দেশের উন্নয়নে কৃষিবিদদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে

Daily Inqilab মো. বশিরুল ইসলাম

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০৬ এএম | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০৬ এএম

একসময় খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি ছিল আমাদের। বিদেশ থেকে আমদানি করে ও সাহায্য নিয়ে এই খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলা করতে হতো। যে শ্রমিকের দাবি ছিল ৩ কেজি চালের সমান দৈনিক মজুরি, সে এখন কাজ করে ১০ থেকে ১২ কেজি চালের সমান দৈনিক মজুরিতে। না খেয়ে দিন কাটে না কোনো মানুষেরই। বাজারে অভাব নেই কোনো কৃষিপণ্যের। শুধু ধানের উৎপাদনই নয়, বেড়েছে শাকসবজি, ফলমূল, ডিম, দুধ, মাছ ও মাংসের উৎপাদন। সারাবছরই পাওয়া যাচ্ছে শাক-সবজি। বিদেশি ফল স্ট্রবেরি, কমলা, মালটা, ড্রাগন, কাজু বাদামের মতো অনেক ফলের চাষ সফলভাবে হচ্ছে বাংলাদেশে। ফলে এই সকল সুস্বাদু ফল দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়েছে। ছাদ-কৃষিতেও ব্যাপক সাফল্য, আগ্রহ ও জনপ্রিয়তা আশাব্যঞ্জক। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি ও ফলের চাষও রয়েছে। দুই যুগ আগেও বাংলাদেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি অর্ধেক এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে।

আমাদের দেশটা আয়তনে বিশ্বের ৯৪তম আর অষ্টম জনবহুল ছোট্ট একটা দেশ। অতিরিক্ত জনগণের জন্য বসতবাড়ি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, দ্রুত শিল্পায়নে এমনিতেই প্রতিনিয়ত আবাদি জমি কমছে। অবশিষ্ট জমিতে এত বিপুল জনসংখ্যার প্রধান খাদ্যের বড় অংশ দেশের ভেতরে উৎপাদিত হচ্ছে, এটা ভাবা যায়। আবার উৎপাদনের নিরিখে দেশের ২২টি কৃষিপণ্য বিশ্বে শীর্ষ ১০ অবস্থান করছে আমাদের দেশটা। আর ফসল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪তম। এই হিসাব জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, আয়তনে ছোট হলেও কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কৃষি খাতের এ সাফল্যের পেছনের নায়ক কে? অবশ্যই আমাদের কৃষকদের অবদান এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। আর কৃষিবিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিবিষ্ট গবেষণায় উৎপাদন বাড়ার পেছনে প্রধান উজ্জীবক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সে সঙ্গে সরকারের নানা উদ্যোগে এগিয়ে চলেছে এ খাত। উচ্চফলনশীল ও প্রতিকূলতা সহিষ্ণু নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও প্রবর্তনের ফলে খাদ্যশস্য, সবজি ও ফল-ফসল উৎপাদনে বৈচিত্র্য এসেছে। সেই সঙ্গে সমুদ্র ও মিঠাপানির মাছ, গবাদিপশু, পোল্ট্রি, মাংস ও ডিম, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি, দুগ্ধ উৎপাদনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে চলছে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দেশের খোরপোষের কৃষির রূপান্তর ঘটছে বাণিজ্যিক কৃষিতে।

কালের পরিক্রমায় কৃষিবিদরা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মোতাবেক দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কৃষি শিক্ষায় মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের প্রবেশ আগের তুলনায় বেড়েছে; যদিও ১৯৭৭ সালের বেতন কাঠামোয় কৃষিবিদদের সেই মর্যাদা আবারও একধাপ নামিয়ে দেওয়া হয়। তীব্র আন্দোলনের মুখে তদানীন্তন সরকার কৃষিবিদদের সেই হারানো সম্মান আবার ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। সত্যি কথা বলতে কি, এ দেশে কৃষির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের যাত্রার উল্লম্ফন বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই বিস্তার লাভ করা শুরু করেছিল। এর মাধ্যমে তিনি কৃষির উন্নয়নে দেশ-বিদেশের কৃষি গবেষকদের সংযুক্ত করতে পেরেছিলেন। তিনি যথার্থই বুঝতে পেরেছিলেন জনসংখ্যাধিক্য দেশ হিসেবে সারা দেশের মানুষের খাদ্য জোগাতে হলে কৃষির ওপর জোর না দিয়ে উপার নেই। বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদদের ক্লাস ওয়ান মর্যাদা দেওয়ায় কৃষিবিদরা শুুধু যে কৃষি সেক্টরে অবদান রাখছে এমনটি নয়। কৃষিবিদরা প্রতিটি সেক্টরে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। কী ফসল উৎপাদনে, মৎস্য উৎপাদনে, পশুসম্পদ উন্নয়নে, কী কৃষি যান্ত্রিকীকরণে, এমনকি কৃষি অর্থনীতিতে পলিসি ও পরিকল্পনায় অবদান রেখে চলেছেন।

কৃষিতে পড়াশোনা করে দীর্ঘদিন ধরে সফলতার সাথে কৃষিবিদ তারেক হাসান ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের পাইলট হিসেবে বিমান চালাচ্ছেন। কৃষিবিদ যুগল কিশোর নাথ চাকরি করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে। তার অনার্স কৃষিতে এবং মাস্টার্স জেনেটিক্স এন্ড প্লান্ট ব্রিডিংয়ে। শুধু যে, কৃষিবিদ যুগল কিশোর নাথ এয়ারপোর্টে কাজ করে এমনটা নয়, অনেক কৃষিবিদই আজ দেশ-বিদেশের কাজ করছে। করোনা মহামারীকালে ভ্যাক্সিন এবং কিট সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনায় আসেন বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীল, সার্স ভাইরাসের কুইক টেস্টকিটের উদ্ভাবক, তিনিও একজন কৃষিবিদ! এমনই অসংখ্যা কৃষিবিদ সুনামের সাথে কাজ করছেন আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন সংস্থায়। এ ছাড়া স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতিতেও রেখে চলেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুবাদে কৃষিবিদরা এ দেশে আজ এক মর্যাদাবান পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃত।

কৃষিবিদদের কল্যাণে এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে কৃষি খাতে এখন উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। বর্তমানে চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বাংলাদেশের স্থান হলো সবার ওপরে। তা ছাড়া পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ, গম দুই গুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে আম, আলু রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। মাছ রপ্তানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিরকালের দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা আর ক্ষুধার দেশে এখন ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে। জমির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদদের মর্যাদা দিয়ে বলেছিলেন, আমার মান রাখিস। বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার মান রেখেছেন বাংলার কৃষক ও কৃষিবিদগণ। বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির কল্যাণে কৃষিবিদ ও কৃষকের অবদানে দেশের কৃষি আজ নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে।

লেখক: কৃষিবিদ, উপ-পরিচালক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]


বিভাগ : সম্পাদকীয়


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

এই বিভাগের আরও

এই মৃত্যুর দায় কার?
আলোকদূষণের নানা রকম ক্ষতিকর দিক
ঢাকায় জনচাপ ও রিকশার দাপট কমাতে হবে
হাতি দিয়ে চাঁদাবাজি
বই হয়ে উঠুক নিত্যসঙ্গী
আরও

আরও পড়ুন

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি এবং দেশের শান্তি- শৃঙ্খলা রক্ষায় আল্লাহর রহমত কামনা করে মোকামিয়ার দুই দিনব্যাপী মাহফিল সম্পন্ন

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি এবং দেশের শান্তি- শৃঙ্খলা রক্ষায় আল্লাহর রহমত কামনা করে মোকামিয়ার দুই দিনব্যাপী মাহফিল সম্পন্ন

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭, সাধারণ কেন্দ্রে থাকবে ১৬ জনের ফোর্স

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭, সাধারণ কেন্দ্রে থাকবে ১৬ জনের ফোর্স

হিলি সীমান্ত পরিদর্শনে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রতিনিধি দল

হিলি সীমান্ত পরিদর্শনে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রতিনিধি দল

আড়াই ঘণ্টায়ও নিয়ন্ত্রণে আসেনি চিনি মিলের আগুন

আড়াই ঘণ্টায়ও নিয়ন্ত্রণে আসেনি চিনি মিলের আগুন

স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবেন স্মার্ট ইমামরা-সিকৃবি ভিসি

স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবেন স্মার্ট ইমামরা-সিকৃবি ভিসি

প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর বাড়িতে পুলিশের অভিযান, সমালোচনার মুখে পাকিস্তানের সরকার

প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর বাড়িতে পুলিশের অভিযান, সমালোচনার মুখে পাকিস্তানের সরকার

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ২১৪ জনকে সহায়তা দেয়া হয়েছে : ওবায়দুল কাদের

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ২১৪ জনকে সহায়তা দেয়া হয়েছে : ওবায়দুল কাদের

ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ

ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় চিরবিদায় নিলেন শেরপুরের প্রবীণ সাংবাদিক তালাত মাহমুদ

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় চিরবিদায় নিলেন শেরপুরের প্রবীণ সাংবাদিক তালাত মাহমুদ

এখানে এলেই মনটা ভারী হয়ে যায় : প্রধানমন্ত্রী

এখানে এলেই মনটা ভারী হয়ে যায় : প্রধানমন্ত্রী

দুর্নীতি মামলায় খালাস পেলেন থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

দুর্নীতি মামলায় খালাস পেলেন থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

পাকিস্তানের ২৪তম প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিলেন শেহবাজ শরিফ

পাকিস্তানের ২৪তম প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিলেন শেহবাজ শরিফ

আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ, ব্যারিস্টার গোহর পিটিআই চেয়ারম্যান নির্বাচিত

আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ, ব্যারিস্টার গোহর পিটিআই চেয়ারম্যান নির্বাচিত

চট্টগ্রামে এস আলম গ্রুপের চিনির কারখানায় আগুন

চট্টগ্রামে এস আলম গ্রুপের চিনির কারখানায় আগুন

ফিল্ডিংয়ে নেমেই বাংলাদেশের উইকেট

ফিল্ডিংয়ে নেমেই বাংলাদেশের উইকেট

দুই বছরে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৭০টি : রেলমন্ত্রী

দুই বছরে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৭০টি : রেলমন্ত্রী

রাজশাহীতে ভাঙা লাইন মেরামত করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক

রাজশাহীতে ভাঙা লাইন মেরামত করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক

নদী রক্ষার সাথে জলবায়ু পরিবেশ সবকিছুই যুক্ত, তাই নদী রক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছি : নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী

নদী রক্ষার সাথে জলবায়ু পরিবেশ সবকিছুই যুক্ত, তাই নদী রক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছি : নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী

হায়দরাবাদের নেতৃত্বে কামিন্স

হায়দরাবাদের নেতৃত্বে কামিন্স

পাটখাতের উন্নয়নে আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে : মন্ত্রী নানক

পাটখাতের উন্নয়নে আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে : মন্ত্রী নানক