শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পে ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম
৪০৪ পাতার তদন্ত প্রতিবেদন। সেখানে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা, আর্থিক অনিয়ম, সমীক্ষা ছাড়াই ডিপিপি প্রণয়ন এবং প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা প্রায় দুই বছর কেডিএর নিজস্ব তহবিলে স্থানান্তর করে রাখার মতো গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেই। বরং কেডিএর ভেতরে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশেই চলছে দাপ্তরিক কার্যক্রম। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অনেকেই নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-সরকারি তদন্তে দায় চিহ্নিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা নিতে এত ধীরগতি কেন?
খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিয়ম অনুসন্ধানে গঠিত কমিটি গত ৩১ আগস্ট গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, এরপর কেডিএর অধীন ১১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেডিএ চেয়ারম্যানকে এবং প্রেষণে থাকা ৩ উপসচিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে উঠে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো প্রকল্পের ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ প্রায় দুই বছর কেডিএর নিজস্ব তহবিলে স্থানান্তর করে রাখা হয়েছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি এটিকে আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রশ্ন হলো-প্রকল্পের টাকা কেন নিজস্ব তহবিলে নেওয়া হয়েছিল? কার সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়েছিল? ওই অর্থ কোন হিসাব থেকে কোন হিসাবে স্থানান্তর করা হয়? অর্থ স্থানান্তরের অনুমোদন দিয়েছিলেন কারা? এবং অর্থ পড়ে থাকার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের প্রভাব পড়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রকল্প প্রণয়নের প্রাথমিক পর্যায় নিয়েও তদন্তে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সমীক্ষা ছাড়াই ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়, ভূমি ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত ঝুঁকি নির্ধারণে সমীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সেই সমীক্ষা ছাড়া ডিপিপি তৈরি হয়ে থাকলে প্রকল্পের পরিকল্পনাগত ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তদন্তের আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন কেডিএর সদস্য (উন্নয়ন) এস এম মাহমুদুর রহমান, সাবেক সচিব মো. বদিউজ্জামান ও বর্তমান সদস্য (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসেন।
এ ছাড়া রয়েছেন তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী এ টি এম ওয়াহিদ আজহার, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী সাবিরুল আলম, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প) মজিবুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক মো. আরমান হোসেন, উপ-প্রকল্প পরিচালক মুনতাসির মামুন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ, ক্যাশিয়ার মেহেদী হাসান, সহকারী হিসাবরক্ষক পলাশ কুমার ঘোষ, হিসাবরক্ষক (পূর্ত) শাহানা আক্তার, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সাইদুল হক এবং অর্থ ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এম এম হোসেন আলী।
প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান অ্যান্ড মাহাবুব ব্রাদার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সরকারি প্রকল্পে কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঠিকাদারের দায়ও নির্ধারণ করা হলে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা না গেলে পুরো জবাবদিহি প্রক্রিয়াই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
কেডিএর কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, অভিযুক্তদের কেউ কেউ বিষয়টি নিজেদের অনুকূলে নিতে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করছেন। মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে বলেও তাদের অভিযোগ।
শিপইয়ার্ড সড়ক খুলনার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর একটি। প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বছরের পর বছর নগরবাসীকে যানজট, ধুলাবালি, চলাচলে দুর্ভোগ ও ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
নাগরিক নেতাদের দাবি, এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা হতে পারে।
তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে জানতে চাইলে কেডিএ চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা বলেন, মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা চলছে। দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কিন্তু কবে নাগাদ সিদ্ধান্ত হবে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিংবা ইতোমধ্যে কোনো প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না- এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পে তদন্ত শেষ হয়েছে। দায়-দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশের কথা বলা হয়েছে।
এখন সামনে একটাই বড় প্রশ্ন- তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কেডিএর এত ধীরগতি কেন?
সরকারি প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ তদন্তে উঠে এলে তার পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া-অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণ, দায় নির্ধারণ এবং বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত। সেখানে দীর্ঘ সময় কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, জবাবদিহির প্রক্রিয়া কি কেবল তদন্ত প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পের ক্ষেত্রে এখন কেডিএর সামনে শুধু ১৪ কর্মকর্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন নয় বরং এই প্রকল্পে কেন এত দীর্ঘসূত্রিতা হলো, সরকারি অর্থ কেন দীর্ঘ সময় পড়ে থাকল, পরিকল্পনার ত্রুটি কোথায় ছিল এবং এর দায় শেষ পর্যন্ত কার-তার পূর্ণাঙ্গ জবাব দেওয়ার প্রশ্নও রয়েছে। খুলনাবাসীর অপেক্ষা এখন সেই জবাবের।
বিভাগ : বাংলাদেশ
মন্তব্য করুন
এই বিভাগের আরও
আরও পড়ুন
ছোট পর্দায় জমেছে তৌসিফ-সাদনিমার রসায়ন
পাকিস্তানে পুলিশ লাইনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ১৬
মালিবাগে জোড়া ককটেল বিস্ফোরণ
কুষ্টিয়ায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল ভাংচুর, চিকিৎসক আহত
ফরিদপুরে পাটকাঠিতে সম্ভাবনা, বাড়তি আয় কৃষকরা
মধুমতির ভাঙনে বিলীন ২২৫ আশ্রয়ণ ঘর, হুমকিতে আরও ১০০ পরিবার
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ২০২৬-২৭ সেশনের জিএসটি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা
চীনা দূতাবাসের প্রতিনিধিদলের মাভাবিপ্রবি পরিদর্শন
কুষ্টিয়ায় বিজিবির অভিযানে ভারতীয় মাদকদ্রব্য উদ্ধার
দ্বিতীয় সন্তানের মা হলেন ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ তারকা মিলি
বুয়েটে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন ফ্রেশ অনন্যার
ইংল্যান্ড দলে ফিরলেন পালমার-আলেকজান্ডার-আরনল্ড, বাদ ফোডেন
ফরিদপুরে ডেঙ্গুতে আরও এক নারীর মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২৫
যাত্রাবিরতিতে ঢাকায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রী, স্বাগত জানালেন এলজিআরডি মন্ত্রী
টাঙ্গাইলে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৮৫০ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দিলেন প্রতিমন্ত্রী টুকু
ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া রোধে জিরো টলারেন্স, ফরিদপুর শহরজুড়ে সচেতনতার ডাক
গণতান্ত্রিক সমাজে মত ও সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ: আইনমন্ত্রী
বগুড়ার সান্তাহারে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা সহ ২ জন আটক
পাটগ্রামে ভারতীয় ষাঁড় উদ্ধার, ডিমলায় ইয়াবাসহ আটক ১
আইনমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির ৫ দিনের মধ্যে সাতক্ষীরা নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক নিয়োগ