাইলট নিহত

বাগেরহাটের উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করবে বিসিএস অফিসার্স ফোরাম

বাগেরহাটের উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করবে বিসিএস অফিসার্স ফোরাম

ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় সতর্ক না থাকলে আমাদের সকল অর্জন ব্যর্থ হবে: সেলিম উদ্দিন

ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় সতর্ক না থাকলে আমাদের সকল অর্জন ব্যর্থ হবে: সেলিম উদ্দিন