ঢাকা   শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

মজলুমের পাশে দাঁড়ানো নববী আদর্শ

Daily Inqilab ফারদিন মোহাম্মদ

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম

চলতি সময়ে বিশ্বজুড়ে অন্যায়, অবিচার, শোষণ আর মানবতার অবমাননা নিত্যদিনের স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। সবল যেখানে অবলীলায় দুর্বলকে গ্রাস করছে, আইন যেখানে প্রভাবশালীদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে, সেখানে আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি মানবজাতির জন্য মুক্তির দিশারি হতে পারে। সেটি হলো ‘হিলফুল ফুযুল’ বা ‘কল্যাণকামী শান্তি সংঘ’। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর নবুয়তপূর্ব জীবনের এক অনন্য, গৌরবোজ্জ্বল এবং বৈপ্লবিক অধ্যায় এটি। এটি ছিল মূলত মজলুমের পাশে দাঁড়ানো, মানবাধিকার রক্ষা এবং সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক কালজয়ী নববী আদর্শ, যা সমকালীন পঙ্কিল সমাজ গঠনে সবচেয়ে বড় দাওয়াই।
বর্বরতার অন্ধকার ও অশান্তির দাবানল : তৎকালীন আরব সমাজ ছিল জাহেলিয়াত বা বর্বরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। গোত্রীয় অহংকার, লুটপাট, খুনোখুনি আর নারীর অবমাননা ছিল সাধারণ বিষয়। সামান্য কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোত্রগুলোর মধ্যে যুগের পর যুগ ধরে যুদ্ধ চলত। এমনই এক রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ছিল ‘হারবুল ফিজার’ বা অন্যায় সমর। কায়স ও কুরাইশ গোত্রের মধ্যে সংঘটিত এই যুদ্ধের ভয়াবহতা, নির্বিচার রক্তপাত এবং অমানবিক নিষ্ঠুরতা তরুণ মুহাম্মদ (সা.) কে গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত করে। তিনি ভাবলেন, এভাবে একটি সমাজ চলতে পারে না; মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
একটি আর্তনাদ এবং বিবেকবানের জাগরণ : ফিজার যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই মক্কায় এক চরম ও জঘন্য অন্যায় সংঘটিত হয়। ইয়েমেনের জুবাইদ গোত্রের এক ব্যবসায়ী কিছু পণ্য নিয়ে মক্কায় আসেন। মক্কার প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি আস বিন ওয়ায়েল সেই সমস্ত পণ্য ক্রয় করে। কিন্তু পণ্য হস্তগত করার পর সে তার মূল্য পরিশোধ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়। বিদেশি, অসহায় ও মক্কায় কোনো আত্মীয় বা গোত্রীয় শক্তি না থাকায় সেই ব্যবসায়ী মক্কার কুরাইশ নেতাদের দরজায় দরজায় ঘুরেও কোনো বিচার পাননি। চরম নিরুপায় ও ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি পরদিন ভোরে কাবা ঘরের পাশে আবু কুবাইস পাহাড়ে আরোহণ করেন এবং উচ্চস্বরে মক্কাবাসীর বিবেককে জাগ্রত করে নিজের ওপর হওয়া জুলুমের বিবরণ দিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন।
একটি অসহায় মানুষের এই করুণ আর্তনাদ মক্কার কতিপয় নীতিবান ও বিবেকবান যুবকের হৃদয়ে প্রচ- নাড়া দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর চাচা যুবাইর বিন আবদুল মুত্তালিবের বিশেষ উদ্যোগে এবং আবদুল্লাহ বিন জুদানের বাড়িতে মক্কার প্রভাবশালী হাশেম, মুত্তালিব, জহুরা ও তাইম গোত্রের প্রগতিশীল তরুণেরা সমবেত হন। সেখানে দীর্ঘ আলোচনার পর তারা একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যা ইতিহাসে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তৎকালীন তরুণ মুহাম্মদ (সা.) এই চুক্তি সম্পাদনে ও পরিকল্পনা প্রণয়নে অত্যন্ত সক্রিয়, অগ্রণী এবং দূরদর্শী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
হিলফুল ফুযুলের মূল অঙ্গীকারসমূহ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই শান্তি সংঘের সদস্যরা আল্লাহর নামে প্রধানত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট শপথ বা অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন তা হলো -দেশ থেকে অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম ও উগ্রতা সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হবে। বহিরাগত (বিদেশি মুসাফির) ও স্থানীয় নির্বিশেষে মক্কায় অবস্থানরত সব মজলুমের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কোনো অত্যাচারী, জালেম বা অপরাধীকে মক্কার বুকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। দুর্বল, এতিম ও ধনহীনদের পাশে দাঁড়িয়ে সামাজিক সাম্য ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা হবে। সমাজ থেকে সব ধরনের হানাহানি ও গোত্রীয় যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে আনা হবে।এই অঙ্গীকার কেবল কাগজের চুক্তি ছিল না, বরং সংঘের যুবকেরা আস বিন ওয়ায়েলের বাড়ি ঘেরাও করে সেই বিদেশি ব্যবসায়ীর পাওনা টাকা আদায় করে দিয়েছিলেন।
নববী জীবনের অনন্য শিক্ষা ও বিশ্বজনীনতা : নবুয়ত পাওয়ার পর এবং মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) হিলফুল ফুযুলের সেই দিনগুলোর কথা অত্যন্ত গর্ব এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেন। তিনি মদিনার জীবনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আবদুল্লাহ বিন জুদানের বাড়িতে আমি এমন একটি চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম, যার বিপরীতে আমাকে যদি লাল রঙের অত্যন্ত মূল্যবান উটও (তৎকালীন আরবের সবচেয়ে দামি সম্পদ) দেওয়া হতো, তবুও আমি তা গ্রহণ করতাম না। আজ ইসলামের যুগেও যদি কেউ আমাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন কোনো চুক্তির দিকে আহ্বান করে, তবে আমি সানন্দে তাতে সাড়া দেব। (সুনানে বায়হাকি)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এই পবিত্র বাণী প্রমাণ করে, সমাজ থেকে অন্যায় দূর করা, শান্তি ও মানবাধিকার রক্ষা করার লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের গ-িতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিশ্বজনীন ও শাশ্বত এক মানবিক দায়িত্ব।
সমকালীন সমাজে হিলফুল ফুযুলের প্রাসঙ্গিকতা গভীরভাবে উল্লেখযোগ্য। আজকের আধুনিক ও সভ্য দাবিদার সমাজে হিলফুল ফুযুলের আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি, বরং এর প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়েছে। রাজনীতি, আইন ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সমাজে আজও দুর্বলদের জমি, সম্পদ ও মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হিলফুল ফুযুল আমাদের শেখায়, মজলুমের কোনো দল বা জাত নেই। সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তার পাশে দাঁড়ানো এবং অত্যাচারীর হাতকে রুখে দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব।
হিলফুল ফুযুল ছিল মূলত তরুণদের একটি সম্মিলিত উদ্যোগ। আজকের তরুণ সমাজ যদি অপরাধ, মাদক, গ্যাং কালচার ও অনৈতিকতা ছেড়ে সমাজ সংস্কার ও সেবামূলক কাজে এগিয়ে আসে, তবে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। হিলফুল ফুযুল চুক্তির সময় কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল কেবল নিখাদ মানবকল্যাণ। বর্তমান পৃথিবীর নানামুখী সংকটের মূলে রয়েছে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। এই হানাহানি বন্ধে হিলফুল ফুযুলের অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি।
হিলফুল ফুযুল কেবল ইসলামের ইতিহাসের একটি প্রাচীন চুক্তি নয়, এটি মানব মুক্তির একটি জীবন্ত ও চিরন্তন দর্শন। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এই মহান আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে পারলে সমাজ থেকে সব ধরনের জুলুম-নির্যাতন চিরতরে বিদায় নেবে। আসুন, মহানবী (সা.)-এর এই কালজয়ী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, মজলুমের মুখে হাসি ফোটাই এবং একটি শান্তিময় পৃথিবী বিনির্মাণে অংশীদার হই।


বিভাগ : ইসলামী জীবন


মন্তব্য করুন

HTML Comment Box is loading comments...

আরও পড়ুন

তারাকান্দায় ৩৪০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ

তারাকান্দায় ৩৪০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ

ঢাকায় বাড়তে পারে তাপমাত্রা, ৮ বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা

ঢাকায় বাড়তে পারে তাপমাত্রা, ৮ বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা

আজ টানা ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

আজ টানা ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় ২৬ হামলার দাবি হুথিদের

ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় ২৬ হামলার দাবি হুথিদের

রাউলিং বিতর্কের মধ্যেই ‘হ্যারি পটার’ সিরিজে কিট হ্যারিংটন

রাউলিং বিতর্কের মধ্যেই ‘হ্যারি পটার’ সিরিজে কিট হ্যারিংটন

পাকিস্তানস গট ট্যালেন্ট’ জিতে ইতিহাস গড়লেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফাওয়াদ

পাকিস্তানস গট ট্যালেন্ট’ জিতে ইতিহাস গড়লেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফাওয়াদ

বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন ‘টুয়েলভথ ফেল’-এর শ্রদ্ধা?

বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন ‘টুয়েলভথ ফেল’-এর শ্রদ্ধা?

নীলফামারীতে ভোর-সন্ধ্যায় কুয়াশার চাদর, আগাম শীতের অনুভূতি

নীলফামারীতে ভোর-সন্ধ্যায় কুয়াশার চাদর, আগাম শীতের অনুভূতি

আট দফা যেকােনো সময় এক দফা হতে পারে: শফিকুর রহমান

আট দফা যেকােনো সময় এক দফা হতে পারে: শফিকুর রহমান

রোদে সানগ্লাস শুধু স্টাইল নয়, চোখের ‘সানস্ক্রিন’ও! (পর্ব ১)

রোদে সানগ্লাস শুধু স্টাইল নয়, চোখের ‘সানস্ক্রিন’ও! (পর্ব ১)

রংপুর অভিমুখে জামায়াত জোটের লংমার্চ শুরু

রংপুর অভিমুখে জামায়াত জোটের লংমার্চ শুরু

রিয়াল মাদ্রিদেই "নতুন থিবো কর্তোয়া" তৈরী করতে চান কর্তোয়া

রিয়াল মাদ্রিদেই "নতুন থিবো কর্তোয়া" তৈরী করতে চান কর্তোয়া

"মৌমাছি"দের ডেরায় হুল খেয়ে নাস্তানাবুদ চেলসির

"মৌমাছি"দের ডেরায় হুল খেয়ে নাস্তানাবুদ চেলসির

অলিসের হ্যাট্রিক, কেইনের ব্রেসে বায়ার্নের ৭-০ তে জয়

অলিসের হ্যাট্রিক, কেইনের ব্রেসে বায়ার্নের ৭-০ তে জয়

কান্তেকে বাদ দিয়ে তরুণদের নিয়ে ফ্রান্সে নতুন যুগের শুরু জিদানের

কান্তেকে বাদ দিয়ে তরুণদের নিয়ে ফ্রান্সে নতুন যুগের শুরু জিদানের

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ৪ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ৪ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ

জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ডাকসু নেতাদের সাক্ষাৎ

জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ডাকসু নেতাদের সাক্ষাৎ

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের

গুম আইন সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে ফয়সালা হবে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

গুম আইন সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে ফয়সালা হবে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

গফরগাঁওয়ে সন্তানকে বেঁধে প্রবাসীর স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১

গফরগাঁওয়ে সন্তানকে বেঁধে প্রবাসীর স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১