ছিনতাই আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার প্রকৃত কারণ
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম
রাজধানী ঢাকা এখন এক গভীর নিরাপত্তাহীন নগরীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতা খুললেই চোখে পড়ে ছিনতাই, ছিনতাইকারীর হাতে খুন, মোটরসাইকেল আরোহীর ব্যাগ টান দেওয়া কিংবা ছুরিকাঘাতের খবর। মোহাম্মদপুর, খিলক্ষেত, শেরে বাংলা নগরসহ রাজধানীর বেশ কিছু এলাকা এখন ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই এসব এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে থাকেন, রাস্তায় বের হতে দ্বিধাবোধ করেন। এই আতঙ্ক শুধু রাতের অন্ধকারেই সীমাবদ্ধ নয়, দিনের আলোতেও এখন মানুষ নিরাপদ বোধ করে না।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা এই সংকটের ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে। বগুড়া থেকে আগত এক স্কুলশিক্ষিকা চোখের চিকিৎসার জন্য ফার্মগেটের একটি চক্ষু হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। গাবতলী থেকে রিকশায় চড়ে যাত্রাপথে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এক মোটরসাইকেল আরোহী তার ব্যাগ টান দিলে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার পরও তাকে বাঁচানো যায়নি। একটি সাধারণ চিকিৎসা-যাত্রা কীভাবে মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিণত হলোÑ এই ঘটনা আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তোলে। প্রশ্ন জাগে, কেন এত ব্যাপকভাবে অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে, কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
অধিকাংশ বিশ্লেষণে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, মাদকাসক্তি, পুলিশি নজরদারির ঘাটতি, বিচারহীনতা কিংবা নগর-পরিকল্পনার দুর্বলতাকে ছিনতাই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব কারণ অস্বীকার করার উপায় নেইÑ এগুলো বাস্তব এবং সমাধানের দাবি রাখে। তবে আমাদের বিশ্বাস, এই সংকটের সবচেয়ে গভীর ও মৌলিক কারণ নিহিত আছে আরও বড় একটি জায়গায়Ñ আমাদের সামষ্টিক জীবনব্যবস্থার ভিত্তিভূমিতে।
আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার না করে, আল কুরআনকে সংবিধান হিসেবে গ্রহণ না করে, মানুষের তৈরি বিভিন্ন মতাদর্শ ও ব্যবস্থাকে জীবন পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে বেছে নিয়েছি। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে একমাত্র আদর্শ ও নেতা হিসেবে গ্রহণ না করে, সীমালঙ্ঘনকারী নেতৃত্বকে মেনে নিয়েছি। ইসলামকে আমরা একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ না করে কেবল ব্যক্তিগত ধর্মাচরণে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত পালন করছি বটে, কিন্তু তা যেন নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে; সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আমরা নীরব।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, তাঁর কাছে একমাত্র মনোনীত জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম। অথচ, আমরা ইসলামকে শুধু একটি ধর্ম হিসেবে সীমিত রেখে বাকি জীবন পরিচালনা করছি ভিন্ন নীতিতে। সুরা বাকারার ৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করে দিয়েছেন: কিতাবের কিছু অংশ মানা আর কিছু অংশ অগ্রাহ্য করার পরিণতি পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা-অপমান এবং পরকালে কঠিন শাস্তি। সুরা আনআমের ৮৮ নম্বর ও সুরা যুমারের ৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন: শিরকে লিপ্ত হলে মানুষের সমস্ত সৎ আমল নষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বাস, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে এই বিচ্যুতিরই প্রতিফলন ঘটছে সমাজে অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার আকারে।
ইসলামের মৌলিক দাবি হলো, এটি কেবল উপাসনা-পদ্ধতি নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শন, যা রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। যখন কোনো সমাজ এই সামগ্রিকতাকে ভেঙে ফেলে শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতে সীমাবদ্ধ থাকে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ঠিক করতে ভিন্ন উৎসের দিকে ফিরে যায়, তখন সেই সমাজে ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও নিরাপত্তার বুনিয়াদ দুর্বল হয়ে পড়ে।
কল্যাণ ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হলো আল কুরআনকে জীবনের সংবিধান হিসেবে মেনে নেওয়া, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা, এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে একমাত্র আদর্শ নেতা হিসেবে গ্রহণ করা। পাশাপাশি আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশিত পথে চলা নেতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। সুরা নিসার ৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন: আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার (শরিয়তসম্মতভাবে নির্বাচিত) দায়িত্বশীলদের আনুগত্য করো। বস্তুত, এই কাঠামোর মধ্যেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক সমাজব্যবস্থার বীজ নিহিত।
একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে, তার প্রতিটি কাজের হিসাব পরকালে আল্লাহর কাছে দিতে হবে, তখন তার আচরণে জবাবদিহির বোধ তৈরি হয় এমন পরিস্থিতিতেও, যেখানে কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো পুলিশ নেই। বিপরীতে, যখন সমাজে বস্তুবাদ, ব্যক্তিস্বার্থ ও পার্থিব সাফল্যকেই একমাত্র মানদ- হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়, তখন অপরাধপ্রবণতা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, সেখানে অপরাধ না করার নৈতিক তাড়না দুর্বল হয়ে যায়।
তাই আমাদের উচিত, কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়ানো কিংবা সিসিটিভি স্থাপনের মতো উপরিতলের সমাধানে সন্তুষ্ট না থেকে সমস্যার মূলে যাওয়া। ব্যক্তি জীবনে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করা, পরিবারে ও সমাজে আল্লাহভীতি ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে কুরআনের নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে জাতীয়ভাবে ভাবনাচিন্তা করা। যতদিন আমরা এই মৌলিক মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি ইতিবাচক না হবো, ততদিন হয়তো নতুন নতুন আইন, নতুন নতুন বাহিনী গঠন করেও প্রকৃত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
বগুড়ার সেই স্কুলশিক্ষিকার মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি অসুস্থ সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ঢাকা শহরের প্রতিটি অলিগলিতে আজ যে নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে, তার সমাধান শুধু পুলিশি তৎপরতায় নিহিত নয়, বরং তা নিহিত রয়েছে আমাদের সামষ্টিক মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের গভীরে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে, আল কুরআনকে জীবনের পথনির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করে এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শকে অনুসরণ করেই আমরা একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
লেখক: প্রাবন্ধিক।
বিভাগ : সম্পাদকীয়
মন্তব্য করুন
আরও পড়ুন
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ৪ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ডাকসু নেতাদের সাক্ষাৎ
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের
গুম আইন সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে ফয়সালা হবে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
গফরগাঁওয়ে সন্তানকে বেঁধে প্রবাসীর স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১
বট বাহিনীর গুজব রুখতে ভুমিকা রাখবে বগুড়া জিয়া সাইবার ফোর্স : বাদশা
ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা চীনের
লৌহজংয়ে অবৈধ বালুর গদিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান দেড় কিলোমিটার পাইপ বিনষ্ট, ড্রেজার বিকল
ধানমন্ডিতে শিশুদের খেলাধুলায় বাড়ল নতুন সুযোগ, চালু হলো ইনডোর প্লে-গ্রাউন্ড বাবুল্যান্ড
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের কোনো স্পষ্ট কৌশল নেই, মনে করেন ৭১% মার্কিন ভোটার
তেজগাঁওয়ে সন্দেহজনক ২৩ জন আটক
লালমাইয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে ট্রাক্টর চালককে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ৩
আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ রক্ষায় জেদ্দায় ৪১ দেশের সামরিক শীর্ষ নেতাদের বৈঠক
দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম
সিরাতচর্চা : পরিশীলিত জীবন গঠনের সূতিকাগার
সউদী ঘাঁটিতে হুতি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইতালির ইউরোফাইটার যুদ্ধবিমান
মালিবাগের পর ঢাকার আরও দুই জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ
সউদীর প্রতিরক্ষায় ‘যে কোনো সীমা পর্যন্ত’ যেতে প্রস্তুত পাকিস্তান: সামরিক বাহিনী
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নবী জীবনের শিক্ষা
নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে হামাসকে হামলার সুযোগ করে দিয়েছিল ইসরায়েল: হান্টার বাইডেন